জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস জাভেদ আর নেই: শোকের ছায়া বিনোদন অঙ্গনে

বিনোদন প্রতিবেদক :

বাংলাদেশের বিনোদন জগতে নেমে এসেছে গভীর শোক। জনপ্রিয় অভিনেতা ইলিয়াস জাভেদ আর নেই। মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (পারিবারিক সূত্রে নিশ্চিত)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন।

অভিনয় জীবনের শুরু

ইলিয়াস জাভেদ অভিনয় শুরু করেন আশির দশকে, মঞ্চনাটকের মাধ্যমে। তার অভিনয় দক্ষতা, সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং চরিত্রে ডুবে যাওয়ার ক্ষমতা তাকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। পরে তিনি টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে নিয়মিত অভিনয় করতে থাকেন। তার প্রথম টিভি নাটক “অন্তরাল” ছিল দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে। এরপর “নিঃশব্দ রাত”, “আলো ছায়া”, “জীবনের গল্প”সহ অসংখ্য নাটকে তিনি অভিনয় করেন।

চলচ্চিত্রে অবদান

চলচ্চিত্রে ইলিয়াস জাভেদের উপস্থিতি ছিল সীমিত কিন্তু স্মরণীয়। তিনি মূলত পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করলেও তার অভিনয় ছিল এতটাই প্রাণবন্ত যে দর্শকরা তাকে আলাদাভাবে মনে রাখতেন। “নির্জন পথ”, “শেষ চিঠি”, “আলোর সন্ধানে” ছবিগুলোতে তার অভিনয় প্রশংসিত হয়।

টেলিভিশন ও দর্শকপ্রিয়তা

নব্বইয়ের দশকে তিনি টেলিভিশনের নিয়মিত মুখ হয়ে ওঠেন। তার অভিনীত ধারাবাহিক “ঘর সংসার” এবং “নাট্যঘর” ছিল তুমুল জনপ্রিয়। তিনি ছিলেন একজন বহুমাত্রিক অভিনেতা—রোমান্টিক, ট্র্যাজিক, কমেডি, নেতিবাচক—সব ধরনের চরিত্রে সাবলীল। দর্শকরা তার সংলাপ বলার ভঙ্গি, চোখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের গভীরতায় মুগ্ধ হতেন।

সহকর্মীদের স্মৃতিচারণ

তার মৃত্যুতে সহকর্মীরা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ বলেন, “ইলিয়াস ভাই ছিলেন আমাদের প্রেরণা। তিনি শুধু অভিনয় করতেন না, চরিত্রকে বাঁচিয়ে তুলতেন।”

অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া বলেন, “তার সঙ্গে কাজ করা ছিল এক ধরনের শিক্ষা। তিনি ছিলেন বিনয়ী, মেধাবী এবং অত্যন্ত পেশাদার।”

 ব্যক্তিগত জীবন

ব‍্যক্তি জীবনে তিনি ১৯৮৪ সালে চিত্রনায়িকা ডলি চৌধুরীকে বিয়ে করেন।

ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন একজন সাদামাটা মানুষ। অভিনয়ের বাইরে তিনি পরিবারকে সময় দিতেন, বই পড়তেন এবং তরুণ শিল্পীদের উৎসাহ দিতেন। তার স্ত্রী, দুই ছেলে এবং এক মেয়ে রয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ পিতা, দায়িত্বশীল স্বামী এবং সমাজসচেতন নাগরিক।

 শেষ বিদায়

তার মৃত্যুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোকের ঢল নেমেছে। অনেকেই লিখেছেন, “তিনি ছিলেন আমাদের জীবনের অংশ। তার অভিনয় আমাদের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।” তার জানাজা অনুষ্ঠিত হবে বুধবার বিকেলে, ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হবে।

 শিল্পী সমাজের প্রতিক্রিয়া

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, টেলিভিশন শিল্পী সংঘ, চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি—সবাই তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে।
একাডেমির মহাপরিচালক বলেন, “ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন একজন সংস্কৃতির সৈনিক। তার অবদান চিরস্মরণীয়।”
শিল্পী সংঘের সভাপতি বলেন, “তিনি ছিলেন আমাদের অভিভাবক। তার অভাব পূরণ হওয়ার নয়।”

দর্শকদের মননে

ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন এমন একজন অভিনেতা, যিনি চরিত্রের গভীরে গিয়ে অভিনয় করতেন।
তিনি কখনো সংলাপের বাহারে নয়, বরং চোখের ভাষায় দর্শকের হৃদয় জয় করতেন।
তার অভিনীত “নিঃশব্দ রাত” নাটকে এক বাক্য ছিল—“চুপ থাকাই কখনো কখনো সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।”
এই সংলাপ আজও দর্শকদের মনে গেঁথে আছে।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা

তরুণ অভিনেতাদের কাছে তিনি ছিলেন এক জীবন্ত পাঠশালা।
অনেকেই বলেন, “ইলিয়াস জাভেদ ছিলেন আমাদের অভিনয়ের শিক্ষক। তার কাজ দেখে আমরা শিখেছি কীভাবে চরিত্রে প্রাণ দিতে হয়।”
তার জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

সম্মাননা ও পুরস্কার

তিনি পেয়েছেন জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার, মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি সম্মাননা সহ বহু পুরস্কার।
তবে তিনি কখনো পুরস্কারের পেছনে ছুটেননি।
তিনি বলতেন, “দর্শকের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।”

ইলিয়াস জাভেদের মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
তিনি ছিলেন একজন শিল্পী, যিনি শুধু অভিনয় করতেন না—তিনি সমাজের আয়না তুলে ধরতেন।
তার বিদায়ে আমরা হারালাম একজন গুণী মানুষ, একজন সংস্কৃতির ধারক ও বাহক।

প্রকাশিত : বুধবার, ২১ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy