

প্রিয় ইসলাম ডেস্ক :
মানুষ কি এমনি এমনিই সৃষ্টি হয়েছে? এই বিশাল মহাবিশ্ব, এই নিখুঁত পৃথিবী, এই জটিল মানবদেহ – এসবের কি কোনো স্রষ্টা নেই? যুগে যুগে এই প্রশ্ন মানুষের মনে জেগেছে। ইসলাম এই প্রশ্নের উত্তরকে মানুষের উপর চাপিয়ে দেয় না, বরং মানুষকে চিন্তা করতে, গবেষণা করতে এবং নিজের বিবেক দিয়ে সত্যকে খুঁজে নিতে বলে। কোরআন বারবার বলে – “আফালা তা’কিলুন” – তোমরা কি চিন্তা করবে না? “আফালা তুবসিরুন” – তোমরা কি দেখবে না?

আল্লাহর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়ার জন্য দূরে কোথাও যেতে হয় না, বরং চারপাশে এবং নিজের ভেতরেই তার অসংখ্য নিদর্শন ছড়িয়ে আছে।
১. ফিতরাত বা সহজাত প্রকৃতির মাধ্যমে
প্রতিটি মানুষের ভেতরে আল্লাহ তার অস্তিত্বের একটি বীজ দিয়ে দিয়েছেন। এটিকে বলা হয় ফিতরাত। বিপদে পড়লে, যখন সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন একজন নাস্তিকও অজান্তে আকাশের দিকে তাকায়। একজন অবিশ্বাসীও বলে ওঠে – “হে আল্লাহ, বাঁচাও”।
কোরআনে আল্লাহ বলেন:
“সুতরাং তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখো। এটাই আল্লাহর ফিতরাত, যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন।” – [সূরা আর-রূম, ৩০]
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“প্রতিটি শিশু ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করে।” – [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]
এই ফিতরাতই হলো মানুষের ভেতরের কম্পাস, যা সবসময় তাকে বলে – তোমার একজন স্রষ্টা আছেন। পরিবেশ ও সমাজ এই ফিতরাতকে ঢেকে দিতে পারে, কিন্তু মুছে ফেলতে পারে না।
২. সৃষ্টিজগতের নিদর্শন দেখে
আল্লাহকে সরাসরি চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার সৃষ্টি দেখে তাকে চেনা যায়। যেমন ধোঁয়া দেখলে আমরা বুঝি আগুন আছে, পায়ের ছাপ দেখলে বুঝি কেউ হেঁটে গেছে, তেমনি এই সুবিশাল সৃষ্টি দেখলে বুঝতে হবে এর একজন মহান স্রষ্টা আছেন।
আল্লাহ কোরআনে তার নিদর্শন নিয়ে চিন্তা করতে বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে, রাত ও দিনের পরিবর্তনে, মানুষের উপকারী জিনিস নিয়ে সাগরে চলমান নৌযানে, আল্লাহ আকাশ থেকে যে পানি বর্ষণ করেন এবং তার দ্বারা মৃত জমিনকে জীবিত করেন এবং সব রকমের প্রাণী ছড়িয়ে দেন, বাতাসের দিক পরিবর্তনে এবং আসমান ও জমিনের মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।” – [সূরা আল-বাকারা, ১৬৪]
“নিশ্চয়ই আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও জমিনের সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করে বলে – হে আমাদের রব! তুমি এগুলো অনর্থক সৃষ্টি করোনি।” – [সূরা আলে-ইমরান, ১৯০-১৯১]
একবার ভাবুন, এই পৃথিবী সূর্য থেকে ঠিক এতটুকু দূরত্বে আছে, একটু কাছে গেলে পুড়ে যেতাম, একটু দূরে গেলে বরফ হয়ে যেতাম। চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র সবকিছু এক অদৃশ্য নিয়মে চলছে, এক সেকেন্ডের জন্য এদিক-সেদিক হচ্ছে না। এই নিখুঁত শৃঙ্খলার পেছনে কি একজন মহা-পরিকল্পনাকারী নেই?
বিজ্ঞানী নিউটন বলেছিলেন – “এই সৌরজগতের অপূর্ব শৃঙ্খলা একজন সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান সত্তা ছাড়া সম্ভব নয়।”
৩. নিজের অস্তিত্ব ও দেহের দিকে তাকিয়ে
আল্লাহকে খোঁজার সবচেয়ে কাছের উপায় হলো নিজেকে দেখা।
আল্লাহ বলেন:
“আর পৃথিবীতে বিশ্বাসীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। তোমরা কি দেখবে না?” – [সূরা আয-যারিয়াত, ২০-২১]
মানুষের একটি কোষের দিকে তাকান। একটি কোষের ভেতরে যে ডিএনএ আছে, তার তথ্য যদি লিখে রাখা হয়, তাহলে হাজার খণ্ড বই হয়ে যাবে। মানুষের চোখ, যে একসাথে লক্ষ রঙ চিনতে পারে, মস্তিষ্ক, যা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কম্পিউটারের চেয়েও জটিল, হৃদপিণ্ড, যা এক মুহূর্ত না থেমে ৭০-৮০ বছর ধরে পাম্প করছে – এসব কি এমনি এমনি হয়ে গেছে?
কোরআন প্রশ্ন করে:
“তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা?” – [সূরা আত-তূর, ৩৫]
উত্তর স্পষ্ট – না, আমরা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করিনি, আর এমনি এমনিও হইনি। আমাদের একজন স্রষ্টা আছেন।
৪. যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে
ইসলাম অন্ধ বিশ্বাস করতে বলে না, বরং যুক্তি দিয়ে বিশ্বাস করতে বলে। এর সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো – কার্য-কারণ তত্ত্ব।
পৃথিবীর প্রতিটি কাজের পেছনে একজন কর্তা আছে। একটি বই থাকলে একজন লেখক আছে, একটি বিল্ডিং থাকলে একজন স্থপতি আছে, একটি ঘড়ি থাকলে একজন ঘড়ি নির্মাতা আছে। তাহলে এই মহাবিশ্ব, যা ঘড়ির চেয়েও কোটি কোটি গুণ নিখুঁত, তার কি কোনো নির্মাতা থাকবে না?
এই যুক্তিকেই ইবরাহীম (আ.) ব্যবহার করেছিলেন। তিনি তারা, চাঁদ, সূর্যকে দেখে বললেন, এগুলো অস্ত যায়, ডুবে যায়। যা ডুবে যায়, যা পরিবর্তনশীল, তা কখনো রব হতে পারে না। আমার রব তিনিই, যিনি কখনো অস্ত যান না। – [সূরা আল-আনআম, ৭৬-৭৯]
৫. ওহী বা আল্লাহর বাণীর মাধ্যমে
বুদ্ধি দিয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব বোঝা যায়, কিন্তু আল্লাহ কেমন, তিনি আমাদের কাছে কী চান, তা জানার জন্য প্রয়োজন ওহীর। আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন এবং সর্বশেষ কোরআন নাজিল করেছেন। কোরআন নিজেই আল্লাহর অস্তিত্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
কোরআন চ্যালেঞ্জ দিয়েছে:
“যদি তোমরা সন্দেহে থাকো আমি আমার বান্দার উপর যা নাজিল করেছি সে বিষয়ে, তাহলে এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো।” – [সূরা আল-বাকারা, ২৩]
১৪০০ বছর ধরে এই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলা কেউ করতে পারেনি। নিরক্ষর নবী মুহাম্মদ (সা.) এর মুখ থেকে এমন বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক ও ভাষাগত অলৌকিক গ্রন্থ আসা প্রমাণ করে, এটি কোনো মানুষের রচনা নয়, এটি মহান রবের বাণী।
কীভাবে খুঁজবেন? একটি ব্যবহারিক পথ
১. নির্জনে চিন্তা করুন: প্রতিদিন ১০ মিনিট সব কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে আকাশ, গাছ, নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে ভাবুন – এগুলো কে বানালো?
২. কোরআন অর্থসহ পড়ুন: কোরআনকে শুধু তেলাওয়াতের বই হিসেবে নয়, আল্লাহর চিঠি হিসেবে পড়ুন। তিনি আপনার সাথে কী বলছেন তা বুঝুন।
৩. দোয়া করুন: হৃদয় থেকে আল্লাহকে বলুন – “হে আল্লাহ, যদি তুমি থেকে থাকো, আমাকে তোমার অস্তিত্বের প্রমাণ দাও, আমাকে পথ দেখাও।” আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন – “যারা আমার পথে চেষ্টা-সাধনা করে, আমি অবশ্যই তাদের আমার পথে পরিচালিত করব।” – [সূরা আনকাবুত, ৬৯]
৪. সৎ সঙ্গ খুঁজুন: যারা আল্লাহকে চেনে, তাদের সাথে চলাফেরা করুন।
আল্লাহ দূরে নন। কোরআন বলে:
“আমি তো মানুষের ঘাড়ের শিরার চেয়েও নিকটবর্তী।” – [সূরা ক্বাফ, ১৬]
তিনি আছেন, তিনি দেখছেন, তিনি শুনছেন। শুধু প্রয়োজন একটি অনুসন্ধানী হৃদয়, যে হৃদয় সত্য খুঁজতে চায়। যে খুঁজে, আল্লাহ তাকে পথ দেখান।
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














