

অঞ্জন যখন নীলমণিগঞ্জ স্টেশনে নামলো, তখন ঝিরঝিরে বৃষ্টি পড়ছিলো। হাতে একটা জীর্ণ ট্রলি ব্যাগ, আর চোখে তিন বছরের ক্লান্তির ছাপ। এ তিন বছরে অঞ্জনের জীবনের ওপর দিয়ে কালবৈশাখী বয়ে গেছে। অথচ অঞ্জন ছিলো এক সাধারণ স্কুল শিক্ষক। ছিমছাম জীবন, আর সুন্দরী স্ত্রী লতিকাকে নিয়ে ওর সাজানো সংসার ছিলো পাড়ার মানুষের কাছে ঈর্ষণীয়। কিন্তু সেই সাজানো বাগান যে এতো দ্রুত মরুভূমি হয়ে যাবে, তা’ অঞ্জন স্বপ্নেও ভাবেনি।
অঞ্জন আর লতিকার বিয়ে হয়েছিলো পারিবারিকভাবে। লতিকার বাবা পরেশবাবু এলাকায় বেশ প্রভাবশালী মানুষ। বিয়ের সময় তিনি অঞ্জনকে অনেক কিছু দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু অঞ্জন বিনয়ের সাথে তা’ প্রত্যাখ্যান করেছিলো। বিয়ের পর দু’টি বছর বেশ সুখেই কাটলো। লতিকা মাঝে মাঝে বাবার বাড়ি যেতো, আবার ফিরে আসতো। অঞ্জনের কাছে মনে হতো লতিকা তাকে ভালোবাসে। কিন্তু ঘটনার সূত্রপাত তিন বছর আগের এক শ্রাবণ মাসে।

সেদিন সকালে লতিকা বলেছিলো সে বাজারে যাচ্ছে কিছু পুজোর বাজার করতে। কিন্তু দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো, লতিকা আর ফিরলো না। অঞ্জন থানায় খবর দিলো, আত্মীয়স্বজনের বাড়ি খুঁজলো, কিন্তু কোথাও লতিকার চিহ্ন পাওয়া গেলো না। পরদিন সকালেই পুলিশ অঞ্জনের দরজায় কড়া নাড়লো। পরেশবাবু অঞ্জনের বিরুদ্ধে যৌতুকের দাবি এবং লতিকাকে নিখোঁজ করার মামলা ঠুকে দিয়েছেন।
অঞ্জন স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলো। যে মানুষটাকে সে এতোটা ভালোবেসেছিলো, তার বাবার কাছ থেকে এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগ আসবে, তা’ ছিলো কল্পনাতীত। পরেশবাবু প্রভাব খাটিয়ে পুলিশ দিয়ে অঞ্জনকে গ্রেফতার করালেন। পুলিশি রিমান্ডে অঞ্জনকে যতোটা সম্ভব শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হলো। ছয় মাস অন্ধকার কুঠুরিতে জেল খাটলো অঞ্জন। আদালত যখন জামিন দিলো, তখন অঞ্জন সমাজচ্যুত এক জীবন্ত লাশ। পাড়ার লোকেদের বাঁকা চাহনি আর পুলিশের নিয়মিত হানা থেকে বাঁচতে অঞ্জন রাতের অন্ধকারে নিজের গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে গেলো দূরের এক জেলা কুড়িগ্রামে। সেখানে এক ইটের ভাটায় নাম পাল্টে শ্রমিকের কাজ করতে শুরু করলো সে।
কুড়িগ্রামে অঞ্জনের জীবন ছিলো খুবই কষ্টের। প্রতিমাসে সে যতোটা পারতো টাকা জমাতো, যদি কখনো আইনি লড়াইয়ে নামতে হয় সেই আশায়। ওর চোখে সবসময় একধরণের নস্টালজিয়ার পানি চিকচিক করতো। সে ভাবতো, লতিকাকে কী’ কেউ পাচার করে দিলো? না কী’ সে মরে গেছে? লতিকার কথা মনে পড়লে ওর বুক ফেটে যেতো।
একদিন ভাটার মালিকের কিছু নথিপত্র নিয়ে অঞ্জনকে যেতে হলো শহরের এক প্রান্তে। সেখানে একটি নতুন ঘর তোলা হচ্ছে। অঞ্জন যখন সেখানে পৌঁছালো, দেখলো একটি বাড়ির সামনে একটা শিশু খেলা করছে। শিশুটিকে দেখে অঞ্জনের কেন জানি মায়া লাগলো। সে পকেট থেকে একটা লজেন্স বের করে শিশুটির হাতে দিয়ে বললো, “তোমার নাম কী’ খোকা?”
শিশুটির উত্তর দেয়ার আগেই ভেতর থেকে এক মহিলা বের হয়ে এলেন। হাতে তার ভাতের থালা, শিশুকে খাওয়াতে এসেছেন। মহিলাকে দেখেই অঞ্জনের পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেলো। এ তো লতিকা! ঠিক তিন বছর আগে যেমন দেখেছিলো, ততোটা বদলায়নি, শুধু সিথিতে চওড়া সিঁদুর আর গলার হারটা পাল্টেছে।
লতিকাও অঞ্জনকে দেখে মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেলো। তার হাতের থালাটা মাটিতে পড়ে গেলো। ঠিক সেসময় ঘর থেকে এক সুঠামদেহী যুবক বের হয়ে এলো। যুবকটি লতিকার কাঁধে হাত দিয়ে বললো, “কী’ হলো লতিকা? থালাটা ফেলে দিলে কেন?”
লতিকা থতমত খেয়ে বললো, “না, কিছু না। এ লোকটা মনে হয় পথ হারিয়েছে।”
অঞ্জন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। তার গলার স্বর বুজে আসছিলো। সে ভাঙা গলায় বললো, “লতিকা, তুমি এখানে? এই তিন বছর আমি তোমার জন্যে জেল খাটলাম, গ্রাম ছাড়া হলাম, আর তুমি এখানে পরকীয়া প্রেমিকের সংসারে সুখে আছো?”
ঐ যুবকটি, যার নাম ছিল সমীর, সে সব শুনে অঞ্জনকে ধমকে উঠলো। কিন্তু লতিকার চোখের জল দেখে সে একটু দমে গেলো। লতিকা কাঁদতে কাঁদতে স্বীকার করলো যে, সে অঞ্জনকে কোনোদিন ভালোবাসেনি। বিয়ের আগে থেকেই তার সমীরের সাথে সম্পর্ক ছিলো। কিন্তু পরেশবাবুর অহঙ্কারের কারণে সে লতিকাকে সমীরের সাথে বিয়ে দেননি। তাই লতিকা নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজিয়ে সমীরের সাথে পালিয়ে এসেছিলো।
অঞ্জন চিৎকার করে বললো, “তুমি পালিয়ে এলে আসতেই পারতে, কিন্তু তোমার বাবা কেন আমার নামে মিথ্যা মামলা করলো? কেন আমাকে ছয় মাস বিনা দোষে জেল খাটালো?”
লতিকা মাথা নিচু করে রইলো। কোনো উত্তর তার কাছে ছিলো না। অঞ্জন বুঝলো, পরেশবাবু জানতেন লতিকা কার সাথে গেছে, কিন্তু নিজের মান-সম্মান বাঁচাতে আর অঞ্জনকে শেষ করে দিতে তিনি এই ষড়যন্ত্র করেছিলেন। নারীর চোখের জল দেখে পুলিশ আর সমাজ অঞ্জনের কথাই শোনেনি, সবাই লতিকাকে ‘অসহায় শিকার’ ভেবে নিয়েছিলো।
অঞ্জনের মনে হলো তার পৃথিবীটা মিথ্যে। যে নারীর কান্নার জন্য সে সারারাত জেগে থাকতো, সেই নারীর চোখের জল যে এতোটা বিষাক্ত হতে পারে, তা’ সে আজ বুঝতে পারলো। অঞ্জন বুঝলো, বিচার পেতে হলে তাকে শক্ত হতে হবে। সে সমীর আর লতিকার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো, “তোমরা ভালো থাকো। কিন্তু আমার ছয় মাসের জেল আর হারানো সম্মানের হিসেব আমি আইনি পথেই নেবো। আমি লড়বো।”
অঞ্জন আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। তার চোখের কোণে এখন আর নস্টালজিয়া নেই, আছে ন্যায়ের জন্য লড়াইয়ের আগুন। সে সোজা স্টেশনের দিকে হাঁটতে শুরু করলো। পথে যেতে যেতে সে ভাবছিলো, সমাজে কতোটা ভয়ঙ্কর হতে পারে অন্ধ বিশ্বাস। যে লতিকার চোখের জল দেখে পাড়া-পড়শি তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলো, সেই চোখের জলই ছিলো অঞ্জনের জীবনের সবথেকে বড় প্রতারণা।
অঞ্জন মনে মনে ঠিক করলো, সে আর ভয় পাবে না। সে নিজের জেলায় ফিরে যাবে। পরেশবাবুর সাজানো মিথ্যে সাম্রাজ্য সে তছনছ করে দেবে। সে জানতো পথটা কঠিন, কিন্তু এখন তার হারাবার আর কিছু নেই। জীবনের এই চরম সঙ্কটে দাঁড়িয়ে অঞ্জন কা-জ্ঞান হারালো না। বরং সে ধীরস্থিরভাবে সবকিছু সামলানোর পরিকল্পনা করলো।
অঞ্জনের এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কেবল চোখের জল দেখে কাউকে বিচার করা ঠিক নয়। সত্য সবসময় দৃশ্যমান হয় না, অনেক সময় তা’ গভীর অন্ধকারের আড়ালে ঢাকা থাকে। অঞ্জনের মতো কতোটা সাধারণ মানুষ এমন ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছে, তার হিসেব হয়তো কেউ রাখে না। কিন্তু সত্যের জয় একদিন হবেইÑএই বিশ্বাস নিয়ে অঞ্জন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করলো।
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি.
















