

ক্ষুদীরাম দাস :
মানব সভ্যতার ইতিহাস কেবল যুদ্ধ, জয় আর বিজ্ঞানের অগ্রগতির ইতিহাস নয়; এটি অণুজীবের বিরুদ্ধে মানুষের টিকে থাকার এক দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাসও বটে। খালি চোখে দেখা যায় না এমন হাজারো ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের আক্রমণে প্রতি বছর বিশ্বে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। অথচ অত্যন্ত সাধারণ ও সস্তা এক অভ্যাস দিয়েই এই কঠিন বাস্তবতাকে বদলে দেয়া সম্ভব। তা হলো—নিয়মিত ও সঠিকভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস পালনের মূল লক্ষ্যই হলো মানুষের মধ্যে এই জীবনরক্ষাকারী অভ্যাস গড়ে তোলা। প্রতিদিনের সামান্য সচেতনতা কীভাবে মহামারির মতো সংকট মোকাবেলা করতে পারে এবং মানবজীবনকে নিরাপদ রাখতে পারে, তা বর্তমান সময়ে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়েছে।
আমাদের হাতই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের মূল মাধ্যম। কাজের প্রয়োজনে, হাঁটাচলায় কিংবা নানান বস্তু স্পর্শ করতে গিয়ে আমাদের হাত প্রতিনিয়ত অসংখ্য ক্ষতিকর অণুজীবের সংস্পর্শে আসে। এই হাত দিয়ে যখন মানুষ নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করে, অথবা খাবার তৈরি ও গ্রহণ করে, তখন অণুজীবগুলো খুব সহজেই শরীরে প্রবেশ করে।

অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহর মতে, শুধু ভালোভাবে হাত ধোয়ার মাধ্যমেই কমপক্ষে ২০ ধরনের অসুস্থতা থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব। মানব ইতিহাসের ভয়াবহ মহামারি কলেরা ও ডায়রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে আনতে হাত ধোয়ার অভ্যাস সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ২০১৯-২০ সালের করোনা মহামারি পৃথিবীকে আরো একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলো যে হাত ধোয়া কেবল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, এটি সরাসরি জীবন ও মরণ—অর্থাৎ জীবনরক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক অত্যন্ত জরুরি অনুশীলন।
অপরিচ্ছন্ন হাতে থাকা জীবাণু শরীরের ভেতরে প্রবেশের ফলে কেবল সাধারণ ঠান্ডা বা ফ্লু নয়, বরং ডায়রিয়া, জন্ডিস, আমাশয়, টাইফয়েড ও কৃমির মতো জটিল পানি ও খাদ্যবাহিত রোগের বিস্তার ঘটে। অনেক সময় মানুষ হাঁচি বা কাশি দেয়ার পর হাত না ধুয়ে তা পোশাকে মোছে বা অন্য কারো সঙ্গে করমর্দন করে, যার মধ্যদিয়ে রোগ এক দেহ থেকে অন্য দেহে ছড়ায়।
হাত না ধোয়ার কারণে ছড়ানো রোগ সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার ইতিবাচক প্রভাব
ডায়রিয়া ও কলেরা ডায়রিয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব ৪০%-এর বেশি
নিউমোনিয়া ও শ্বাসনালীর সংক্রমণ তীব্র শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ কমানো সম্ভব প্রায় ২৩%
টাইফয়েড, জন্ডিস ও আমাশয় খাদ্য ও পানিবাহিত অণুজীব শরীরে প্রবেশে বাধা দেয়া
ফ্লু ও চোখ ওঠার মতো ভাইরাসের সংক্রমণ করমর্দন ও স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ানো সংক্রমণ প্রতিহত করা
রোগ-জীবাণুর সবচেয়ে সহজ শিকার হয় কোমলমতি শিশুরা। পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান দুটি কারণ হলো নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া, যা মূলত অনিরাপদ পানি ও অপরিচ্ছন্নতার কারণে ঘটে থাকে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১.৪ বিলিয়ন শিশু—অর্থাৎ প্রতি চার জনে একজন শিশু ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারায়।
শিশুদের এই মৃত্যুর মিছিল থামানো অত্যন্ত সহজ একটি উপায়ে সম্ভব। শিশুদের খাওয়ানোর আগে এবং মায়েদের খাবার তৈরির আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে রোগ সংক্রমণের হার বহুলাংশে কমে যায়। কেবল স্বাস্থ্যকর উপায়ে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করতে পারলে বছরে প্রায় ১০ লাখ ডায়রিয়াজনিত মৃত্যু রোধ করা সম্ভব এবং অন্তত ১৬ শতাংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের সংক্রমণজনিত ঝুঁকি কমানো যায়। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক হ্যান্ড ওয়াশিং বা হাত ধোয়ার পদ্ধতি মেনে চললে প্রায় ৮০ শতাংশ রোগ ঠেকানো সম্ভব।
যেকোনো উপায়ে বা যেকোনো সময় হাত ধুলেই পূর্ণাঙ্গ সুরক্ষা পাওয়া যায় না। হাত ধোয়ার জন্যে নির্দিষ্ট সময় ও সঠিক পদ্ধতি মেনে চলা জরুরি।
হাত ধোয়ার সঠিক পদ্ধতি:
১. প্রবাহমান পানি ব্যবহার: প্রথমে ট্যাপ বা কলের প্রবাহমান পানি দিয়ে দু’টি হাত ভালোভাবে ভিজিয়ে নিতে হবে। শুধু স্থির পানিতে হাত ডোবালে জীবাণু দূর হয় না।
২. সাবান প্রয়োগ: হাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্ষারযুক্ত সাবান, তরল সাবান বা অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে হবে।
৩. ২০ সেকেন্ড ঘর্ষণ: অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় ধরে দু’টি হাতের সামনে ও পেছনের ভাগ, আঙুলের ফাঁক, নখ এবং কবজি ভালোভাবে ডলে ঘষতে হবে।
৪. পানি দিয়ে ধোয়া: প্রবাহমান পরিষ্কার পানির নিচে হাত রেখে সবটুকু ফেনা ও ময়লা ধুয়ে ফেলতে হবে।
৫. শুকানো: পরিষ্কার ও শুকনো তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে হাত শুকিয়ে নিতে হবে। সাবানের অনুপস্থিতিতে অ্যালকোহলযুক্ত হ্যান্ড স্যানিটাইজারও ভালো বিকল্প হিসেবে কাজ করে।
হাত ধোয়া দিবস ও বৈশ্বিক সচেতনতা
জনসাধারণের মাঝে বিশুদ্ধভাবে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে প্রতি বছর ১৫ অক্টোবর পালিত হয় বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস। ২০০৮ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এই দিবসের সূচনা হয়। প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২০ কোটিরও বেশি মানুষ আন্তর্জাতিকভাবে এই দিবসটি উদযাপনে অংশ নেয়। স্বাস্থ্যবিধির সচেতনতা তৈরিতে প্রতীকী ভূমিকা হিসেবে প্রতি বছর নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবসের একটি অত্যন্ত অর্থবহ প্রতিপাদ্য হলো—‘বি হ্যান্ড ওয়াশিং হিরো’, যার মাধ্যমে বার্তা দেয়া হয় যে সঠিক নিয়মে হাত ধোয়ার অভ্যাস রপ্ত করে প্রত্যেকেই নিজের ও অন্যের জীবন রক্ষাকারী নায়ক হতে পারে।
জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, হাত ধোয়ার স্বাস্থ্যগত দিকটি কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট দিবসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বরং এটিকে সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সাথে যুক্ত করতে হবে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার পর পুনরায় অনিরাপদ বা দূষিত পানি দিয়ে হাত ভিজিয়ে ফেলে, যার ফলে ধোয়ার আসল উপকারিতা নষ্ট হয়ে যায়।
গ্রামে ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মাঝে হাত ধোয়ার বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা পৌঁছানো জরুরি। তাছাড়া, শিশুদের শিক্ষা জীবনের শুরুতেই—অর্থাৎ স্কুল ও মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি হাত ধোয়ার এই সঠিক অভ্যাসটি বাধ্যতামূলকভাবে শেখানো প্রয়োজন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যদি নিরাপদ পানি ও সাবানের সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়, তবে শিশুকাল থেকেই এই অভ্যাসটি তাদের স্বভাবজাত আচরণে পরিণত হবে।
হাত ধোয়া দেখতে অত্যন্ত ছোট ও সাধারণ একটি কাজ হলেও মানবজাতির টিকে থাকা ও সুস্থতার বিচারে এর প্রভাব অসীম। পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর জীবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় এই হাত ধোয়ার অনুশীলনের মাধ্যমে। মহামারির ভয়াবহ দিনগুলো আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে যে স্বাস্থ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজের হাতের পরিচ্ছন্নতার চেয়ে বড় কোনো বর্ম নেই। আসুন, আমরা নিজে সঠিক নিয়মে হাত ধুই, শিশুদের এই শুভ অভ্যাসে অভ্যস্ত করি এবং একটি সুস্থ, জীবাণুমুক্ত ও রোগমুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলি।
প্রকাশিত: শনি বার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.












