ছোটগল্প : তালাবদ্ধ ট্রাঙ্কের রহস্য

ক্ষুদীরাম দাস :
এক.
নিঝুম রাত। গ্রামের মেঠোপথ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পুরনো পৈতৃক বাড়িটার ওপর যেন জেঁকে বসেছে এক হিমশীতল নীরবতা। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত একটা বাজে। বাইশ বছরের তরুণ রফিক তার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলো। ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক আর দূরে কোন এক দূরবর্তী বাঁশঝাড়ের হাওয়ার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিলো না।

আজ রাতে রফিক এক চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। তার কাকা অনেক বছর ধরে প্রবাসী। বাড়িত থাকাতেন শুধু তার চাচি—আলেয়া বেগম। দেখতে শান্ত-শিষ্ট ও হাসিখুশি হলেও আলেয়া বেগমের মধ্যে একটা অদ্ভুত রহস্য জমা ছিলো। ঘরের এক কোণে রাখা বিশাল ভারী টিনের ট্রাঙ্কটা ছিলো সেই রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। প্রকাণ্ড সেই পিতলের তালা ঝুলানো ট্রাঙ্কটা চাচি সব সময় বন্ধ রাখতেন। কখনো কাউকে সেটার কাছে যেতে দিতেন না। এমনকি রফিক ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছে, সেই ট্রাঙ্কের চাবি চাচি সব সময় নিজের আঁচলে শক্ত করে বেঁধে রাখতেন।

রফিক শুনেছিলো, এই ট্রাঙ্কের ভেতর নাকি কাকার পাঠানো অনেক গোপন দলিল আর জমানো টাকা রাখা আছে। কয়েক দিন ধরে রফিকের খুব টাকার দরকার ছিলো। তার বাবার চিকিৎসা ও সংসারের চালচলনের জন্যে টাকার প্রচণ্ড সংকট তৈরি হয়েছিলো। প্রতিমাসে বাবার যে আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছিলো। তাই রফিক ভেবেছিলো, ট্রাঙ্কের ভেতর ঠিক কী আছে, তা আজ রাতেই তাকে দেখতে হবে।

দুই.
বাড়িটা নীরবতায় ডুবে গেলে রফিক পা টিপে টিপে চাচির ঘরের দিকে এগোতে লাগলো। সে জানতো, চাচি রাতে খুব ভারী ঘুমে থাকেন। আস্তে করে ঘরের শিকল খুলে রফিক ভেতরে ঢুকলো। খাটের একপাশে রাখা ছিলো সেই বিশাল ট্রাঙ্ক। ট্রাঙ্কের ওপর জমানো ধুলোর আস্তরণ আর জং ধরা কোনাগুলো যেন কোনো পুরনো ইতিহাস বহন করছিলো।

ভাগ্যের জোরই বলতে হবে, আজ হয়তো তাড়াহুড়ো করে ঘুমাতে গিয়ে চাচি চাবিটা আঁচল থেকে খুলে কুলুঙ্গির ওপর রেখে দিয়েছিলেন। রফিক অতি সাবধানে চাবিটা হাতে নিলো। ধুকধুক করতে থাকা বুক চেপে ধরে সে তালার ভেতর চাবি ঢুকিয়ে মোচড় দিলো। ‘কট’ করে একটা শব্দ হলো। রফিকের শরীরটা ভয়ে কেঁপে উঠলো। সে মুহূর্তের জন্যে থমকে দাঁড়ালো—চাচি জেগে উঠলেন কি?

না, চাচি পাস ফিরে অন্যদিকে মুখ করে শুলেন।

রফিক ধীরে ধীরে ট্রাঙ্কের ঢাকনাটা ওপরে তুললো। ট্রাঙ্কের ভেতরটা বেশ বড়। ভেতরে রাখা ছিলো কিছু পুরনো কাঁথা আর কাপড়ের স্তূপ। রফিক সেগুলো সরাতে যাবে, অমনি বাইরে উঠোন থেকে ভারী বুটের শব্দ আর মানুষের ফিসফিসানি ভেসে এলো!

বাইরের দরজা খোলার শব্দ হতেই রফিক আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়লো। এখন পালিয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সে আর কোনো উপায় না পেয়ে এক নিমেষে শরীরটাকে দুমড়ে-মুচড়ে সেই বিশাল ট্রাঙ্কের ভেতর ঢুকিয়ে নিলো এবং ভেতর থেকেই ঢাকনাটা নামিয়ে দিলো। ঢাকনাটি নামার সাথে সাথে বাইরের অংশটুকু নিজে থেকেই আটকে গেলো—বাইরে থেকে তালাটা যেন কড়া হয়ে বসে গেলো!

 

তিন.
ট্রাঙ্কের ভেতরের অন্ধকারটা এতোটাই নিরেট ও কুচকুচে যে রফিকের দম আটকে আসতে চাইছিলো। বাতাস খুব কম। সে এক অদ্ভুত ভীতি অনুভব করছিলো। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছিলো। ভেতর থেকে কোনোমতে সে বাইরের আওয়াজ শোনার চেষ্টা করছিলো।

বাইরে চাচির গলা শোনা গেলো। কিন্তু চাচির কণ্ঠে যে ভয়ংকর দৃঢ়তা আর নির্দয়তা ছিলো, তা রফিক তার জীবনে কোনোদিন শোনেনি!

“সব ব্যবস্থা রেডি তো?” চাচি এক অচেনা পুরুষকে জিজ্ঞেস করছিলেন।

“হ্যাঁ, খালাম্মা,” এক কর্কশ গলায় উত্তর এলো। “মালপত্র সব তৈরি। কিন্তু পুলিশ যদি টের পায়? আজকাল পুলিশের বড় সংকট চলছে, চারদিকে টহল দিচ্ছে।”

চাচি ঠান্ডা গলায় হাসলেন। সে হাসি শুনে রফিকের গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেলো। চাচি বললেন, “পুলিশ কী করবে? তারা ভাববে এগুলো সাধারণ চালের বস্তা। এই কটা দিনেই আমি কোটি টাকার ব্যবসা করবো। কাকার পাঠানো টাকার দরকার আমার নেই, এই ব্যবসাই আমাকে অঢেল ধন-সম্পদ দিয়েছে। আর যে রফিক ছেলেটা ঘুরে বেড়ায়, ও তো এক নম্বর হাঁদা। ও কিচ্ছু টের পাবে না।”

রফিক ট্রাঙ্কের ভেতরে বসে ভয়ে একদম জমে গেলো। সে বুঝতে পারলো, চাচি শুধু একজন সাধারণ গৃহিণী নন—তিনি কোনো এক ভয়ংকর চোরাচালান চক্রের মূল কারিগর! এই ট্রাঙ্কে যে কাঁথা আর কাপড় ছিলো, তার নিচে আসলে ছিলো দামী চোরাই মাল ও অবৈধ নেশাজাতীয় জিনিসপত্রের চালান।

রফিক উপলব্ধি করলো, তার অহংকার আর কৌতুহল তাকে এমন এক ফাঁদে ফেলেছে যা থেকে বেঁচে ফেরা কঠিন। তার মনে হলো, অহংকারের পতন বুঝি এভাবেই হয়।

 

চার.
ট্রাঙ্কের ভেতরে অক্সিজেনের পরিমাণ ক্রমশ কমে আসছিলো। রফিকের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগলো। সে ভাবছিলো, আজ যদি সে এখান থেকে বের হতে না পারে, তবে এই অন্ধকার ট্রাঙ্কটাই তার কবর হয়ে যাবে। সে ভাবলো, “আমি কি আর কোনোদিন আলোর মুখ দেখতে পাবো না? আমি কি আর বেঁচে ফিরতে পারবো?”

চাচি আর সেই লোকটির কথোপকথন শেষ হলো। লোকটা বেরিয়ে যাওয়ার পর চাচি ঘরের বাতি নিভিয়ে দিলেন।

রফিক ট্রাঙ্কের ভেতরের দেওয়ালে একটু নাড়াচড়া করার চেষ্টা করলো। কিন্তু ট্রাঙ্কটা বড্ড শক্ত। রফিকের শরীরের সমস্ত শক্তি যেন নিঃশেষ হয়ে আসছিলো। সে মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে লাগলো। সে শপথ করলো, যদি সে আজ বেঁচে যায়, তবে সে আর কখনো কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে পা বাড়াবে না।

ঠিক তখন সে খেয়াল করলো, ট্রাঙ্কের তলার দিকে একটা জায়গায় কাঠ ও টিন কিছুটা পচা। বহু পুরনো হওয়ার কারণে সেখান দিয়ে সামান্য হাওয়া আসছিলো। রফিক তার পকেটে হাত দিলো। ভাগ্যের কি অদ্ভুত খেলা! পকেটে ছিলো একটা ছোট ফোল্ডিং ছুরি, যা সে ডাব কাটার জন্যে সব সময় সাথে রাখতো।

রফিক অন্ধকারের মধ্যেই ছুরিটা বের করে ট্রাঙ্কের সেই জং ধরা ও পচা অংশে চাপ দিতে লাগলো। শব্দ যেন না হয়, সেদিকে তার কড়া নজর ছিলো। একে তো দম বন্ধ হওয়ার যোগাড়, তার ওপর চরম উৎকণ্ঠা—এই দুইয়ের মধ্যদিয়ে রফিক কাজ চালিয়ে যেতে লাগলো।

 

পাঁচ
প্রচণ্ড পরিশ্রমে রফিকের শরীর ঘেমে জবজব হয়ে গেলো। একসময় ধাতব অংশটা কিছুটা ফাঁক হলো এবং সেখান থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ভেতরে আসতে লাগলো। রফিক দীর্ঘ শ্বাস নিলো। জীবনের আলো যেন সে আবার খুঁজে পেলো।

কিন্তু শুধু বাতাস পেলেই তো হবে না, তাকে বের হতে হবে। রফিক ছুরিটা দিয়ে তালার ভেতরের দিকের পাতলা হুকটার ওপর চাপ দিতে শুরু করলো। দীর্ঘ আধঘণ্টার চেষ্টার পর পরম করুণাময়ের কৃপায় তালাটার ভেতরের অংশ আলগা হয়ে এলো।

রফিক খুব ধীরে ধীরে ট্রাঙ্কের ঢাকনাটা একটু তুললো। ঘরের বাতি নেভানো। চাচি খাটে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

রফিক অত্যন্ত সাবধানে ট্রাঙ্ক থেকে বের হয়ে এলো। তার হাঁটু দুটি তখনো কাঁপছিলো। সে ঘরের বাইরে এসে দরজায় বাইরের থেকে শিকল তুলে দিলো। তারপর দৌড়ে সোজা গ্রামের মাতব্বর ও পাহারাদারদের কাছে গিয়ে সব ঘটনা খুলে বললো।

প্রথমে কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। কিন্তু রফিকের আকুলতা দেখে তারা গ্রামে টহলরত পুলিশ দলকে খবর দেয়।

পুলিশ এসে যখন ঘরের দরজার শিকল খুলে ভেতরে ঢোকে, তখন চাচি শিউরে ওঠেন। ট্রাঙ্ক খোলা এবং সেটার গোপন কুঠুরি থেকে কোটি টাকার চোরাই পণ্য বের হতে দেখে পুলিশ স্তম্ভিত হয়ে যায়।

চাচি যখন রফিকের দিকে তাকালেন, তখন তার চোখে ছিলো চরম বিস্ময় ও ক্রোধ। কিন্তু রফিক শান্তভাবে দাঁড়িয়ে ছিলো। সে জানতো, আজ রাতের এই অভিজ্ঞতা তার জীবনের সমস্ত দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।

ছয়.
পরদিন সকালে গ্রামে যখন আলো ফুটলো, তখন পুরো গ্রামে এই ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে। রফিক তার বাবার পাশে গিয়ে বসলো। সে বুঝতে পারলো, টাকার সংকটে পড়ে অসৎ পথ বা কৌতূহলের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ত মানুষকে কত বড় বিপদে ফেলতে পারে।

ভোরের উদিত সূর্যের দিকে তাকিয়ে রফিক মনে মনে বললো, “অন্যায় ও অপরাধের অন্ধকার যত গভীরই হোক না কেন, সত্যের আলো একদিন না একদিন ফুটবেই।”

প্রকাশিত:  বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy