

মিজানুর রহমান রানা :
পৃথিবীটা আলো-ছায়ার একটা খেলা। কখনও আলোর দিন, আবার কখনও অন্ধকারের রাত। রাতের অন্ধকারে মানুষ ভয় পায় আবার দিনের আলোতে মানুষ সাহস বুকে সঞ্চার করে পথচলা শুরু করে।

অনামিকা ক্লাস ফাইভের ছাত্রী। সে খুব মিষ্টি মেয়ে, পড়াশোনায় ভালো, গান গাইতে ভালোবাসে। কিন্তু তার একটা সমস্যা আছে—সে প্রায়ই রাতে দুঃস্বপ্ন দেখে। কখনো অন্ধকারে অদ্ভুত ছায়া, কখনো ভয়ঙ্কর শব্দ, আবার কখনো মনে হয় কেউ তাকে তাড়া করছে।
সেদিন রাতেও অনামিকা ঘুমোতে গেল। জানালার বাইরে চাঁদের আলো ঝলমল করছে। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে সে দেখল—একটা বিশাল কালো ছায়া তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
ছায়াটা বলল, “আমি অন্ধকার। তোমার ভয়। তুমি আমাকে কখনোই জয় করতে পারবে না। তুমি হারিয়ে যাবে আমার মাঝে।”
অনামিকা ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠল। মা এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। মা বললেন, “ভয়কে ভয় পেলে সে আরও বড় হয়। সাহস দেখালে ভয় ছোট হয়ে যায়। বুঝতে পারছো সোনা মনি?”
পরদিন স্কুলে অন্তরা নামের একজন শিক্ষক ক্লাসে একটি গল্প বলছিলেন। সেই গল্পের নাম “সাহসী রাজকন্যা”র গল্প। অনামিকা শিক্ষকের বলা গল্পটি খুবই মন দিয়ে শুনল। গল্পে রাজকন্যা ভয়ঙ্কর দানবকে পরাজিত করেছিল নিজের বুদ্ধি আর সাহস দিয়ে।
অনামিকা ভাবল, তাহলে আমিও তো নিজের বুদ্ধি আর সাহস দিয়ে অন্ধকারকে ভয় না পেয়ে জয় করতে পারি। যদি আমার দুঃস্বপ্নে কোনো দানব আসে, আমি তাকে বলব—তুমি আমার কিছুই করতে পারবে না। এই দেখো আমি তোমাকে ভয় পাই না।
সেদিন রাতে আবার অন্ধকারের মাঝে দুঃস্বপ্নটা ফিরে এল। এবার অনামিকা দেখল সে এক অদ্ভুত দেশে চলে গেছে। চারদিকে অন্ধকার, গাছগুলো কেমন যেন বাঁকা হয়ে আছে, আকাশে কালো মেঘ।
হঠাৎ সেই ছায়া আবার হাজির হলো। “তুমি আবার এসেছো?” ছায়া বলল।
অনামিকা সাহস করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ, আমি এসেছি। তুমি যত বড়ই হও, আমি ভয় পাব না। আজ তোমাকে আমি শেষ করেই ছাড়বো।”
ছায়া হেসে উঠল ভয়ঙ্কর হাসি দিয়ে। তারপর অনামিকার দিকে আস্তে আস্তে তার কালো হাতগুলো দিয়ে ভীষণ ভয় দেখাতে লাগলো।
কিন্তু এবার অনামিকা পালাল না। সে হেসে উঠলো, তারপর বললো, ‘নিশ্চয়ই অন্ধকারের পরই আলো আসে, রাত শেষ হলেই ভোর হবে, সূর্য উঠবে আর অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।’
সে চারদিকে তাকিয়ে দেখল হঠাৎ করেই অন্ধকারের মধ্যে ছোট ছোট আলো জ্বলছে।
আলো থেকে বেরিয়ে এল ছোট ছোট চরিত্র—একটা হাসিখুশি পাখি, একটা দুষ্টু খরগোশ, আর একটা বুদ্ধিমান বিড়াল।
তারা বলল, “আমরা তোমার বন্ধু। ভয়কে জয় করতে আমরা তোমাকে সাহায্য করব। তুমি কি আর ভয় পাবে?”
অনামিকা ভীষণ খুশি হয়ে তাদের সঙ্গে হাঁটতে লাগল। তারা তাকে শেখাল :
– ভয়কে জয় করার জন্য গভীর শ্বাস নিতে হয়।
– মনে মনে বলতে হয়: আমি সাহসী, আমি পারব।
– অন্ধকারে আলো খুঁজে নিতে হয়।
হঠাৎ আবার সেই ছায়া এসে হাজির হলো। এবার সে আরও ভয়ঙ্কররূপে কর্কশ কণ্ঠে বললো, “তুমি আমাকে হারাতে পারবে না!” এই বলে অন্ধকারের ছায়ামূর্তিটা চিৎকার করে ভীষণ গর্জে উঠল।
অনামিকা বন্ধুরা পাশে দাঁড়াল। অনামিকা জোরে বলল, “তুমি আমার ভয় নয়। আমি অনেক সাহসী। আমি তোমাকে মেরে ফেলবো।”
তারপর সে চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। মনে মনে বলল, আমি পারব। হঠাৎ চারদিকে আলো ছড়িয়ে পড়ল। অন্ধকারের কুৎসিত ছায়াটা ছোট হতে হতে চিৎকার করে মিলিয়ে গেল।
অনামিকা ঘুম ভেঙে দেখল—সকালের সূর্য উঠেছে। মা হাসিমুখে বললেন, “আজ তুমি একেবারে শান্তিতে ঘুমিয়েছো।”
অনামিকা খুশি হয়ে বলল, “মা, আমি আমার দুঃস্বপ্নকে জয় করেছি। ভয়কে আর ভয় পাই না।”
মা প্রশ্ন করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে সোনামনি?’
“মা ভয়কে জয় করার উপায় হলো সাহস। অন্ধকার যতই বড় হোক, আলো সবসময় জয়ী হয়। বন্ধু, পরিবার আর নিজের আত্মবিশ্বাস আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি ঠিক না?’
“ঠিক তাই সোনামনি। যতই ভয় পাবে ততোই ভয় তোমাকে আঁকড়ে ধরবে, আর যেদিন সাহস করে পথ চলবে সেদিন অন্ধকার নিজেই ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে, তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। জীবনের অন্ধকারগলিগুলো পেরিয়েই মানুষ সূর্যের আলোর দেখা পায়।”
প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি.












