

ক্ষুদীরাম দাস :
উঠোনের ধুলোবালি মাটিতে জনসংখ্যার পায়ের ছাপ এখনো স্পষ্ট। কিন্তু সবচেয়ে বড় ছাপটা পড়ে আছে মাঝখানে-বাবার লাশ। রক্তাক্ত মুখ, চোখ দু’টি খোলা, যেন চিরকালের জন্যে কিছু খুঁজছে। মেয়েটি, রিমা, দূর থেকে তাকাচ্ছিলো। তার হাত দু’টি কাঁপছিলো না, মনটাও শান্ত। কিন্তু মা’র কান্না উঠোনে ছড়িয়ে পড়ছিলো। “আমার স্বামী! প্রভু যীশু, কেন এমন করলেন?” মা চিৎকার করছিলো, চুল ছোঁড়া, বুকে হাত দিয়ে আঘাত করছিলো। লোকজন এসে ঘিরে দাঁড়িয়েছিলো। কিন্তু রিমা জানতো, এই কান্না সত্যি নয়।

রিমা’র বাবা, জোয়েল, ছিলো গরীব ঘরের ছেলে। খ্রিস্টান পরিবার থেকে বেরিয়ে পড়েছিলো স্কুল শেষ করে। মেধাবী ছিলো, গণিত আর বিজ্ঞানে সবাইকে হার মানাতো। কলেজে পড়ার সময় মা’র সঙ্গে দেখা। মা, লীলা, ধনী পরিবারের মেয়ে। মামার বাড়ি ঢাকার শহরতলীতে বড় বাড়ি, সম্পত্তি অনেক। জোয়েলকে প্রথমে পছন্দ হয়নি লীলাকে। কিন্তু লীলা’র অধ্যবসায়ে বিয়ে হলো। গীর্জায় পাদ্রি বাবান সাক্ষী দিয়েছিলেন। “প্রভু যীশুর নামে এই বন্ধন অটুট রাখো,” বলেছিলেন তিনি। কিন্তু বিয়ের পর সব বদলে গেলো।
লীলা’র পরিবার জোয়েলকে গরীব বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো। “এ কোথাকার ছেলে? আমাদের সম্পত্তির একটা টুকরোও পাবে না,” বলতো মামা রবার্ট। রিমা ছোটবেলা থেকে দেখে আসছিলো। বিয়ের পর লীলা সম্পত্তির একটা বড় ভাগ পেয়েছিলো মামাদের কাছ থেকে। ঘর বানানো, জমি কেনাÑসব তার নামে। জোয়েলকে কোনো সম্মান দিতো না। “তুমি তো শুধু আমার সঙ্কটে এসেছো,” বলতো লীলা। জোয়েল চুপ করে থাকতো। প্রভুর কাছে প্রার্থনা করতো। “প্রভু, ধৈর্য দাও।”
জোয়েল দূরের একটা এনজিওতে চাকরি নিলো। গ্রামের শিশুদের পড়ানো, স্বাস্থ্য সেবাÑসেই কাজ। প্রতিমাসে অল্প টাকা আসতো, কিন্তু মন ভরতো। বাড়ি থেকে দূরে থাকতো, কারণ লীলা’র সঙ্গে থাকা অসম্ভব ছিলো। ছুটিতে আসতো মাঝে মাঝে। একদিনের বেশি থাকতো না। রিমাকে কোলে নিয়ে গল্প করতো। “বিটি, প্রভু যীশু বলেছেন, ধনী লোকের জন্যে স্বর্গের রাজ্যে যাওয়া উটের গলায় সুঁচের ফুটো দিয়ে যাওয়ার মতো কঠিন। তাই গরীবই সুখী।” রিমা শুনতো, চোখে জল আসতো। বাবা’র কষ্ট সে বুঝতো।
এক রোববার সকালে গীর্জায় গিয়েছিলো দু’জনে। পাদ্রি বাবান উপদেশ দিচ্ছিলেন। “প্রভু যীশু বলেছেন, স্ত্রী ও স্বামীর মধ্যে ভালোবাসা থাকবে। কিন্তু অহঙ্কার সব নষ্ট করে।” জোয়েল মাথা নিচু করে বসেছিলো। লীলা আসেনি। বাড়ির কাজ করছিলো। রিমা বাবার হাত ধরেছিলো। “বাবা, মা কেন তোমাকে ভালোবাসে না?” জোয়েল হাসলো। “বিটি, মানুষের মন পরিবর্তন করেন প্রভু। আমি প্রার্থনা করছি।” সেইদিন বিকেলে জোয়েল চলে গেলো আবার দূরে।
বছর গেলো। রিমা বড় হলো। স্কুলে পড়তো, গণিতে ভালো করতো বাবার মতো। লীলা তাকে পড়াতো না। “তোর বাবার মতো গরীব হবি না। আমার সম্পত্তি রক্ষা কর।” রিমা’র মন খারাপ হতো। মামার বাড়িতে যেতো রোববার। সেখানে শিশুরা খেলা করতো, কিন্তু তারা রিমাকে বলতো, “তোর বাবা গরীব, তাই তোকে খেলতে দেবো না।” রিমা কাঁদতো। বাড়ি ফিরে লীলাকে বলতো। লীলা হাসতো। “এটা তো সত্যি। তোর বাবা কোনো কাজের নয়।”
একদিন জোয়েলের চিঠি এলো। “লীলা, আমার শরীর খারাপ। চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। বাড়ি ফিরছি।” লীলা চিঠি পড়ে জ্বালিয়ে দিলো। রিমা দেখলো। “মা, বাবা আসছে কেন বললে না?” লীলা চিৎকার করলো। “আসুক, কিন্তু এ বাড়িতে থাকবে না। আমার সম্পত্তি তার নয়।” রিমা কষ্ট পেলো। গীর্জায় গিয়ে পাদ্রি বাবানকে বললো। “পাদ্রি কাকা, আমার বাবা কষ্ট পাচ্ছে। মা তাকে ভালোবাসে না।” পাদ্রি বাবান হাত রেখে প্রার্থনা করলেন। “প্রভু যীশু, এই পরিবারকে আশীর্বাদ করুন। ভালোবাসা দিন।”
জোয়েল ফিরলো দু’মাস পর। শরীর দুর্বল, কিন্তু চোখে আলো। উঠোনে বসলো। লীলা দরজা খুললো না। রিমা ছুটে গেলো। “বাবা!” জোয়েল তাকে জড়িয়ে ধরলো। “বিটি, আমি এখনো বেঁচে আছি প্রভুর কৃপায়।” লীলা বেরিয়ে এলো। “কী চাই তোমার? টাকা?” জোয়েল মাথা নাড়লো। “না লীলা। শুধু শান্তি চাই।” লীলা হাসলো বিদ্রƒপে। “শান্তি? তুমি তো গরীব। যাও তোমার জায়গায়।” জোয়েল উঠলো না। রাতে উঠোনে শুয়ে রইলো।
পরের দিন সকালে রিমা উঠলো। উঠোনে বাবার লাশ পড়ে আছে। হার্ট অ্যাটাক। ডাক্তার এসে বললো, “অনেকদিনের কষ্ট।” লীলা কাঁদতে শুরু করলো জোরে। লোকজন জড়ো হলো। রিমা দাঁড়িয়ে দেখছিলো। তার মনে বাবার কথা ঘুরছে। “প্রভু সব দেখেন।” পাদ্রি বাবান এলেন। লাশের কাছে বসলেন। “প্রভু যীশু, তোমার সেবককে রাজ্যে নিয়ে যাও।” লীলা পাদ্রির কাছে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো। “পাদ্রি, আমার স্বামী চলে গেলো। কী করবো?” পাদ্রি তাকালেন রিমার দিকে। রিমা চোখ নামালো।
শ্মশানযাত্রা হলো গীর্জার কাছে। পাদ্রি বাবান কবর খোদাই করলেন। “জোয়েল ছিলো প্রভুর ভক্ত। গরীব হলেও মন সমৃদ্ধ।” লীলা কাঁদছিলো। কিন্তু রিমা জানতো, এ কান্না ভান। বাড়ি ফিরে লীলা বললো। “এখন সম্পত্তি আমার। তুই দেখিস।” রিমা কিছু বললো না। রাতে গীর্জায় গেলো একা। পাদ্রি বাবান বসে ছিলেন। “রিমা, কী হয়েছে?” রিমা কাঁদলো। “পাদ্রি কাকা, মা বাবাকে ভালোবাসতো না। গরীব বলে তুচ্ছ করতো। আমি সব দেখেছি।” পাদ্রি হাত ধরলেন। “বিটি, প্রভু বলেছেন, বিচার করো না। ক্ষমা করো। তোমার মা’র মনও কষ্টে ভরা।”
রিমা ফিরলো বাড়ি। লীলা বিছানায় শুয়ে আছে। “মা, বাবা তোমাকে ভালোবাসতো। কেন তাকে কষ্ট দিলে?” লীলা উঠলো। “ও গরীব ছিলো। আমার পরিবার বলতো না বিয়ে করতে। কিন্তু আমি করলাম। পরে অনুশোচনা হলো। সম্পত্তি পেয়ে মনে হলো, ওর জন্যে নয়।” রিমা চোখে জল নিয়ে বললো। “মা, প্রভু যীশু বলেছেন, ধনের জন্যে স্বর্গ হারাবে না। বাবা কখনো টাকা চায়নি।” লীলা চুপ করলো।
দিন গেলো। রিমা স্কুলে যায়, গীর্জায় যায়। পাদ্রি বাবান তাকে পড়ান। “বাইবেল পড়ো। প্রভুর কথা মনে রাখো।” লীলা একা থাকে। রাতে কাঁদে। এক রোববার গীর্জায় গেলো। পাদ্রি বাবান দেখলেন। “লীলা, এসো। প্রার্থনা করি।” উপদেশে বললেন, “প্রভু যীশু ক্ষমা করেছেন। তুমিও করো।” লীলা কাঁদলো সত্যি। “পাদ্রি, আমি জোয়েলকে কষ্ট দিয়েছি। গরীব বলে অবহেলা করেছি। এখন অনুশোচনা হচ্ছে।”
রিমা’র জীবন চলতে থাকে। সে বাবার মতো মেধাবী। কলেজে ভর্তি হলো। লীলা সম্পত্তি বেচতে চায়। রিমা বাধা দেয়। “মা, এগুলো বাবার কষ্টের ফল নয়। গীর্জার জন্যে দাও। শিশুদের পড়ানোর জন্যে।” লীলা রাজি হলো না প্রথমে। কিন্তু পাদ্রি বাবান এলেন। “লীলা, প্রভু বলেছেন, দাও এবং পাবে।” লীলা ভাবলো। রাতে প্রার্থনা করলো। সকালে বললো। “ঠিক আছে রিমা। অর্ধেক সম্পত্তি গীর্জাকে দেবো।”
গীর্জায় একটা অনুষ্ঠান হলো। পাদ্রি বাবান বললেন। “জোয়েলের স্মৃতিতে এই ফান্ড। গরীব শিশুদের পড়াবো।” লীলা মঞ্চে উঠলো। “আমি আমার ভুল স্বীকার করছি। জোয়েলকে কখনো সম্মান দিইনি। আজ প্রভুর কাছে ক্ষমা চাই।” রিমা পাশে দাঁড়িয়েছিলো। চোখে জল। মা তাকে জড়ালো। “বিটি, ক্ষমা করিস।” রিমা বললো। “প্রভু ক্ষমা করেছেন, আমিও করলাম।”
বছর পর রিমা ডাক্তার হলো। গ্রামে যায় বাবার মতো। লীলা গীর্জায় সেবা করে। পাদ্রি বাবান হাসেন। “প্রভুর কৃপা।” উঠোনের সেই লাশ এখন স্মৃতি। কিন্তু কষ্ট থেকে ভালোবাসা জন্ম নিয়েছে।
রিমা’র ছোটবেলার স্মৃতি এখনো তাজা। পাঁচ বছর বয়সে প্রথম দেখেছিলো বাবা’র কষ্ট। রোববার গীর্জা থেকে ফিরে জোয়েল উঠোনে বসে বাইবেল পড়ছিলো। লীলা এসে বললো। “এসব পড়ে কী হবে? টাকা আনো।” জোয়েল চুপ। রিমা লক্ষ্য করছিলো। “বাবা, কেন মা রাগ করে?” জোয়েল বললো। “বিটি, মা’র মন অহঙ্কারে ভরা। প্রভু পরিবর্তন করবেন।” সেই রাতে রিমা শুনছিলো লীলা মামার সঙ্গে ফোনে কথা বলছে। “ও গরীব ছেলে। আমার জীবন নষ্ট করেছে। সম্পত্তি রক্ষা করতে হবে।”
স্কুলে রিমা’র বন্ধু ছিলো মেরি। তার বাবা-মা দু’জনে সমান। রিমা তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখতো ভালোবাসা। “কেন আমাদের বাড়িতে এমন হয় না?” মেরিকে জিজ্ঞেস করতো। মেরি বলতো। “প্রভু সবাইকে ভালোবাসেন। তোমার বাড়িতেও হবে।” কিন্তু হলো না। জোয়েলের চাকরি দূরে। প্রতি মাসে একদিন আসতো। রিমাকে নিয়ে গীর্জায় যেতো। পাদ্রি বাবান তাদের আশীর্বাদ করতেন। “জোয়েল, তোমার ধৈর্য প্রভুর মতো।”
একবার জোয়েল অসুস্থ হয়েছিলো। এনজিও থেকে ফোন এলো। লীলা যায়নি। রিমা গিয়েছিলো স্কুল ছুটি নিয়ে। হাসপাতালে বাবা শুয়ে। “বিটি, ভয় পেয়ো না। প্রভু সঙ্গে আছেন।” রিমা কাঁদলো। ফিরে লীলাকে বললো। “মা, বাবা মরে যাবে।” লীলা বললো। “যাক। তার জন্যে কষ্ট সহ্য করবো না।” রিমা’র মন ভেঙে গেলো। সেই থেকে সে বাবার সঙ্গে দূরত্ব বহজায় রাখতে শিখলো না, বরং মা’র সঙ্গে।
জোয়েল সুস্থ হয়ে ফিরলো। কিন্তু লীলা আরো কঠোর হলো। “তুমি এ বাড়ি ছাড়ো।” জোয়েল বললো। “আমি রিমাকে দেখবো।” লীলা হাসলো। “ও আমার মতো হবে। গরীবের মতো নয়।” রিমা শুনছিলো দরজার আড়াল থেকে। তার মনে ঘৃণা জন্ম নিলো মা’র জন্যে। কিন্তু প্রভুর শিক্ষা মনে পড়ে। “ক্ষমা করো।”
লাশ পড়ার দিনটি রিমা ভুলতে পারে না। সকালে উঠে দেখলো বাবা উঠোনে পড়ে। লীলা ছুটে এলো। কিন্তু তার চোখে আনন্দও মিশে ছিলো যেন। “এতো কষ্ট দিয়েছে। এখন শান্তি।” রিমা ভাবলো। লোকজন এলে কান্না শুরু। পাদ্রি বাবান এসে সব শান্ত করলেন। কবর দেওয়ার সময় রিমা মাটি ছুড়লো। “বাবা, আমি তোমার মতো হবো।”
পরবর্তী দিনগুলো কঠিন। লীলা সম্পত্তি ভাগ করতে চায় মামাদের সঙ্গে। রিমা বাধা দেয়। “এটা বাবার কষ্টের ফল।” মামা রবার্ট আসে। “তুই ছোট মেয়ে। চুপ কর।” রিমা গীর্জায় যায়। পাদ্রি বাবান বলেন। “আইন করে লড়ো না। প্রার্থনা করো।” রিমা প্রার্থনা করে। লীলা স্বপ্ন দেখে জোয়েলকে। “ক্ষমা করো লীলা।” সে ভয় পায়।
এক সন্ধ্যায় লীলা রিমাকে বলে। “বিটি, তোর বাবা আমাকে ভালোবাসতো। আমি তাকে হারিয়েছি।” রিমা জড়িয়ে ধরে। “মা, প্রভু ক্ষমা করবেন।” দু’জনে গীর্জায় যায়। পাদ্রি বাবান প্রার্থনা করান। “প্রভু যীশু, এই পরিবারকে এক করুন।” লীলা কাঁদে। “আমি ভুল করেছি। গরীব বলে অবজ্ঞা করেছি।”
রিমা কলেজে পড়তে শুরু করে। চিকিৎসা পড়ে। গ্রামে যায় ছুটিতে। গরীব শিশুদের দেখে। বাবার স্মৃতিতে একটা ক্লিনিক খোলে। লীলা সাহায্য করে। সম্পত্তির টাকা দেয়। পাদ্রি বাবান উদ্বোধন করেন। “জোয়েলের আত্মা খুশি।” লোকজন আসে। রিমা হাসে। “প্রভুর কৃপা।”
বছর দশেক পর। রিমা বিবাহিত। স্বামীও গরীব ঘরের, কিন্তু মেধাবী। লীলা আশীর্বাদ করে। “ভালোবাসো একে অপরকে।” গীর্জায় বিয়ে। পাদ্রি বাবান বলেন। “যেমন জোয়েল ভালোবাসতো।” উঠোনটা এখন ফুলে ভরা। লাশের স্মৃতি মিলিয়েছে। কষ্ট থেকে আলো জন্মেছে। প্রভু যীশুর নামে।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.















