এই মহাবিশ্বের স্রষ্টা কে? কোরআন ও হাদিসের আলোকে এক বিস্ময়কর সৃষ্টির গল্প

প্রিয় ইসলাম ডেস্ক :

এই বিশাল পৃথিবী। তার বুকে ৮০০ কোটি মানুষ। মানুষ ছাড়াও স্থলে, জলে, অন্তরীক্ষে ছড়িয়ে আছে অগণিত প্রাণী। বিজ্ঞানীরা বলেন, শুধু এই পৃথিবীতেই প্রায় ৮৭ লক্ষ প্রজাতির প্রাণী আছে, যার ৮০ ভাগই এখনো অনাবিষ্কৃত। এক একটি পিঁপড়া থেকে বিশাল নীল তিমি, অদৃশ্য ভাইরাস থেকে উড়ন্ত ঈগল – এত বৈচিত্র্য, এত নিখুঁত পরিকল্পনা! প্রশ্ন জাগে, এই সবকিছুসহ পুরো পৃথিবীটা বানালেন কে? এর উত্তর দিয়েছে আল-কোরআন, দেড় হাজার বছর আগে।

১. একক স্রষ্টার ঘোষণা
ইসলামের মূল ভিত্তিই হলো তাওহীদ – স্রষ্টা একজন। তিনি হলেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন।

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“আল্লাহই সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সব কিছুর কর্মবিধায়ক।” [সূরা যুমার, আয়াত: ৬২]

“তিনিই আল্লাহ, যিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। তিনিই স্রষ্টা, উদ্ভাবক, আকৃতি দানকারী।” [সূরা হাশর, আয়াত: ২৪]

এই সৃষ্টি এমনি এমনি হয়নি। এর পেছনে একজন মহাপরিকল্পনাকারী, মহাজ্ঞানী সত্তা রয়েছেন।

২. কোরআনের ভাষায় আসমান-জমিন সৃষ্টি
কিভাবে এই পৃথিবী সৃষ্টি হলো, কোরআন তার এক বিস্ময়কর চিত্র তুলে ধরেছে।

আল্লাহ বলেন:

“অবিশ্বাসীরা কি দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম।” [সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩০]

আধুনিক বিজ্ঞানের বিগ ব্যাং তত্ত্বের সাথে এই আয়াতের চমকপ্রদ মিল রয়েছে।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন:

“তিনিই সেই সত্তা যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং সাত আকাশ সুবিন্যস্ত করেন।” [সূরা বাকারা, আয়াত: ২৯]

হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা শনিবার মাটি সৃষ্টি করেন, রবিবার পাহাড়, সোমবার গাছপালা, মঙ্গলবার অপছন্দনীয় বস্তু, বুধবার আলো, বৃহস্পতিবার প্রাণীকুল এবং শুক্রবার আসরের পর আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেন। [সহীহ মুসলিম: ৬৭০৭]

এ থেকে বোঝা যায়, সৃষ্টি একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া, যা ছয় দিনে সম্পন্ন হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে – “নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, যিনি ছয় দিনে আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।” [সূরা আরাফ, আয়াত: ৫৪]

৩. প্রাণী জগতের বৈচিত্র্য – আল্লাহর নিদর্শন
পৃথিবীতে কত প্রাণী আছে, তার সঠিক গণনা একমাত্র আল্লাহই জানেন। কোরআন বলছে না যে প্রাণী ১৮ হাজার, বরং বলছে এর সংখ্যা অগণিত। মানুষের জ্ঞানের বাইরেও অসংখ্য সৃষ্টি রয়েছে।

আল্লাহ বলেন:

“আল্লাহ প্রত্যেক জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের কেউ পেটের উপর ভর করে চলে, কেউ দুই পায়ে চলে, আবার কেউ চার পায়ে চলে। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন।” [সূরা নূর, আয়াত: ৪৫]

এই একটি আয়াতেই জীববিজ্ঞানের পুরো শ্রেণীবিন্যাস চলে আসে – সরীসৃপ, মানুষ ও পাখি, চতুষ্পদ প্রাণী।

আরও ইরশাদ হয়েছে:

“ভূপৃষ্ঠে বিচরণকারী এমন কোনো জীব নেই এবং নিজ ডানায় উড়ে বেড়ানো এমন কোনো পাখি নেই, যারা তোমাদের মতো এক একটি জাতি নয়।” [সূরা আনআম, আয়াত: ৩৮]

অর্থাৎ, মৌমাছির যেমন সমাজ আছে, পিঁপড়ার যেমন রাষ্ট্র আছে, তেমনি প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব সমাজ ব্যবস্থা আছে। তারা সবাই আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে, যদিও আমরা তা বুঝতে পারি না।

“সাত আসমান, জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে।” [সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৪৪]

৪. শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ
সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে মানুষকে আল্লাহ শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।

“আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম সুন্দর আকৃতিতে।” [সূরা ত্বীন, আয়াত: ৪]

মানুষ সৃষ্টির উপাদান সম্পর্কে কোরআন বলে:

“তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন শুকনো ঠনঠনে মাটি থেকে, যা পোড়া মাটির মতো।” [সূরা আর-রহমান, আয়াত: ১৪]

এবং তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন। হাদিসে এসেছে, মাতৃগর্ভে ১২০ দিন পর ফেরেশতা এসে রূহ ফুঁকে দেন এবং রিজিক, হায়াত, আমল ও ভাগ্য লিখে দেন। [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]

মানুষকে শুধু সৃষ্টিই করা হয়নি, তাকে উদ্দেশ্য দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে।

“আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।” [সূরা যারিয়াত, আয়াত: ৫৬]

৫. কেন এই বিশাল আয়োজন?
এই বিশাল পৃথিবী, কোটি কোটি প্রাণী – সবই কি অর্থহীন? না। কোরআন বলছে, এর প্রতিটি বিন্দুতে রয়েছে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন।

“নিশ্চয়ই আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, রাত-দিনের আবর্তনে বুদ্ধিমানদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৯০]

একটি গাছের পাতার দিকে তাকান। একই মাটি, একই পানি, একই আলোতে একটি গাছে মিষ্টি আম, অন্য গাছে টক তেঁতুল, কোথাও বিষাক্ত ফল। কে এই বৈচিত্র্যের রূপকার? একজনই।

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন, “হে আমার বান্দারা, তোমরা সবাই পথভ্রষ্ট, আমি যাকে হেদায়েত দিই সে ছাড়া।”

তাই এই সৃষ্টি জগত দেখে স্রষ্টাকে চেনাই হলো মানুষের প্রথম দায়িত্ব।

উপসংহার
এই পৃথিবী কোনো দুর্ঘটনায় তৈরি হয়নি। এর প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি প্রাণী একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্বের সাক্ষ্য দেয়। তিনি আল্লাহ। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তিনি কাউকে জন্ম দেননি, কারো থেকে জন্ম নেননি।

“তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই প্রকাশ্য, তিনিই গোপন এবং তিনি সকল বিষয়ে সম্যক অবহিত।” [সূরা হাদীদ, আয়াত: ৩]

মানুষসহ এই অগণিত প্রাণীকুল ও মহাবিশ্বের একমাত্র স্রষ্টা, মালিক ও পরিচালক হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা। তাঁকে চেনা, তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা করাই হলো আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য।

প্রকাশিত: সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy