

ক্ষুদীরাম দাস :
ডাঙ্গাপাড়া গ্রামটি অন্য আট-দশটা গ্রামের মতো সাধারণ হলেও এর মেঠো পথ, পুকুরঘাট আর বাঁশঝাড়ের ছায়ায় এক অদ্ভুত মায়া জমা হয়ে থাকতো। এই গ্রামেই বেড়ে উঠেছিলো অনিক। কায়স্থ পরিবারের ছেলে সে, কিন্তু তার ভাগ্যে পরিবার বলতে যা বোঝায়, তা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ছোটবেলায় বাবাকে হারায়, আর কিশোর বয়সে পৌঁছে মাকে। কোনো ভাই ছিলো না, বোনও ছিলো না। এই সুবিশাল নিঃসঙ্গ জগতে অনিক একেবারে একা।
গ্রামের দক্ষিণ পাড়ার পুরানো মন্দিরটার পাশে ছোট্ট একটুকরো ভিটে আর একচাল ঘর ছিলো অনিকদের। মা মারা যাওয়ার পর সেই ঘরে কেবল অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা জমতো। কিন্তু অনিক হার মানেনি। বয়স তার আঠারো-উনিশ হবে, কাজ করতো গ্রামের একমাত্র ছোট সুতার দোকানে আর মাঝে মাঝে হাটের দিনে সদাইপত্র বেচাকেনায় সাহায্য করতো।

আমার সঙ্গে অনিকের প্রথম পরিচয় ডাঙ্গাপাড়ার পঞ্চায়েত তলার শিবমন্দিরে। আমার নাম শুভাশিস। কর্মসূত্রে পাশের শহর থেকে ডাঙ্গাপাড়ায় এসেছিলাম একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে। একলা থাকার অভ্যেস আমারও ছিলো, কিন্তু অনিকের একলা থাকাটা আমাকে নাড়া দিয়েছিলো।
প্রথম প্রথম দেখতাম, অনিক দূরে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতো। নদীর ঘাটে যখন বিকেলে গিয়ে বসতাম, সে ছায়ার মতো একটু দূরে এসে বসতো। মুখে কোনো কথা নেই, কেবল চোখে এক ধরণের অসীম ভরসা আর প্রশ্ন।
একদিন বিকেলে কালবৈশাখীর মেঘ জমছে আকাশে। ডাঙ্গাপাড়ার মেঠো পথ দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ বৃষ্টি নেমে এলো। ঝুম বৃষ্টির মধ্যে আমি একটি বড় অশ্বত্থ গাছের নিচে আশ্রয় নিলাম। ঠিক তখনই দেখলাম অনিক ছুটতে ছুটতে এসে আমার মাথার ওপর নিজের গায়ের গামছাটা তুলে ধরার চেষ্টা করছিলো।
আমি হেসে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি ভিজছো যে, অনিক?”
সে একটু লাজুক হেসে বললো, “দাদা, আপনার গায়ে পানি পড়লে ঠান্ডা লেগে যাবে। আমি তো এভাবেই অভ্যস্ত।”
সেদিন ওর চোখে আমি এক অদ্ভুত আলো দেখেছিলাম। আমি বুঝতে পারলাম—ছেলেটি আমাকে সত্যি দাদা হিসেবেই দেখে। কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই, নেই কোনো দেনা-পাওনার হিসেব; কিন্তু তার ওই নিষ্পাপ চাহনি আর যত্ন বলে দিচ্ছিলো, সে আমাকে তার নিজের বড়ভাইয়ের মতো দেখে। এটা আমি হৃদয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারলাম।
ডাঙ্গাপাড়ার বাতাসটা ছিলো ভারী মিষ্টি। বিকেল হলেই অনিক এসে আমার কুটিরের দরজায় দাঁড়াতো। হাতে হয়তো নদীর তাজা মাছ, নয়তো খেতের দুটো কাঁচা লঙ্কা আর শাক।
— “দাদা, বাড়িতে এ ছিলো, আপনার জন্যে নিয়ে এলাম।”
— “অনিক, প্রতিদিন এ এগুলো কেন আনো? তোমার নিজের জন্যেও তো রাখতে পারো।”
— “আমার আর কে আছে দাদা? একা মানুষ, যা পাই তাতেই চলে যায়। আপনার কাছে এগুলো দিলে মনটা শান্ত থাকে।”
আমি বুঝতাম, এই দেওয়াটা আসলে কোনো উপহার ছিলো না, এ ছিলো একটা সুতো দিয়ে আমাকে বেঁধে রাখার আকুল চেষ্টা। অনিক জানতো, জগতে তার কেউ নেই। তার এই চরম সত্যিটা তাকে প্রতিদিন কুঁড়ে কুঁড়ে খেতো। তাই হয়তো আমার মধ্যে সে তার হারিয়ে যাওয়া আশ্রয় খুঁজছিলো।
একদিন রাতে অনিকের ভীষণ জ্বর এলো। খবর পেয়ে আমি ওর একচালা ঘরে গেলাম। ঘরটা একদম অন্ধকার, কুপি জ্বলছিলো মৃদু আলোয়। জ্বরের ঘোরে সে একা একা কাতরাচ্ছিলো।
আমি ওর কপালে হাত দিলাম—শরীরটা যেন একদম আগুনের মতো জ্বলছিলো। আমি সঙ্গে সঙ্গে ভেজা গামছা দিয়ে তার মাথা মুছে দিতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর সে চোখ মেললো। হালকা কুপির আলোয় আমার দিকে তাকিয়ে তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো।
“কী হলো অনিক? কা্দঁছো কেন?”
সে কেঁপে উঠে বললো, “মা চলে যাওয়ার পর আর কেউ কোনোদিন আমার কপালে হাত দিয়ে দেখেনি, দাদা। আজকে আপনার এই হাতটা দেখে মনে হলো… ঈশ্বর হয়তো আমাকে পুরোপুরি নিঃস্ব করেননি। আপনি আমার বড়ভাইয়ের মতো।”
ওর কণ্ঠের আকুতি শুনে আমার চোখও ছলছল করে উঠলো। আমি কেবল ওর মাথায় হাত রেখে বললাম, “আমি তো আছি অনিক। নিজেকে একা ভাববে না কোনোদিন।”
ধীরে ধীরে অনিক আর আমার সম্পর্ক ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের সবার চোখে পড়তে লাগলো। গ্রামের বয়স্ক লোকরা প্রায়ই বলতো, “শুভাশিস, অনিক ছেলেটা বড় একা ছিলো রে। তুই আসার পর ছেলেটার মুখে হাসি ফুটেছে।”
দুর্গাপূজার সময় ডাঙ্গাপাড়ার সর্বজনীন মণ্ডপে বেশ ভিড় জমেছিলো। পূজার নতুন জামা কেনার সামর্থ্য অনিকের ছিলো না। সে পুরানো একটা ধুতি আর ফতুয়া পরে মণ্ডপের এক কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো।
আমি গোপনে ওর জন্যে একটা নতুন কুর্তা আর ধুতি কিনে রেখেছিলাম। অষ্টমীর সকালে যখন ওর হাতে জামাটা তুলে দিলাম, সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।
— “এ কী দাদা! আমার জন্যে?”
— “হ্যাঁ অনিক, ভাইয়ের জন্যে বড়ভাই জামা কিনবে না তো কে কিনবে?”
সে সেদিন কিছু বলতে পারেনি, কেবল জামাটা বুকে চেপে ধরে কেঁদে ফেলেছিলো। তারপর নতুন কাপড় পরে সে যখন মণ্ডপে গিয়ে অঞ্জলি দিলো, তার চেহারার আলোটাই বদলে গিয়েছিলো।
অনিকের এই ভালোবাসায় কোনো অহংকার ছিলো না, ছিলো না কোনো ছলনা। সে আমাকে কতোটা শ্রদ্ধা আর স্নেহ করতো, তা আমি প্রতিদিনের ছোট ছোট ঘটনায় বুঝতে পারতাম। হাট থেকে ফেরার সময় আমার প্রিয় মিষ্টি নিয়ে আসা, সন্ধ্যার সময় আমার টেবিলের হারিকেনটা পরিষ্কার করে জ্বালিয়ে দিয়ে যাওয়া—এসবের মধ্যে দিয়ে সে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতো।
একদিন ডাঙ্গাপাড়ায় নেমে এলো এক ভয়ংকর দুর্যোগ। বর্ষার শেষে হঠাৎ নদী উছলে উঠে পুরো গ্রাম প্লাবিত হতে লাগলো। নিচু এলাকাগুলো ডুবে গিয়ে এক চরম সংকট তৈরি হলো। অনিকের ঘরটাও নদীর কাছাকাছি হওয়ায় পানিতে ডুবে গেলো।
সে রাতে চারিদিকে কেবল মানুষের হাহাকার আর চিৎকার। আমি স্কুলের উঁচুমতো ঘরে আশ্রয় শিবিরের বন্দোবস্ত করছিলাম। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হলো—অনিক কোথায়?
বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাসের মধ্যেই আমি অনিকদের ভিটের দিকে ছুটলাম। গিয়ে দেখলাম, প্লাবিত পানিতে অনিক তার ঘরের চালের ওপর উঠে বসে আছে। ঠাণ্ডায় কাঁপছিলো সে, কিন্তু হাতে চেপে ধরে ছিলো এক ছোট্ট কাঠের বাক্স।
“অনিক! নেমে এসো! হাত ধরো আমার!” আমি হাঁটু পানিতে নেমে চেঁচিয়ে উঠলাম।
অনিক পানির তোড় সামলে নিচে নেমে এলো। আমার হাত ধরে সে নিরাপদে উঁচু রাস্তায় উঠে আসলো।
— “তুমি চালের ওপর কী করছিলে এতক্ষণ? বাক্সটাতে কী আছে?”
— “এটার মধ্যে মায়ের একটা পুরানো ছবি আর আপনি আমাকে পূজায় যে কুর্তাটা দিয়েছিলেন, সেটা ছিলো দাদা। এ দুটো হারিয়ে গেলে আমার আর কিছুই থাকতো না।”
ওর কথা শুনে আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। এ জগত তাকে কিছুই দেয়নি, অথচ যেটুকু সম্মান আর স্নেহ সে পেয়েছে, সেটাকেই সে জীবনের পরম সম্পদ বলে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
নদী শান্ত হলো, বন্যার পানি নেমে গেলো। কিন্তু ডাঙ্গাপাড়ার মানুষের সম্পর্কের গভীরতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। আমি পঞ্চায়েতের সঙ্গে কথা বলে অনিকের ঘরটা আবার শক্ত করে তৈরি করার ব্যবস্থা করলাম।
অনিক প্রতিদিন আমার সাথে সাথে থাকতো। কাজ করার সময় তার মুখে থাকতো এক অদ্ভুত তৃপ্তির হাসি। সে জানতো, সে একা হলেও এখন আর নিঃসঙ্গ নয়।
একদিন সন্ধ্যায় আমি নদীর তীরে বসে ছিলাম। সূর্যটা তখন রক্তিম হয়ে ডুবে যাচ্ছিলো। অনিক পাশে এসে বসলো।
“দাদা, একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“বল অনিক।”
“আপনি কি কোনোদিন এই ডাঙ্গাপাড়া ছেড়ে চলে যাবেন?”
আমি তার দিকে তাকালাম। অনিকের চোখে এক ধরণের ভয়ংকর অনিশ্চয়তা আর শঙ্কা দেখতে পেলাম। তার ভয়—যদি আবার সে একা হয়ে যায়।
আমি তার কাঁধে হাত রেখে শক্ত করে ধরলাম। বললাম, “আমার বদলি হলেও, এই ডাঙ্গাপাড়া আর তোর কথা আমি কখনো ভুলবো না অনিক। সম্পর্ক রক্তের নয়, হৃদয়ের হয়। তুই আমার ছোটভাইয়ের মতোই থাকবি সবসময়।”
আমার কথা শুনে অনিকের চোখে আবার পানি এসে গেলো। সে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো, কিন্তু তার চোখে আর সেই পুরানো নিঃসঙ্গতার ছায়া ছিলো না।
সত্যিই, অনিকের কেউ ছিলো না। তার কোনো ভাই ছিলো না, বোন ছিলো না, এই জগত তাকে একেবারেই একা করে দিয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে এমন এক ভাইকে খুঁজে পেয়েছিলো, যে তাকে একাকিত্বের অন্ধকার থেকে আলোয় ফিরিয়ে এনেছিলো। আর আমি? আমি পেয়েছিলাম এমন এক নিঃস্বার্থ ভাইয়ের ভালোবাসা, যা এই পৃথিবীর যেকোনো ধনসম্পদের চেয়ে অনেক বেশি দামি ও পবিত্র। ডাঙ্গাপাড়ার মাটি আর বাতাস এই চিরন্তন স্নেহের সাক্ষী হয়ে রইলো।
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














