“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” — ইসলামের দৃষ্টিতে এর বিচার

প্রিয় ইসলাম ডেস্ক :

“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” এই স্লোগানটি বাংলাদেশে খুব প্রচলিত এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উদ্দেশ্যে বলা হয়। এর অর্থ যদি হয় — ধর্মীয় সম্প্রীতি, পারস্পরিক নিরাপত্তা, প্রতিবেশীর হক আদায় করা — তাহলে ইসলাম একে সমর্থন করে। কিন্তু এর অর্থ যদি হয় — সকল ধর্মের ধর্মীয় উৎসবে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারবে, পূজা-পার্বণ সবার — তাহলে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই কথা সত্য নয়, বরং ইসলামী আক্বীদার সাথে সাংঘর্ষিক।

১. ইসলামে উৎসবের ধারণা
ইসলামে উৎসব বা ‘ঈদ’ শুধু আনন্দের বিষয় নয়, এটি ইবাদতের অংশ। প্রতিটি উৎসবের সাথে একটি আক্বীদা ও বিশ্বাস জড়িত।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব আছে, আর আমাদের উৎসব হলো এই দুটি ঈদ।” [বুখারী: ৯৫২, মুসলিম: ৮৯২]

হিন্দু ধর্মের দুর্গাপূজা, খ্রিস্টানদের বড়দিন — এগুলো তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী উপাসনা। সেখানে মূর্তি পূজা, শিরকি আক্বীদা জড়িত। একজন মুসলিম তাওহীদে বিশ্বাসী, তার জন্য সেখানে অংশগ্রহণ করা নিজের ঈমানের পরিপন্থী।

২. কুরআনের আলোকে
ক) সূরা কাফিরূন — ধর্মীয় পৃথকীকরণের সুস্পষ্ট ঘোষণা:

“তোমাদের জন্য তোমাদের দীন আর আমার জন্য আমার দীন।” [সূরা কাফিরূন: ৬]
এই সূরাটি নাযিল হয়েছিল যখন কাফেররা প্রস্তাব দিয়েছিল — এক বছর আমরা তোমার ধর্ম পালন করব, এক বছর তুমি আমাদের ধর্ম পালন করো। আল্লাহ সরাসরি এই সমন্বয়কে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

খ) শিরকের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়া মুমিনের গুণ:

“আর যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন তারা অনর্থক ক্রিয়া-কর্মের পাশ দিয়ে যায় তখন সসম্মানে পাশ কাটিয়ে যায়।” [সূরা আল-ফুরকান: ৭২]
এই আয়াতের তাফসীরে ইমাম মুজাহিদ, ইবনে সীরীনসহ অনেক মুফাসসির বলেছেন, এখানে ‘যূর’ অর্থ কাফেরদের উৎসব ও শিরকি অনুষ্ঠান। [তাফসীরে ইবনে কাসীর]

গ) অন্যের দেবতাকে গালি না দেওয়া — সহাবস্থানের নীতি:

“তোমরা তাদেরকে গালি দিও না, যাদেরকে তারা আল্লাহ ছাড়া ডাকে।” [সূরা আনআম: ১০৮]
ইসলাম অন্য ধর্মকে গালি দিতে নিষেধ করেছে, তাদের নিরাপত্তা দিতে বলেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তাদের শিরকি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হবে।

ঘ) আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম… [সূরা মায়েদা: ৩] — ইসলাম পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, অন্য ধর্মের উৎসব থেকে আনন্দ নেওয়ার প্রয়োজন নেই।

৩. হাদীস ও সাহাবীদের বক্তব্য
ক) বিজাতীয় সাদৃশ্য অবলম্বন নিষিদ্ধ:

“যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” [আবু দাউদ: ৪০৩১, হাদীসটি হাসান]

খ) উমর রা. এর সতর্কবাণী:
উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, “তোমরা মুশরিকদের উৎসবের দিনে তাদের উপাসনালয়ে প্রবেশ করো না। কেননা সেই সময় তাদের উপর আল্লাহর গজব নাযিল হতে থাকে।” [বায়হাকী, সুনানুল কুবরা: ১৮৮৬২]

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন, “যে ব্যক্তি অনারবদের দেশে বসবাস করল এবং তাদের নওরোজ ও মেহেরজান উৎসব পালন করল এবং তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করল, আর এ অবস্থায় মারা গেল, কিয়ামতের দিন সে তাদের সাথেই হাশর হবে।” [বায়হাকী]

৪. তাহলে সম্প্রীতি কীভাবে হবে? ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতি
ইসলাম দুটি বিষয়কে আলাদা করেছে:

১. ধর্মীয় সহাবস্থান ও মানবিক আচরণ — যা বৈধ এবং সওয়াবের কাজ:

অন্য ধর্মের মানুষের জান-মাল-ইজ্জতের নিরাপত্তা দেওয়া। রাসূল সা. বলেছেন, যে কোনো সংখ্যালঘুকে কষ্ট দেবে, সে আমার বিরুদ্ধে বাদী হবে।
অসুস্থ হলে দেখতে যাওয়া, ব্যবসা-বাণিজ্য করা, প্রতিবেশী হিসেবে ভালো ব্যবহার করা, বিপদে সাহায্য করা। রাসূল সা. ইহুদি প্রতিবেশীর খোঁজ নিতেন।
তাদের ধর্ম পালনে বাধা না দেওয়া।
২. ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ ও শুভেচ্ছা — যা নিষিদ্ধ:

পূজা মণ্ডপে যাওয়া, প্রসাদ খাওয়া, দেবীর সামনে মাথা নত করা — এটি সরাসরি শিরক।
তাদের ধর্মীয় উৎসবকে ‘ধর্মীয়’ ভাবে শুভেচ্ছা জানানো, যেমন “পূজার শুভেচ্ছা”। কারণ আপনি এমন একটি কাজের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, যাকে আল্লাহ সবচেয়ে বড় গুনাহ বলেছেন। আলেমদের মতে এটি কুফরী বাক্যের কাছাকাছি।
তবে সামাজিক শিষ্টাচার হিসেবে “ভালো থাকুন”, “শুভকামনা” — এই ধরনের সাধারণ কথা বলা যায়, কিন্তু ধর্মীয় শব্দ ব্যবহার না করে। ইবনে তাইমিয়া রহ. এ বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।

“ধর্ম যার যার উৎসব সবার” — কথাটি যদি রাজনৈতিক বা সামাজিক নিরাপত্তার অর্থে বলা হয়, যে রাষ্ট্র সবার উৎসবের নিরাপত্তা দেবে, তাহলে তা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক নয়। ইসলামী রাষ্ট্রেও অন্য ধর্মের মানুষ নিরাপদে তাদের উৎসব পালন করবে।

কিন্তু যদি এর অর্থ হয় — “ধর্ম যার যার, কিন্তু উৎসবে সব ধর্মের মানুষ শরীক হতে পারবে” — তাহলে এটি ইসলামী আক্বীদা অনুযায়ী সম্পূর্ণ ভুল।

মুসলিমের উৎসব ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। হিন্দুর উৎসব পূজা। খ্রিস্টানের উৎসব বড়দিন। যার ধর্ম তার উৎসব। যার উৎসব তারই। ইসলামের সৌন্দর্য হলো — অন্য ধর্মকে সম্মান করা, নিরাপত্তা দেওয়া, কিন্তু নিজের তাওহীদকে বিসর্জন না দেওয়া।

আল্লাহ বলেন: “তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ায় পরস্পর সহযোগিতা করো, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে সহযোগিতা করো না।” [সূরা মায়েদা: ২]

প্রকাশিত: শনি বার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy