

ক্ষুদীরাম দাস :
বাংলাদেশের রূপালী সম্পদ, বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম ধারক আমাদের প্রিয় ইলিশ। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, রূপসা আর সাগরের উত্তাল ঢেউ পেরিয়ে বাঙালির খাবারের পাতে যে মাছটি এক অনন্য রাজকীয় তৃপ্তি এনে দেয়, তা হলো ইলিশ। এটি শুধু একটি মাছ নয়; এটি আমাদের ঐতিহ্য, অর্থনীতি, সাহিত্য ও জীবিকার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা এক অমূল্য উপহার। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় নানা প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে আমাদের এই রূপালী সম্পদ আজ নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রধানত প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ শিকারের কারণে প্রতিবছর কোটি কোটি ইলিশের রেণু ও পোনা নষ্ট হচ্ছে। এতে করে যেমন সাগরে ও নদীতে ইলিশের বিচরণ কমছে, তেমনি বিপন্ন হচ্ছে জলজ ইকোসিস্টেম। এই প্রেক্ষাপটে মা ইলিশ সংরক্ষণ করা এখন আর কোনো সাধারণ সরকারি উদ্যোগের বিষয় নয়; এটি আমাদের সার্বিক অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও জাতীয় দায়বদ্ধতার অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসুন, আজ আমরা গভীর অনুসন্ধানী চোখে দেখি কেন এবং কীভাবে আমরা মা ইলিশ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারি।
ইলিশ একটি অদ্ভুত ও বিস্ময়কর জলজ প্রাণী। এরা মূলত সমুদ্রের নোনা জলের মাছ হলেও প্রজননের সময় এরা স্বাদু পানিতে ছুটে আসে। এই পরিযায়ন বা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া প্রকৃতি ও জীববিজ্ঞানের এক চরম অলৌকিকতা। পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সারা বছর বঙ্গোপসাগরের নোনা পানিতে ঘুরে বেড়ায়। যখন তাদের দেহে ডিম পরিপক্ক হওয়ার সময় আসে, তখন এরা মিষ্টি পানির টানে সমুদ্র থেকে নদীপথের দিকে উজানে যাত্রা শুরু করে। এই যাত্রাপথ কিন্তু সহজ নয়; নদীর তীব্র স্রোত ও প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে এরা শত শত কিলোমিটার পথ সাঁতরে পাড়ি দেয়। ডিম ছাড়ার পরিমাণ ও পোনার বৃদ্ধি: একটি পূর্ণবয়স্ক মা ইলিশ এক মৌসুমে তার ওজন অনুযায়ী ৩ লাখ থেকে শুরু করে ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। নদী ও সাগরের মোহনার মিষ্টি পানিতে এই ডিমগুলো ফুটে ক্ষুদ্র ‘জাটকা’ বা ইলিশ পোনার জন্ম হয়। পোনাগুলো নদীতে কয়েক মাস বড় হয়ে আবার সাগরের বিশাল জলরাশিতে ফিরে যায়। এই প্রজনন চক্রটির একটি শিকল যদি কোনো কারণে ভেঙে যায়, তবে তার প্রভাব পড়ে পুরো ইলিশ উৎপাদনে। যদি ডিম ছাড়ার আগেই একটি মা ইলিশ ধরা পড়ে, তবে আমরা শুধু একটি মাছকেই হারাচ্ছি না, বরং তার ভেতরের লাখ লাখ সম্ভাব্য ইলিশের জন্মকেও অংকুরে বিনষ্ট করছি।

আমাদের দেশে মা ইলিশ রক্ষার জোর প্রচেষ্টা থাকলেও এখনও বেশ কিছু ভয়াবহ বাধা মা ইলিশের স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধিকে দারুণভাবে ব্যাহত করছে। এসব সংকটের পেছনে রয়েছে মানুষের অপরিনামদর্শিতা এবং প্রকৃতির পরিবর্তন। নিষেধাজ্ঞার সময়টিতে জলসীমায় পাহারা বাড়ানো সত্ত্বেও একশ্রেণীর অসাধু জেলে ও মুনাফালোভী ব্যবসায়ী গোপনে মা ইলিশ শিকার করে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে নদীতে জাল ফেলে গর্ভবতী মা ইলিশ ধরে বাজারে বা গোপনে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এই সামান্য লোভে হাজার কোটি টাকার ভবিষ্যতের সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায়। অত্যন্ত সূক্ষ্ম সুতার নিষিদ্ধ ‘কারেন্ট জাল’ এবং নদীর তলদেশে পাতা ‘চায়না দুয়ারী জাল’ নদীগুলোতে বিষফোড়ার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এসব জালে মা ইলিশের পাশাপাশি একদম ছোট জাটকাগুলোও আটকা পড়ে। মা ইলিশ ডিম ছাড়ার জায়গা খোঁজার আগেই এই মারাত্মক ফাঁদে পড়ে প্রাণ হারায়। আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। নদ-নদীতে উজান থেকে আসা পলি জমে চর জেগে উঠছে, যার ফলে নদীর স্বাভাবিক নাব্য ও গভীরতা কমে যাচ্ছে। ইলিশ গভীর ও স্রোতস্বিনী পানি ভালোবাসে। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং পানিতে দূষণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ইলিশ তার কাঙ্ক্ষিত প্রজনন ক্ষেত্র খুঁজে পায় না। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরের পানির তাপমাত্রা এবং লবণাক্ততার ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে। বৃষ্টির সঠিক সময়ে অনিশ্চয়তা ইলিশের প্রজনন ঋতুকে কিছুটা ওলটপালট করে দিচ্ছে। সময়মতো বৃষ্টি না হলে বা নদীর পানির রাসায়নিক গঠন পরিবর্তিত হলে মা ইলিশ স্বাচ্ছন্দ্যে ডিম ছাড়তে পারে না। মা ইলিশ রক্ষা কেবল একটি প্রজাতি বাঁচিয়ে রাখার বিষয় নয়; এটি আমাদের দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পুষ্টিজনিত নিরাপত্তার সাথে গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ইলিশ উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত মোট ইলিশের সিংহভাগই আমাদের দেশে উৎপাদিত হয়। ইলিশ আমাদের জিডিপিতে (এউচ) একটি বড় অংশ অবদান রাখে। তাছাড়া, ইলিশ বিদেশে রফতানি করে প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। মা ইলিশ রক্ষা না করলে এই বিশাল রাজস্ব আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। উপকূলীয় ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলের লাখ লাখ জেলে পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ইলিশ মাছ শিকার, পরিবহন, বরফজাতকরণ ও বিপণনের সাথে যুক্ত। ইলিশের উৎপাদন ভালো হলে এই পরিবারগুলোর মুখে হাসি ফোটে। মা ইলিশ সংরক্ষণ করে সাগরে ইলিশের সংখ্যা বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে এই জেলেদের জীবিকাই সুসংহত হয়। ইলিশ মাছ উচ্চমানের প্রোটিন, ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন-ডি এবং নানা ধরনের খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে এবং মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়াতে ওমেগা-৩ দারুণ ভূমিকা রাখে। দেশের সাধারণ জনগণের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ইলিশের বড় ভূমিকা রয়েছে। “মাছে-ভাতে বাঙালি”— এই প্রবাদের মূল প্রতীকই যেন ইলিশ। বৈশাখী উৎসব থেকে শুরু করে যেকোনো পারিবারিক বা ধর্মীয় আপ্যায়ন, ইলিশ ছাড়া বাঙালির ভোজ যেন অসম্পূর্ণ থাকে। সাহিত্য, গান ও চলচ্চিত্রে ইলিশ এক অনন্য রূপক হিসেবে বারবার উঠে এসেছে। আমাদের এই সাংস্কৃতিক ধারাটি টিকিয়ে রাখতে হলে মা ইলিশ রক্ষা করা জরুরি। মা ইলিশ রক্ষার মূল মন্ত্র হলো— “প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, কেনা, বেচা ও পরিবহন বন্ধ রাখা।” এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।
সরকার প্রতিবছর আশ্বিনের পূর্ণিমাকে ভিত্তি করে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে থাকে। এই সময়টিতে নদী ও সাগরে নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড, র্যাব এবং মৎস্য অধিদপ্তরের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। ড্রোন এবং স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্যে নদীর দুর্গম পয়েন্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানো যেতে পারে। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন জেলেদের উপার্জন পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ফলে পেটের তাগিদেই অনেক জেলে বাধ্য হয়ে গোপনে নদীতে নামেন। তাই এই সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্যা সহায়তা (ঠএঋ চাল) সঠিকভাবে এবং সময়মতো পৌঁছানো অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া বিকল্প কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ঋণের সুযোগ দিলে তারা অপরাধমূলক মাছ শিকারে উৎসাহিত হবেন না। আইন প্রয়োগের চেয়েও বেশি কার্যকর হলো সামাজিক সচেতনতা। যখন কোনো ভোক্তা প্রজনন মৌসুমে ইলিশ কেনা বন্ধ করে দেবেন, তখন চোরা শিকারিরাও মাছ ধরতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। “মা ইলিশ ধরবো না, বাজারেও কিনবো না”— এই প্রতিজ্ঞা প্রতিটি নাগরিককে নিতে হবে। ইলিশের প্রজননক্ষেত্রগুলো রক্ষা করতে নদী ড্রেজিং বা পলি অপসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। নদীদূষণ রোধে শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে। নাব্য ও পরিচ্ছন্ন পানি বজায় থাকলে মা ইলিশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ডিম ছাড়তে উৎসাহিত হবে।
ইলিশ শুধু আমাদের খাদ্য তালিকায় একটি পদ নয়, এটি আমাদের জাতীয় অহংকার। আমরা যদি এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা না করি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জাদুঘরে বা ছবিতে রূপালী ইলিশ দেখবে। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই মা ইলিশ সুরক্ষার মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে এক হয়ে মা ইলিশ রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো যেতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় উঠান বৈঠক ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে জেলে পরিবারগুলোকে বোঝাতে হবে যে, আজকের মা ইলিশটি বাঁচতে দিলে আগামীতে তাদেরই জাল ভরে উঠবে বড় বড় ইলিশে।
মা ইলিশ সংরক্ষণ একটি মহৎ জাতীয় সামাজিক আন্দোলন। আমাদের দেশের জলাশয় ও নদীগুলো রূপালী মাছে ভরপুর থাকুক, জেলের মুখে ফুটে উঠুক অকৃত্রিম হাসির ঝিলিক, আর বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতি বজায় থাকুক যুগে যুগে— এটাই আমাদের কাম্য। সামান্য লোভ ও অসচেতনতার কারণে যেন আমাদের এই অমূল্য জাতীয় সম্পদ ধ্বংস হয়ে না যায়। আসুন, আমরা সরকারের আইনি উদ্যোগকে পূর্ণ শ্রদ্ধা জানাই, প্রজনন মৌসুমে সব ধরনের মা ইলিশ কেনাবেচা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকি এবং মা ইলিশ সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা রাখি। মা ইলিশ বাঁচলে বাঁচবে আমাদের রূপালী সম্পদ, সমৃদ্ধ হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আসুন মা ইলিশ রক্ষা করি।
প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














