সেই কালো ভূত : সোহানুর রহমান অনন্ত

এক শীতের ঘটনা। বরাবরের মতো ঢাকায় শীত ততটা বোঝা না গেলেও দেশে হাট্টি কাপানো শীত চলছিলো। সন্ধ্যা হলেই চারিদিক ফাঁকা হয়ে যায়, যে যার ঘরে গিয়ে অবস্থান করে। বাড়ির উঠানে খরকুটা দিয়ে আগুন জ্বেলে তার চারপাশ গিরে বসে। গ্রামে থাকাকালীন অবস্থায় খুব দুষ্ট ছিলাম। সারাদিন পাড়ায় পাড়ায় বন্ধুদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতামা। আমাদের বন্ধুদের একটা ঐতিহ্য আছে। প্রতিদিন রাতে কাঁচা রস না খেলে আমাদের ঘুম হয়না। আর রাতের বেলা তো আর কেউ রস বিক্রি করে না তাই বাধ্য হয়ে চুরি করেই খাই। এরি মধ্যে ভুট্টখানের মাথার লালাবাতি জ্বলে উঠেছে। ভুট্টখান হচ্ছে আমাদের গ্রামের গাছি। গাছে হাড়ি দিয়ে তিনি রস বিক্রি করেন। আমাদের গ্রামের শেষেপ্রান্তে বড় একটা খেজুর বাগান আছে। ভুট্টখানের অনেক সাহস, একা একা সেই খেজুর বাগানে থেকে পাহাড়া দেয়। ইদনিং খুব কড়াকাড়ি পাহাড়া দিচ্ছেন রস চোর ধরার জন্য।

গ্রামে বেশ তোলপাড় পরে গেছে রস চোরদের ধরার জন্য। সেদিন ছিল সোমবার, সন্ধ্যা বেলা আমরা রস চুরির জন্য বের হয়েছি। খেজুর বাগানে যেতেই দেখি, কুয়াশার দাপট খুব বেশি। এক হাত সামনের কিছু দেখা যায়না। সবাই কালো চাঁদর মুড়ি দেওয়া, চুপচাপ এগিয়ে চলছি। ভুট্টখানকে আজ দেখতে না পেয়ে আমরা বেশ অবাক হলাম। একটা বড়সড় খেজুর গাছের নীচে গিয়ে আমরা দাড়ালাম। সামাদ গাছে উঠে গেলো রস পাড়ার জন্য আমরা গাছের নিচে অপেক্ষা করছি আর চারিদিকে দেখচি ভুট্টুখান আসে কি না। একটু পরে জোড়ে চিৎকার দিয়ে সামাদ গাছ থেকে নীচে লাফ দিয়ে পড়লো। রসের হাড়ি এসে পড়লো শিশিরের মাথায়। ব্যাপারটি জানার জন্য ওর কাছে জিজ্ঞেস করলাম ও জানালো গাছের উপর কালো ভূত ।

ভূতের কথা শুনে আমরা দিলাম দৌড়, শিশিরতো ভাঙা হাড়ির মালা গলায় ঝুলিয়েই দৌড়াচ্ছে। দৌড়ে একেবারে খেজুর বাগানের শেষ প্রান্তে চলে এলাম। দাড়িয়ে আমরা হাপাতে লাগলাম। আমাদের সবার গায়ে কালো চাদর হঠাৎ মনে হলো আমাদের মধ্যে সদস্য একজন বেড়ে গেছে। মানে আমরা পাঁচ বন্ধু এসেছিলাম, এখন দেখি ছয়জন। কয়াশার কারণে কেউ কাউকে চিন্তে পারছিনা তার উপর আবার অন্ধকার। ভূত-টুত নয়তো আমি সবার হাতে চিমট্ িকাটতে লাগলাম। প্রথম জন সামাদ দ্বিতীয় জন শিশির তৃতীয় জন শাহাদাত চতুর্থ জন জিসান পঞ্চম জনতো আমি নিজেই কিন্তু ৬ষ্ঠ জন্য কোন কথা বলল না। আমরা ভয়ে ভয়ে সেই চাদর মোড়া ছায়ামূর্তিটির মুখের চাদরটা শরাতে যাবো অমনি ছায়ামূতিটা শাহাদাতকে কামড় দিয়ে খেজুর বাগানের দিকে দৌড় মারলো। সামাদ বলল এটাই সেই কালো ভূত। ভূত ভূত বলে আমরা আবার দৌড়াতে লাগলাম।

শাহাদাত তো ভ’তের কামড় খেয়ৈ প্রায় অজ্ঞান হবার অবস্থা। কোন রকম ওর হাত ধরে সাথে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। গ্রাম বাসী আমাদের চিৎকারে জেগে উঠলো। সবাই ঘর থেকে বের হয়ে এলো। আমরা সব কিছু খুলে বললাম। এবং আমরাই যে রস চোর সেটা শিকার কররাম। পরদিনই আমাদের নিয়ে গ্রামে শালিস বসলো, সবগুলোকে কানধরে উঠ বস করালো মেম্বার আইয়ুব আলী। তারপর থেকে আর ভুলেও আমরা খেজুর বনে যাইনা। দিনেও না রাতেও না। আমাদের কথা শুনে অন্য যে গুলো ছেঁচড়া চোর ছিলো সেগুলোও ভয়ে খেজুর বনে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। ভট্টুখান এক অদ্ভুত প্রকৃতির মানুষ। তার নিজ দেশ কোথায় গ্রামের কেউ তা জানেনা। শুধু শীতের সময় আসে আবার শীত শেষ হলো কোথায় চলে যায়। শীত শেষ হতেই ভুট্টু খান গ্রাম ছেড়ে কোথায় যেন চলে যায়। আমিও ঢাকায় চলে আসি।

অনেক দিন পর এবার ঈদে বাড়িতে যাওয়ার পর ভুট্টুখানের সাথে দেখা হলো। আমরা সব বন্ধু আর ভুট্টুখান এক সাথে বসে গল্প করতে লাগলাম। কথায় কথায় সেই দিনের কথা উঠলো। ভুট্টখান বলল তোদের একটা সত্যি কথা বলি, আসলে সেদিন তোদের কে ভ’তে ধরেনি। ভুট্টুখানের কথা শুনে আমরাতো অবাক। আমরা বললাম কী বলছেন আপনি?

হ্যারে সেদিন তোদের আমি কালো চাদর গায়ে দিয়ে ভয় দেখিয়েছিলাম। নয়তো তোরা আমাকে একদিনও রস বিক্রি করতে দিতিনা। আমরা বললাম তাহলে গাছে যে সামাদা ভ’ত দেখলো? সেটি ছিলো কালো কাকতাড়ুয়া, আর ভিতু সামাদ কালো কাপড় গায়ে দেওয়া কাকতাড়ুয়া দেখেই ভয় পেয়ে গেছে। ভুট্টুখানের কথা শুনে আমরাতো হাসিতে ফেটে পড়লাম সামাদকে নিয়ে। আমি বললাম আগের অভ্যাসটা কিন্তু যায়নি আপোষে দেবেন না চুরি করে খাবো। ভুট্টুখান বলল চুরি করে না খেলে রসে মজা পাওয়া যায়না। চল আজ আমিও তোদের সাথে রস চুরি করবো। আমি বললাম নিজের বেড়া নিজেই কাটবেন? ক্ষতি কি বেড়াতো আর কম নেই। আমরা সকলে হাসিতে ফেটে পড়লাম।

প্রকাশিত : শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy