পৃথিবীর মানুষের জন্য ধর্মের কেন প্রয়োজন?

প্রিয় ইসলাম ডেস্ক :

মানুষ শুধু একটি জৈবিক সত্তা নয়, সে একই সাথে দৈহিক, মানসিক ও আত্মিক সত্তা। তার পেটের ক্ষুধার জন্য খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি আত্মার ক্ষুধার জন্য প্রয়োজন পথনির্দেশের। সভ্যতার শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মানুষ এই একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে – আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি এবং কোথায় যাব? বিজ্ঞান মানুষকে ‘কিভাবে’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু ‘কেন’ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে একমাত্র ধর্ম। আর ইসলামের দৃষ্টিতে সেই ধর্ম হলো একমাত্র জীবন ব্যবস্থা যা মানুষকে তার প্রকৃত পরিচয় চিনিয়ে দেয়।

১. মানুষের প্রকৃতি বা ফিতরাতের চাহিদা
মানুষ স্বভাবগতভাবেই ধর্মপ্রবণ। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে তার ভেতরে একজন স্রষ্টাকে খোঁজার, তার কাছে মাথা নত করার এক সহজাত আকুতি রয়েছে।

কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরাত, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল দ্বীন।” – [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ফিতরাতকে আরও স্পষ্ট করেছেন। তিনি বলেছেন:
“প্রতিটি নবজাতকই ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।” – [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

অর্থাৎ, ধর্ম কোনো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া বিষয় নয়, বরং এটি মানুষের ভেতরের স্বাভাবিক চাহিদা। যেমন মাছের জন্য পানির প্রয়োজন, তেমনি মানুষের আত্মার জন্য ধর্মের প্রয়োজন।

২. জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ
ধর্ম ছাড়া মানুষের জীবন উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়ে। সে খায়, ঘুমায়, উপার্জন করে, কিন্তু কেন করে তা জানে না। একসময় হতাশা তাকে গ্রাস করে। ইসলাম মানুষকে তার জীবনের সুস্পষ্ট লক্ষ্য জানিয়ে দেয়।

আল্লাহ বলেন:
“আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্য।” – [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬]

এই ইবাদত মানে শুধু নামাজ-রোজা নয়। জীবনের প্রতিটি কাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা, সৎ পথে চলা, মানুষের কল্যাণ করা – সবই ইবাদত। এই লক্ষ্য যখন মানুষের সামনে থাকে, তখন তার ছোট জীবনটিও অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে, এই পৃথিবী তার চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, এটি পরকালের শস্যক্ষেত্র মাত্র।

৩. নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ভিত্তি
আইন দিয়ে মানুষের বাহ্যিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু ভেতরের নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণ করে ধর্ম। একজন মানুষ পুলিশের ভয়ে চুরি না-ও করতে পারে, কিন্তু নির্জনে সুযোগ পেলে সে কী করবে? তখন তাকে ফেরায় ধর্ম।

ধর্ম মানুষকে শেখায় – কেউ না দেখলেও আল্লাহ দেখছেন।

“তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো না কেন। তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।” – [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ৪]

এই আল্লাহভীতি বা তাকওয়াই মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানায়। ইসলাম বলে, সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার, প্রতিবেশীর হক আদায় – এগুলো শুধু সামাজিক গুণ নয়, এগুলো ইমানের অংশ। রাসূল (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।” – [সহীহ বুখারী]

ধর্ম ছাড়া নৈতিকতার কোনো স্থায়ী মানদণ্ড থাকে না। আজ যা নৈতিক, কাল তা অনৈতিক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় নৈতিকতা স্থায়ী ও শাশ্বত।

৪. আত্মার প্রশান্তি ও মানসিক মুক্তি
আধুনিক পৃথিবীতে আমাদের সব আছে – টাকা, প্রযুক্তি, বাড়ি, গাড়ি। কিন্তু নেই মানসিক শান্তি। উদ্বেগ, হতাশা, আত্মহত্যা দিন দিন বাড়ছে। কারণ মানুষ তার আত্মাকে ভুলে গেছে।

আত্মার খোরাক হলো আল্লাহর স্মরণ। কোরআন বলে:
“জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।” – [সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮]

নামাজ, রোজা, দোয়া, জিকির মানুষকে তার রবের সাথে সংযুক্ত করে। যখন মানুষ বুঝতে পারে যে তার একজন অভিভাবক আছেন যিনি সব সমস্যার সমাধান করতে পারেন, তখন তার দুশ্চিন্তা কমে যায়। রাসূল (সা.) যখনই কোনো কঠিন সমস্যায় পড়তেন, নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। এটাই হলো ধর্মের মনস্তাত্ত্বিক শক্তি।

৫. একটি সুশৃঙ্খল সমাজ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা
ধর্ম ছাড়া একটি সুস্থ সমাজ কল্পনা করা যায় না। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এটি ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়।

ইসলাম সুদ, ঘুষ, মজুতদারি, প্রতারণা নিষিদ্ধ করে অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করে। যাকাত, সদকা ও ওয়াকফের মাধ্যমে ধনী-গরিবের বৈষম্য কমায়। বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার ও পারিবারিক আইনের মাধ্যমে সমাজে শৃঙ্খলা আনে।

রাসূল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন:
“হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের রব একজন, তোমাদের পিতা একজন। কোনো আরবের কোনো অনারবের উপর, কোনো অনারবের কোনো আরবের উপর, কোনো সাদার কোনো কালোর উপর শ্রেষ্ঠত্ব নেই তাকওয়া ছাড়া।”

এই ঘোষণাই হলো প্রকৃত সাম্য ও মানবাধিকারের ভিত্তি, যা পৃথিবী আজও খুঁজে ফিরছে।

উপসংহার

সুতরাং, ধর্ম মানুষের জন্য কোনো বোঝা নয়, বরং এটি মুক্তির পথ। ধর্ম মানুষকে পশুত্ব থেকে মনুষ্যত্বে এবং মনুষ্যত্ব থেকে শ্রেষ্ঠত্বে নিয়ে যায়। বিজ্ঞান আমাদের হাতে আলো দেয়, কিন্তু কোন পথে চলতে হবে তা দেখায় ধর্ম।

পৃথিবীর এই অশান্ত, দিশেহারা সময়ে মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার রবের দিকে ফিরে আসা। কারণ আল্লাহই বলেছেন:
“যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জীবন হবে সংকুচিত।” – [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১২৪]

তাই সুন্দর, শান্তিময় ও অর্থপূর্ণ জীবনের জন্য ধর্মের কোনো বিকল্প নেই।

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy