ইকোনমিক হিটম্যান : পর্ব-২

মূল : জন পার্কিন্স
অনুবাদ ও সম্পাদনা : জালাল কবির, টরন্টো, কানাডা

অধ্যায়-২
জীবন-প্রবেশ

বৈধ বাচনভঙ্গিতে “মাইন” কে একটি একান্তভাবে সীমাবদ্ধ কর্পোরেশন বলা যায়। মোটামুটি এর দু‘হাজার কর্মচারীর মধ্যে ৫% কোম্পানির মালিক। তাদেরকে অংশীদার বা সহযোগি বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের পদমর্যাদা অত্যন্ত লোভনীয়। অংশীদাররা অন্য সবার উপরে শুধুমাত্র ক্ষমতাই রাখেন না, তারা বিপুল পরিমানে ডলারও আয় করেন। বিচক্ষণতা তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাষ্ট্রপ্রধান ও অন্যান্য প্রধান প্রশাসকদের সাথে তারা ঘনিষ্ঠভাবে উঠাবসা করেন।

একটি সুকঠিন ও চুড়ান্ত বিশ্বাসের গোপনীয়তাকে পূর্ণভাবে সন্মান করার জন্য, আইনজীবি ও মনঃচিকিৎসকদের মত, যারা তাদের পরামর্শ প্রত্যাশা করে, তাদের সাথে তেমনি নিবিড় ও গোপন সম্পর্ক বজায় রাখেন। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, কোনোমতেই এটা সহ্য করা হত না। ফলে, মাইনের বাইরে দু‘একটি ব্যতিক্রম ছাড়া কখনই কেউ আমাদের বিষয়ে কিছু শুনতে পেত না। যদিও অনেকেই আমাদের প্রতিযোগী ফার্ম যেমন, আর্থার ডি- লিটল, ষ্টোন এন্ড ওয়েবস্টার, ব্রাউন এন্ড রুট, হালিবার্টন, এবং বেখটেলের সাথে পরিচিত ছিল।

আরো পড়ুন : ইকোনমিক হিটম্যান : পর্ব-১

হালকাভাবে আমি ‘প্রতিযোগী’ কথাটি ব্যবহার করেছি। কারন প্রকৃতপক্ষে ‘মাইন’ ছিল নিজেই একটি স্বতন্ত্র গোষ্ঠি। আমাদের অধিকাংশ পেশাগত কর্মীরাই ছিল ইঞ্জিনিয়ার। যদিও আমাদের কোনো যন্ত্রপাতি ছিল না।

এবং কখনও বড়জোর ষ্টোর-ছাউনি ছাড়া কোনো কিছু আমরা নির্মান করিনি। অনেক মাইন-কর্মচারীরা আগে সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিল। কিন্ত আমরা দেশরক্ষা দফতরের সাথে কোনো কাজের জন্য চুক্তিবদ্ধ ছিলাম না। অন্য কোনো সামরিক বিভাগের সাথেও নয়। আমাদের ‘ব্যবসা-সংক্রান্ত মালামাল’ সাধারন বানিজ্যের মানদÐ থেকে বিশেষ এক ধরনের পার্থক্য বজায় রাখত। আমি এখানে চাকরিতে ঢুকে প্রথম কয়েক মাস নিজেই বুঝে উঠতে পারিনি আমার কাজটি কি ? আমি শুধু এটুকুই জানতাম, বাস্তবে আমাকে ইন্দোনেশিয়াতে প্রথম নিয়োগ করা হবে। একটি এগারো-সদস্যের দলের একজন হিসেবে আমাকে সেখানে পাঠানো হবে, জাভা দ্বীপে একটি প্রধান ‘শক্তি-কেন্দ্রের’ পরিকল্পনা-তৈরিতে অংশ নেবার জন্য।

আমি আরও জানতাম, আইনমার এবং অন্যরা যারা আমার সাথে কাজটি নিয়ে কথা বলেছে, তারা সবাই খুবই উৎসুক ছিল আমাকে বোঝানোর জন্য যে জাভার অর্থনীতি পরম বিকশিত হবে। এবং আমি যদি একজন দক্ষ ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করতে চাই (তারপর যথারীতি আমার পদোন্নতি হবে), তাহলে আমাকে সেভাবেই প্রকল্পটি তৈরি করতে হবে, যাতে জাভার নিশ্চিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন তরান্বিত হবে।

“রেখাচিত্রে কি দেখানো হয়েছে, ভুলে যাও’’ আইনমারের প্রিয়বচন। তিনি তার আঙ্গুল বাতাসে ভাসিয়ে তার মাথার উপরে নিয়ে আসলেন। “অর্থনীতি হল এমন একটি পাখি যাকে আকাশের অনেক উঁচুতে উড়তে হয়”

আইনমার ঘন ঘন যেখানে সেখানে যাতায়াত করতেন। সাধারনত দু‘তিনদিনের জন্য। এসব নিয়ে কেউ বেশি কথা বলত না। তার গন্তব্য তাদের জন্য ছিল অজানা। যখন তিনি অফিসে থাকতেন, তিনি প্রায়ই আমাকে ডেকে নিয়ে তার পাশে বসিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য কথাবার্তা বলতেন। আমরা কফি পান করতাম। তিনি এ্যানের কথা জিজ্ঞেস করতেন, আমাদের নতুন এপার্টমেন্টের খোঁজ নিতেন, এবং ইকুয়েডর থেকে যে বিড়ালটি আমরা সাথে নিয়ে এসেছি, তারও খবর নিতেন। তাকে যতই কাছে থেকে ভালোমত জানতে পারতাম, আমার সাহস বেড়ে যেত। আমি চেষ্টা করতাম তার বিষয়ে আরও বেশি কিছু জানতে এবং আমার কাজের মাধ্যমে তার কি প্রত্যাশা, জানতে চাইতাম। কিন্ত কখনও আমি এমন জবাব পেতাম না, যা আমাকে সন্তুষ্ট করতো। তিনি কথাবার্তা এড়িয়ে যেতে এবং প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দেবার উস্তাদ ছিলেন। এরকম কথা বলার সময় একদিন তিনি আমার দিকে অদ্ভুতভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন।

তারপর বললেন “তোমার চিন্তার কোনো কারন নেই”। “তোমার কাছে আমাদের প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চ, সম্প্রতি আমি ওয়াশিংটনে ছিলাম” তার কথা থেমে গেল। ঠোঁটে দুর্বোধ্য হাসি। “যাই হোক, তুমি তো জানো, কুয়েতে আমাদের একটি বৃহৎ প্রকল্প আছে। তোমার ইন্দোনেশিয়া যেতে আরও কিছুদিন দেরী হবে। আমি বলি কি, তুমি কুয়েত সম্পর্কে পড়াশুনার জন্য কিছু সময় ব্যয় করো। বোস্টন পাবলিক লাইব্রেরির বইয়ের সংগ্রহ বিরাট। আমরা তোমার জন্য এমআইটি ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির পাসও যোগাড় করে দেব।”

এরপর, আমি অনেক সময় ঐসব লাইব্রেরিতে কাটিয়েছি। বিশেষ করে বিপিএল গ্রন্থাগারে। আমার অফিস থেকে কয়েকটি বিল্ডিং পরেই আমার ব্যাক-বে এপার্টমেন্টের একবারে কাছে। কুয়েত আমার কাছে খুবই পরিচিত হয়ে গেল। সাথে সাথে আমি জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক অর্থ-তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্ব ব্যাংক থেকে প্র্রকাশিত অনেক অর্থনীতি-পরিসংখ্যানের বইও পড়ে ফেললাম। আমি জানতাম আমাকে ইন্দোনেশিয়া ও জাভার অর্থনীতি সংক্রান্ত (ইকোনোমেট্রিক) প্রতিমান-নকশা তৈরি করতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, আমি এখনি কুয়েতের জন্য এ ধরনের একটি মডেল তৈরি করা শুরু করতে পারি।

তবে সত্যি হল, বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ’ব্যবসা-প্রশাসনের বিএস কোর্স’ আমাকে ইকোনোমেট্রিশিয়ান হিসেবে প্রস্তুত করেনি। কাজেই আমি প্রচুর সময় ব্যয় করলাম, কিভাবে আমি এটা আয়ত্ব করতে পারি। আমি এতটাই অধীর হয়ে গেলাম যে এ বিষয়ে বেশ কয়েকটি কোর্সে নাম লেখালাম। এই প্রক্রিয়ায় আমি প্রথম জানতে পারলাম, মনগড়া সংখ্যাতত্ত¡ সৃষ্টি করা যেতে পারে। এভাবে বিরাট সংখ্যক উপসংহারের সমাবেশ ঘটানো যায়। যেমন, বিশ্লেষকের পক্ষপাত বা বিশেষ অনুরাগ সম্পর্কিত দাবীর সপক্ষে তথ্য উপস্থিত করা।

‘মাইন’ একটি পুরুষ-শাসিত কর্পোরেশন। ১৯৭১ সালে মাত্র চারজন মহিলা পেশাগত পদমর্যাদায় অধিষ্টিত ছিল। অবশ্য সম্ভবত দু‘শো মহিলাকে ব্যক্তিগত সেক্রেটারির কাঠামোর মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। প্রতিটি ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং বিভাগীয় ম্যানেজারের একটি করে মহিলা সেক্রেটারি। তারপর ছিল ষ্টেনোদের সারি, যারা আমাদের সেবা করত। এই অবসরে আমি ‘লিঙ্গ-অসমতায়‘ অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এজন্যই আমি একদিন বিপিএল রেফারেন্স-সেকশনে যা ঘটল, তাতে বিশেষভাবে বিষ্মিত হয়েছি।

একজন আকর্ষনীয়া শ্যামাঙ্গী কৃষ্ণ-কেশী আমার কাছে এসে টেবিলের উল্টো দিকের চেয়ারে বসল। পরনে গাঢ় সবুজ বিজনেস স্যুট। দেখতে অত্যন্ত অভিজাত। মনে মনে আমি হিসাব করে দেখলাম, আমার বেশ কিছু বছরের সিনীয়র হবে। কিন্ত আমি এমন ভাব নিলাম, তার প্রতি আমার কোনো দৃষ্টি নেই, আমি উদাসীন। কয়েক মিনিট পরে, কোনো কথা না বলে সে আমার দিকে একটি খোলা বই মেলে ধরল। বইয়ের পাতায়, আমি যা খুঁজছি সেই কুয়েত সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যপঞ্জি। সাথে তার নাম সহ একটি কার্ড, ক্লডিন মার্টিন। তার পদবী: চাস- টি- মাইন ইনকর্পোরেশনের বিশেষ পরামর্শদাতা। আমার দৃষ্টি তার নরম সবুজ চোখে আটকে গেছে। সে তার হাত বাড়িয়ে দিল।

“তোমার প্রশিক্ষণে আমাকে সহায়তা করতে বলা হয়েছে” মেয়েটি বল্ল। যা শুনছি, তা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। প্রশিক্ষণের শুরুতে পরদিন আমাদের ক্লডিনের বিকন-স্ট্রিট এপার্টমেন্টে সাক্ষাত হল। মাইনের প্রæডেন্সিয়াল সেন্টার সদর দফতরের কয়েক বিল্ডিং পরে। আমাদের একত্র প্রথম ঘন্টায় সে আমার পদ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বল্ল, এটি একটি অসাধারন চাকরি। আমাদের সব কিছুই চরমভাবে গোপন রাখতে হবে। সে আরও বলল, এ পর্যন্ত কেউ আমাকে আমার কাজের সুনির্দিষ্ট ধারনা দেয়নি। কারন, সে ব্যতিত কারও এ অধিকার নেই। তারপর আমাকে অবহিত করল, তার কাজ- ‘ইকোনোমিক হিট ম্যানের‘ ছাঁচে ফেলে আমার রূপান্তর ঘটানো।

নামটি শুনেই আমার মধ্যে পুরোনো চাঞ্চল্যকর আর চক্রান্তধর্মী দুঃস্বপ্নের উদয় হল। আমি খুবই বিব্রত বোধ করলাম। শুনতে পেলাম মনের ভেতর থেকে সন্ত্রস্ত অট্টহাসি ভেসে আসছে। ক্লডিন স্মিত হাসি হেসে আমাকে আশ্বস্ত করে বলল, এই নামটি তারা ব্যবহার করে, কারন এটা একটা রসিকতা। “কে আর এটাকে গুরুতর চিন্তার সাথে নেবে ?” সে প্রশ্ন করল।

আমি স্বীকার করলাম, ‘ইকোনোমিক হিটম্যানের’ ভুমিকা সম্পর্কে আমার কিছুই জানা নেই।

“তুমি একা নও” সে হাস্ল। “একটি নোংরা ব্যবসায় আমরা একটা বিরল প্রজাতি। কেউ তোমার জড়িত থাকার ব্যাপারটি জানতে পারবে না। এমন কি তোমার স্ত্রীও নয়”। তারপর সে খুবই গম্ভীর হয়ে গেল।

“আমি তোমাকে সব খোলাখুলিই বলব, সামনের সপ্তাহগুলিতে আমি যা পারি, যা জানি সবই তোমাকে শেখাব। তারপর তোমাকে পছন্দ করতে হবে, তোমার সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত। একবার তুমি এর মধ্যে প্রবেশ করলে, তোমাকে আজীবন এখানে থাকতে হবে”। তারপর থেকে সে খুবই কম পুরো নামটি ব্যবহার করেছে- আমরা সাদামাটা কথায়, ইএইচএম (ঊঐগ)।

তখন পর্যন্ত আমি যা জানতাম না, তা এখন আমার জানা- আমার সব ব্যক্তিত্ব ও দুর্বলতা, যা আমার জীবনপঞ্জিতে এনএসএ অনাবৃত করেছে। ক্লডিন তার সব কিছুরই পূর্ণ সুযোগ গ্রহন করছে। আমি জানি না, কে তাকে এসব তথ্য সরবরাহ করেছে- আইনার, এনএসএ, মাইনের কর্মচারী-নিয়োগ বিভাগ, বা অন্য কেউ। এটুকু শুধু বুঝলাম খুবই নৈপুন্যের সাথে সে এসব ব্যবহার করছে। তার আচরন- দৈহিক প্রলোভন এবং মুখের কথায় ছয়কে নয় করা, এসব যেন অপুর্ব মিশ্রন। সবই বিশেষ করে আমার জন্য লাগসই ভাবে প্রগ্রাম করা হয়েছে। কিন্ত তারপরেও এই একান্তভাবে কাছাকাছি আসা সাধারন মানদন্ডের হিসেবে স্বাভাবিক প্রক্রিয়াসিদ্ধ প্রশিক্ষণ। পরে আমি দেখেছি বহু ধরনের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান এরকম অনুশীলনের চর্চা করে থাকে; যেখানে বাজির দান অনেক উঁচু এবং লোভনীয় কারবার গুটিয়ে আনার চাপ অত্যন্ত বেশি। শুরু থেকেই ক্লডিন জান্ত, আমি আমাদের গুপ্ত কর্মকাÐ প্রকাশ করে আমার বিয়েকে বিপদে ফেলার ঝুঁকি নেব না। তার খোলামেলা ভাবটি ছিল খুবই নিষ্ঠুর, যখন সে বিশদভাবে বর্ণনা করত- আমার কাছে কোম্পানী কি প্রত্যাশা করে এবং তার অন্ধকারাচ্ছন্ন দিক।

আমার কোনো ধারনা ছিল না, তার বেতন কে দেয় ? যদিও আমার সন্দেহ করার কোনো কারন ছিল না, তার চাকরিদাতা ‘মাইন‘ নয়, যা তার ভিজিটিং কার্ডে লেখা আছে। সে সময়ে, আমি খুবই কাঁচা আর সরল ছিলাম। অল্পতেই ভয় পেতাম। আজকাল যেসব প্রশ্ন আমার কাছে আবশ্যিক মনে হয়, সে সময় জিজ্ঞেস করতে বিমুঢ়তা বোধ করতাম, সাহস পেতাম না।

ক্লডিন আমাকে বল্ল, আমার কাজের দুটি প্রাথমিক উদ্দেশ্য আছে। প্রথম, আমাকে বিরাট পরিমানের আন্তর্জাতিক ঋণের ন্যায্যতা প্রমান করতে হবে। যেসব অর্থ পরে বিশাল ইঞ্জিনিয়ারিং এবং নির্মান-প্রকল্পের ‘মাধ্যম-চুঙ্গির’ প্রবাহ দিয়ে মাইন এবং অন্যান্য আমেরিকান ফার্মের কাছে ফিরে আসবে (যেমন: বেখটেল, হালিবার্টন, স্টোন এÐ ওয়েবস্টার, এবং ব্রাউন এÐ রুট)। দ্বিতীয়, এই সমস্ত ঋণ যেসব দেশ গ্রহন করে, তাদের দেউলিয়া বানানোর জন্য আমাকে কাজ করতে হবে (অবশ্য মাইন এবং অন্যান্য আমেরিকান- ঠিকাদার-ফার্মের বিল শোধ করার পর), যাতে তারা চিরজীবনের জন্য তাদের ঋণদাতা ও পাওনাদার-মহাজনদের কাছে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকে। এতদ্ব্যতিত যখন আমাদের কোনো সুবিধার প্রয়োজন হবে তারা আমাদেরকে সহজ লক্ষ্যবস্তু উপহার দেবে, যেমন সামরিক ঘাটি, জাতিসংঘে আমাদের পক্ষে ভোট, বা জ্বালানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে আমাদের অগ্রাধিকার।

সে আরও বলল, আমার কাজ বা দায়িত্ব হচ্ছে একটি দেশে হাজার হাজার কোটি ডলার লগ্নি করার কি ফলাফল হবে তার ভবিষ্যদ্বানী করা। বিশেষ করে, আমি গবেষনা-লব্ধ তথ্য পেশ করব যেখানে আগামী বিশ থেকে পঁচিশ বছরের ভবিষ্যত- অর্থনৈতিক ক্রমবৃদ্ধির প্রতিফলন থাকবে। এতে থাকবে বিভিন্ন ধরনের প্রকল্পের প্রভাব ও পরিণামের মুল্যায়ন। উদাহারন: যদি কোনো দেশকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দেয়া হয় এই শর্তে যে তার নেতৃবৃন্দ সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে মিত্রতা করবে না, আমি তখন নানাবিধ প্রকল্পের মধ্যে তুলনামূলক পর্যালোচনা করে সে ঋণটি লগ্নি করার যথার্থতা বিশ্লেষন করব। যেমন, শক্তি-কেন্দ্র (বিদ্যুত) বা একটি নতুন জাতীয় রেলসড়ক নির্মান, বা একটি টেলিকম্যুনিকেশন-পদ্ধতি? এর মধ্যে কোনটি সবচাইতে লাভজনক ? বা আমাকে বলা হতে পারে, দেশটিকে একটি আধুনিক ইলেক্ট্রিক পাবলিক-সার্ভিস পদ্ধতি গ্রহনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে আমার দায়িত্ব হল এ ধরনের একটি পদ্ধতির পরিণামে কি যথেষ্ট অর্থনৈতিক বৃদ্ধির নিশ্চয়তা আছে ? তা প্রদর্শন করা। অর্থাৎ এ ঋণটি কেন উপযুক্ত তার ন্যায্যতার প্রত্যক্ষ প্রমাণ দেয়া। সঙ্কটপূর্ণ দিকটি ছিল গড় জাতীয় উৎপাদন, যা (এঘচ) প্রতিটি ঋণের সাথেই সংশ্লিষ্ট। সর্বোচ্চ বাৎসরিক গড় আয় (এঘচ) যে প্রকল্পটির ফলাফল, সেই জয়লাভ করে। যদি একটি মাত্র প্রকল্প বিবেচনা করা হয় তাহলে আমাকে প্রমান করতে হবে পরিধি বড় করা হলে, জাতীয় গড় আয়ের প্রবৃদ্ধিতে এটা বিরাট ভুমিকা পালন করবে।

এই সব প্রকল্পের প্রতিটির অকথিত সম্ভাবনা হল, তারা আসলে ঠিকাদারদের জন্য বিশাল পরিমানে লাভের ক্ষেত্র প্রস্তুত করবে। এতে ঋণ-গ্রহীতা দেশের সামান্য কয়েকটি প্রভাবশালী পরিবার খুবই সুখী হবে। পরিণামে দেশটির দীর্ঘকালিন অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নিশ্চিত। সাথে সাথে পৃথিবীর সর্বত্র রাষ্ট্র-সরকারের রাজনৈতিক আনুগত্যও। ঋণের পরিমান যত বেশি, ততই মঙ্গল। সত্য হল, ঋণের বোঝা একটি দেশের উপরে চাপিয়ে দেয়া হয়, যার ফলে এর দরিদ্রতম নাগরিকরা স্বাস্থ্য, শিক্ষা, এবং অন্যান্য সামাজিক সেবা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে আসন্ন অনেক দশকের জন্য বঞ্চিত থাকে, যা কখনই বিবেচনা করা হয় না।

ক্লডিন এবং আমি খোলাখুলিভাবে জিএনপির প্রতারণামুলক প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি। যেমন: যখন মাত্র একজন লাভবান হয় তখনও জিএনপির বৃদ্ধি হতে পারে, যার মালিকানায় একটি পাবলিক-সার্ভিস কোম্পানি আছে। অপরদিকে অধিকাংশ জনসাধারন তখন ঋণভারে জর্জরিত। ধনীর সম্পদ ক্রমেই বৃদ্ধি পায়, গরিব আরও বেশি গরিব হয়। তবুও সংখ্যাতত্তে¡র দৃষ্টিতে একে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে নথিভুক্ত করা হয়।

সাধারন আমেরিকান নাগরিকদের মত, অধিকাংশ মাইন-কর্মচারী বিশ্বাস করে যখন আমরা বিদ্যুত-কেন্দ্র, মহসড়ক, এবং বন্দর তৈরি করি, আমরা সে সব দেশের উপকার করি। আমাদের স্কুল এবং সংবাদপত্র এই শিক্ষা দিয়েছে, ভাবতে হবে আমাদের সমস্ত কাজকর্মই পরহিতব্রতী, ‘পরের কারনে স্বার্থ দিয়া বলি”। বছরের পর বছর আমি এ ধরনের মন্তব্য বহুবার শুনেছি, “তারা যদি আমেরিকার পতাকা পোড়ায়, এবং আমাদের দুতাবাসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে, তাহলে আমরা তাদের অভিশপ্ত দেশ থেকে বেরিয়ে আসি না কেন ? তারা নিজেদের দরিদ্রতার কাদার মধ্যে গড়াগড়ি খেতে থাক”।

যারা এসব কথা বলে তাদের অনেকেই উচ্চশিক্ষার সার্টিফিকেটধারী। যাই হোক, এসব লোকদের কাছে এ সত্যটি অজানা, সারা পৃথিবীতে আমরা দুতাবাস প্রতিষ্ঠা করি একান্তই আমাদের নিজস্ব স্বার্থে। এটাই প্রধান কারন। গত বিংশ শতাব্দির অর্ধেক সময়ে যার অর্থ ছিল, আমেরিকান প্রজাতন্ত্রকে একটি বিশ্বব্যাপি সা¤্রাজ্যে পরিনত করা। যতই ডিগ্রিধারী হোক, এ ধরনের মন্তব্য যারা করে তারা অষ্টাদশ শতকের উপনিবেশবাদিদের মতই অশিক্ষিত, যারা বিশ্বাস করত, যে সমস্ত রেড ইন্ডিয়ানরা তাদের বাসভুমি রক্ষা করার জন্য সংগ্রাম করে তারা শয়তানের দাস।

কয়েক মাসের মধ্যেই আমি ইন্দোনেশিয়ার জাভা দ্বীপে রওনা হব। সে সময়ে এটি ছিল পৃথিবী নামক গ্রহের সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ স্থাবর-সম্পত্তির একটি অংশ। ইন্দোনেশিয়া একটি মুসলিম জাতি অধ্যুষিত, তেলসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ। তবে দেশটি কম্যুনিষ্ট-কার্যকলাপের একটি উর্বর এলাকা।

“এ দেশটি ভিয়েতনামের পরবর্তী ডোমিনো”, এভাবেই ক্লডিন এর ব্যাখ্যা দিল। “আমাদের ইন্দোনেশিয়াকে জয় করতেই হবে। দেশটি যদি কম্যুনিস্ট-বøকে যোগ দেয়, তবে”– সে তার গলার চারদিকে একটি আঙ্গুল ঘুরালো তারপর মিষ্টি করে হাসল। “আমাদের কথা হল, তোমাকে অবশ্যই একটি প্রচÐ আশাবাদী অর্থনৈতিক ভবিষ্যদ্বানী নিয়ে আসতে হবে, নতুন সমস্ত শক্তি-কেন্দ্রগুলি ও সরবরাহ-লাইন নির্মিত হবার পর কিভাবে ব্যাঙের ছাতার মত উন্নয়ন চারদিকে গজিয়ে উঠবে। তাহলেই আমেরিকান সাহায্য-সংস্থা (টঝ-অওউ) ও আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলি ঋণের ন্যায়সঙ্গতা সম্পর্কে অবগত হবে। তোমাকে ভালোমত পুরস্কৃত করা হবে। অবশ্য পরে অন্যত্র আরও সব চমকপ্রদ ও উত্তেজক প্রকল্পগুলিতে কাজ করতে পারবে। সারা পৃথিবীই তোমার বাজার করার ট্রলি হবে”। সে আমাকে সাবধান করল, আমার ভুমিকা খুবই কঠিন হবে। ব্যাংকের বিশেষজ্ঞরা তোমার পিছু নেবে। তাদের কাজ হল তোমার ভবিষ্যদ্বানীতে ছিদ্র করা। এসব করার জন্যই তাদের বেতন দেয়া হয়। তোমার চেহারা খারাপ করতে পারলে ওদের চেহারা সুন্দর হবে।

একদিন আমি ক্লডিনকে মনে করিয়ে দিলাম, মাইন যে দলটি জাভাতে পাঠাচ্ছে, তাতে আমি ছাড়াও আরো দশজন আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম তারা সবাই কি আমার মত একই রকম প্রশিক্ষণ পাচ্ছে। না ! সে আমাকে আশ্বাস দিল।

“তারা সবাই ইঞ্জিনিয়ার”, জানাল সে। “তারা শক্তি-কেন্দ্র, ট্র্যান্সমিশন এবং সরবরাহ-লাইন, সামুদ্রিক বন্দর এবং জ্বালানি তেল আনার জন্য রাস্তার নকশা বানায়। তুমি সেই ব্যক্তি যে এই নিয়ে ভবিষ্যদ্বানী করবে। তোমার ভবিষ্যদ্বানী নির্ধারন করবে কোন পদ্ধতি তারা ডিজাইন করবে, তাদের আকার ও প্রকার- এবং ঋণের পরিমান। দেখছ তো, তুমি হলে আসল চাবিকাঠি।”

এরপর যখনই আমি ক্লডিনের এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এসেছি, আমি নিজে নিজেই বিষ্মিত হয়ে ভাবতাম, আমি কি সঠিক কাজ করছি। হৃদয়ের অন্তস্থলে কোথাও আমার সন্দেহ ছিল, আমি ঠিক করছি না। কিন্ত আমার অতীতের হতাশা আমাকে তাড়া করত। মনে হত মাইন আমাকে সব কিছুই দিচ্ছে, যেসব থেকে আমার জীবন এতদিন বঞ্চিত ছিল। তবুও আমি নিজেকে সব সময় প্রশ্ন করতাম, এ কাজটি মিষ্টার টম পেইন অনুমোদন করতেন কিনা। অবশেষে, আমি আমাকে বোঝালাম- বেশি করে শিখে এবং তার মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন করার পরই আমি ভালোমত সবকিছু অনাবৃত করতে পারব। সেই পুরোনো যুক্তি, ‘ভেতরে থেকে কাজ করে ভালোমত সব জানো’।

ক্লডিনের কাছে আমার এই ধারনাটি যখন বললাম, সে আমার দিকে হতভম্বের মত তাকাল। “বোকামী করো না। একবার তুমি ভেতরে এসে গেলে, কখনই তুমি আর বেরোতে পারবে না। আরও গভীরে যাবার আগে তোমার নিজের জন্যই তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে”। আমি তার কথা বুঝলাম, এবং সে আমাকে যা বলল, আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বেরিয়ে এসে আমি হেটে কমনওয়েলথ এভিনিউতে এসে তারপর ডার্টমাউথ স্ট্রিটের দিকে গেলাম। নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, আমি একটি ব্যতিক্রম।

কয়েকমাস পরে একদিন অপরাহ্নে আমি ও ক্লডিন জানালার পাশে সোফায় বসে বাইরে বোস্টন স্ট্রিটে বরফপাত দেখছিলাম। “আমরা একটি ক্ষুদ্র, সীমাবদ্ধ ও বিশিষ্ট ক্লাব ব্যতীত আর কিছু নয়।” সে বলল। “আমাদের বেতন খুব ভালো- সারা পৃথিবীর সমস্ত দেশে হাজার হাজার কোটি ডলারের প্রতারণা করার ব্যবসা। তোমার কাজের একটি বৃহৎ অংশ হল, পৃথিবীর নেতাদেরকে একটি বিশাল নেটওয়ার্কে যোগ দেবার জন্য অনুপ্রাণিত করা। এই নেটওয়ার্ক আমেরিকার বানিজ্যিক স্বার্থ সংগঠিত ও বর্দ্ধিত করে। সবশেষে এই সব নেতৃবৃন্দ ঋণের মাকড়শার জালের ফাঁদে পড়ে যায়। এরপর তাদের আনুগত্য নিশ্চিত। তাদের আর পালাবার পথ নেই। আমাদের ইচ্ছানুযায়ী যখন খুশি আমরা তাদের যদৃচ্ছা ব্যবহার করতে পারি। যা আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বা সামরিক প্রয়োজনকে সন্তুষ্ট রাখে। বদলে, এইসব নেতারা তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পোক্ত করার সুযোগ পায়। জনসাধারনের জন্য তারা শিল্প ও বানিজ্যিক নগরী, বিদ্যুত-কেন্দ্র, এবং বিমানবন্দর নির্মান করে। ইত্যবসরে আমেরিকান ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলি অত্যন্ত ঐশ্বর্যশালী হয়ে উঠে”।

সেই বিকেলে ক্লডিনের এপার্টমেন্টের স্বপ্নঅলস প্রেক্ষাপটে জানালার পাশে বসে বিশ্রাম নেবার সময় যে পেশাটি আমি শীঘ্রই গ্রহন করব তার ইতিহাস জানতে পারলাম। বাইরে তাকিয়ে দেখছি কুন্ডলী পাকিয়ে বরফ পড়ছে। ক্লডিন বর্ণনা করল ইতিহাসের অধিকাংশ সময়ে কেমন করে সা¤্রাজ্য গঠিত হয়েছে। বেশীর ভাগ সেনাবাহিনীর জোরে বা এর হুমকিতে। কিন্ত দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে, সোভিয়েট ইউনিয়নের অভ্যুদয় এবং পরে আনবিক ধ্বংসলীলার অপচ্ছায়া, সব মিলিয়ে সামরিক সমাধান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গেল।

১৯৫১ সালে এল চুড়ান্ত মুহূর্তটি। যখন ইরান একটি ব্রিটিশ তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। যে কোম্পানি ইরানের প্রাকৃতিক সম্পদ এবং জনসাধারনকে শোষন করছিল। ব্রিটিশ পেট্রোলিয়ামের পুর্বসুরি ছিল এই কোম্পানি। আজ যা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপি (ইচ) নামে পরিচিত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত ইরানের অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী, মোহাম্মদ মোসাদ্দেক (১৯৫১ সালের টাইম ম্যাগাজিনের ‘ম্যান অব দা ইয়ার“) এর জবাবে ইরানের সমস্ত তেল সম্পদকে জাতীয়করন করেছিলেন। ক্রুদ্ধ ইংল্যান্ড দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মিত্র, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য কামনা করল। তবে দুই দেশেরই ভয় ছিল, ইরানের পক্ষে পাল্টা সামরিক ব্যবস্থা গ্রহন সোভিয়েট ইউনিয়নকে উস্কানি দেবে।

কাজেই যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর বদলে, ওয়াশিংটন সিআইএ এজেন্ট কারমিট রুজভেল্টকে (প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের নাতি) প্রেরণ করল। সে খুবই দক্ষতার সঙ্গে তার কাজ করেছিল। মোটা টাকা এবং হুমকির বিনিময়ে সে বেশ কিছু লোকজনের মন জয় করে, রাস্তায় রাস্তায় একের পর এক দাঙ্গা হাঙ্গামা এবং হিংসাত্বক বিক্ষোভ সংগঠিত করল। এইসব ঘটনায় ধারনার সৃষ্টি হল, মোসাদ্দেক অজনপ্রিয় এবং অযোগ্য। অবশেষে মোসাদ্দেকের পতন হয়ে গেল। বাকি জীবনটা তার গৃহবন্দী হয়ে কাটাতে হয়েছে। পরিণামে আমেরিকার সমর্থক মোহাম্মদ রেজা শাহ পেহলভী অপ্রতিদ্ব›িদ্ব একনায়ক রূপে আত্বপ্রকাশ করেছিল। কারমিট রুজভেল্ট একটি নতুন পেশার মঞ্চ স্থাপন করেছিল। যে পেশার একটি শাখায় আমি যোগদান করছি।

রুজভেল্টের দাবার চাল মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন ভাবে রূপদান করেছিল। যদিও প্রাচীন প্রথায় সা¤্রাজ্য স্থাপনের সমস্ত রীতি নীতিই এতে বাতিল হয়ে গিয়েছিল। এ ঘটনাটি ‘যুগপৎ’ ঘটেছিল ‘সীমাবদ্ধ নন-নিউক্লিয়ার সামরিক-প্রক্রিয়া‘ গ্রহনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার সাথে। যার নিদারুন পরিণাম- কোরিয়া ও ভিয়েতনামে আমেরিকার অবমাননা। ১৯৬৮ সালে, যে বছর আমি এনএসএতে ইন্টারভিউ দেই, এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, যদি আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র তার বিশ্বব্যাপি সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে চায় (প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং জনসনের মত ব্যক্তি মনে মনে যার ছবি এঁকেছিলেন) তাকে অবশ্যই রুজভেল্টের ইরানী উদাহরনের নীল-নকশার কলাকৌশল অবলম্বন করতে হবে। আনবিক অস্ত্রের হুমকি ছাড়াই সোভিয়েট ইউনিয়নকে পরাজিত করার এটাই একমাত্র পথ।

তবে একটা সমস্যা ছিল। কারমিট রুজভেল্ট ছিল একজন সিআইএ-কর্মচারী। সে যদি ধরা পড়ত, পরিণাম খুবই শোচনীয় হত। সে আমেরিকার বাদ্য-যন্ত্রীগোষ্ঠির প্রথম সঙ্গীতের রচয়িতা, যার সাহায্যে একটি বিদেশী সরকারের উৎখাত সম্ভব হয়েছিল। ভবিষ্যতে এটাই স্বাভাবিক যে আরও অনেক সরকারের পতন ঘটবে। কিন্ত এমন একটি চিত্রনাট্য দরকার যাতে ওয়াশিংটনকে সরাসরি দায়ী করা যাবে না।

সৌভাগ্যক্রমে কলাকৌশলের জন্য ১৯৬০ দশকে আরেক ধরনের বিপ্লবের সুচনা হয়েছিল; আন্তর্জাতিক কর্পোরেশন ও বহুজাতিক সংগঠনগুলির ক্ষমতায়ন। যেমন: বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ। আইএমএফ মুলত: আমেরিকা এবং ইউরোপে আমাদের সহযোগী সা¤্রাজ্য-নির্মাতাদের টাকায় চলে। মুলধন এখান থেকেই আসে। সরকার, কর্পোরেশন এবং বহুজাতিক সংগঠনগুলির মধ্যে একটি প্রতিকী সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়।

‘যে সময়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের বানিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছি, ‘সিআইএ এজেন্ট হিসেবে রুজভেল্ট-সমস্যাটির‘ ইতিমধ্যে একটি সমাধান বের করা হয়ে গিয়েছিল। আমেরিকার গোয়েন্দা বিভাগগুলি- এনএসএ সহ- সম্ভাবনাময় ইএইচএমদের সনাক্ত করবে। পরে তাদেরকে আন্তর্জাতিক কর্পোরেশনগুলি নিয়োগ করতে পারবে। এই ইএইচএমরা কখনই সরকারি বেতন পাবে না। এর বদলে তারা তাদের বেতন সরাসরি বেসরকারি সেক্টর থেকে গ্রহন করবে। ফলে, তাদের নোংরা কাজকর্ম যদি উন্মুক্ত হয়ে যায় তাহলে কর্পোরেটদের লোভী মনোভাব এইজন্য দায়ী বলে চিহ্নিত করা হবে, সরকারি নীতি নয়। উপরন্তু, তাদেরকে কর্পোরেশন নিযুক্তি দিয়েছে, যদিও এই সব সংস্থা সরকারি বিভিন্ন এজেন্সি এবং তাদের বহুজাতিক ব্যাংকিং-প্রতিমূর্তি (ঈড়ঁহঃবৎঢ়ধৎঃ) দের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য পেয়ে থাকে। (জনসাধারনের প্রদত্ত ট্যাক্স সহ) এতদ্ব্যতীত কংগ্রেস-প্রতিনিধিদের দৃষ্টি, জনতার নিরীক্ষা থেকে এসব আড়াল করে রাখা হয়। বর্ম হল একটি ক্রমবর্ধমান আইনি পদক্ষেপের অনেক শিখন্ডি। এর মধ্যে আছে, ট্রেডমার্ক, আন্তর্জাতিক ব্যবসা, এবং তথ্য-আইনের স্বাধীনতা।

“কাজেই তুমি দেখছো”, ক্লডিন তার বক্তব্য সমাপ্ত করার সময় বলল, “একটি গর্বিত ঐতিহ্যের আমরা শুধুমাত্র দ্বিতীয় প্রজন্ম, যার শুরু হয়েছিল যখন তুমি ক্লাস ওয়ানের ছাত্র ছিলে”।

চলবে …

আরো পড়ুন : ইকোনমিক হিটম্যান : পর্ব-১

You might like