

গল্প :
ক্ষুদীরাম দাস :
বিরামপুর রেলস্টেশনের তিন নম্বর প্লাটফর্মের কাঠের পুরনো বেঞ্চে বসে ছিলো অরণ্য। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেলে প্ল্যাটফর্মের চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিলো হালকা লালচে রোদ। ট্রেনের সময় হতে এখনো কিছুটা দেরি। বিরামপুর স্টেশনটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম শান্ত ও সুন্দর এক জায়গা, যেখানে বিকেলের হালকা হাওয়া আর স্টেশনের চা বিক্রেতাদের সুরের মূর্ছনা এক অদ্ভুত মায়াজাল তৈরি করে।
অরণ্যকে প্রথম দেখাতেই যে কেউ বলবে— এই তরুণটি প্রকৃত অর্থেই এক ‘স্মার্ট যুবক’। তবে তার এই স্মার্টনেস শুধু দামী পোশাক, মার্জিত চুল বা ভালো সুবাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। তার আচরণ, কথা বলার ধরন, চোখের আত্মবিশ্বাস এবং চারপাশের ছোটখাটো বিষয়গুলো সহজে সামলে নেওয়ার মধ্যে প্রকাশ পেতো এক অন্যরকম ব্যক্তিত্ব। বিরামপুরের স্থানীয় এক তরুণ উদ্যোক্তা সে, যে কিনা সফটওয়্যার আর ই-কমার্স নিয়ে কাজ করে নিজের এলাকাতেই এক বিশাল সম্ভাবনা তৈরি করছিলো।

অরণ্য ঘড়ির দিকে তাকালো। ঠিক সেই মুহূর্তে স্টেশন মাস্টার একটা বড় ঘণ্টা বাজিয়ে সংকেত দিলো। অরণ্য তার ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে উঠে দাঁড়ালো। হঠাৎ করেই তার নজর গেলো প্ল্যাটফর্মের উল্টো দিকের এক নম্বর গেটের দিকে।
সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো একটি মেয়ে। পড়নে অতি সাধারণ এক নীল রঙের সালোয়ার কামিজ, হাতে ছোট একটা ট্রাভেল ব্যাগ। মেয়েটির চোখে-মুখে এক ধরণের বিভ্রান্তি আর দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। ভিড়ের মধ্যে সে যেন পথ হারিয়ে ফেলেছিলো। অরণ্য এক মুহূর্ত না ভেবেই শান্ত পদক্ষেপে মেয়েটির দিকে হেঁটে গেলো।
“কোনো সাহায্য দরকার? আমি কি কোনো কাজে আসতে পারি?” অত্যন্ত ভদ্র আর মার্জিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো অরণ্য।
মেয়েটি হঠাৎ চমকে উঠে তাকালো। অরণ্যের শান্ত ও ভরসাদায়ক চোখ দেখে তার মনের ভিত অনেকটাই কেটে গেলো। মেয়েটি মৃদু কণ্ঠে বললো, “আসলে… আমি বিরামপুর স্টেশনে প্রথম এলাম। আমার ফুলবাড়ী যাওয়ার ট্রেনটা কতো নম্বরে আসবে বুঝতে পারছি না।”
অরণ্য মৃদু হাসলো। সেই হাসিতে এতোটাই উষ্ণতা ছিলো যে মেয়েটি নিমেষেই স্বস্তি পেলো।
“আপনি একদম সঠিক জায়গায় এসেছেন,” অরণ্য শান্ত স্বরে বললো, “ফুলবাড়ীর ট্রেনটি দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসবে। এখনো মিনিট পনেরো সময় আছে। আসুন, আপনাকে আমি প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দিচ্ছি।”
মেয়েটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অরণ্যের দিকে তাকিয়ে রইলো। ছেলেটির পরিপাটি পোশাক, কথাবার্তার মার্জিত ভঙ্গি আর সহযোগিতার মনোভাব তাকে মুগ্ধ করলো। মনে মনে ভাবলো, স্মার্ট যুবক বলতে বুঝি এমনই কাউকেই বোঝায়— যে শুধু দেখতে সুন্দর নয়, যার উপস্থিতি চারপাশের মানুষকে সুরক্ষিত আর স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করায়।
মেয়েটির নাম নীলা। ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে এক বিশেষ কাজে তার উত্তরবঙ্গে আসা। দু’জনে একসঙ্গে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে হেঁটে চললো।
স্টেশনের চায়ের দোকানের সামনে এসে অরণ্য থামলো। “ট্রেন আসার আগে এক কাপ গরম চা হলে কেমন হয়? বিরামপুর স্টেশনের মালই চা কিন্তু বেশ বিখ্যাত!”
নীলা কিছুটা দ্বিধা নিয়ে বললো, “কিন্তু চা যে…”
অরণ্য কথা শেষ করতে না দিয়ে হাসলো, “কোনো চিন্তা নেই, আমি নিয়ে আসছি।”
অরণ্য দু’কাপ চা নিয়ে এলো। প্লাটফর্মের একটা খালি বেঞ্চে তারা দু’জনে বসলো। চায়ে চুমুক দিতে দিতে কথা শুরু হলো।
নীলা জিজ্ঞেস করলো, “আপনি কি বিরামপুরেই থাকেন?”
“হ্যাঁ,” অরণ্য ল্যাপটপের ব্যাগে হাত বোলাতে বোলাতে বললো, “আমি এখানেই নিজের একটা ছোট আইটি ফার্ম শুরু করেছি। অনেকেই ভেবেছিলো গ্রাম বা মফস্বল থেকে এগুলো হবে না। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, মেধা আর স্মার্ট মানসিকতা থাকলে স্থান কোনো বাধা হতে পারে না। নিজের শিকড়কে ভুলে না গিয়েও বৈশ্বিক কাজ করা সম্ভব।”
অরণ্যের কথা বলার ভঙ্গি, তার দৃষ্টিভঙ্গি নীলার মনে গভীর দাগ কাটলো। একজন তরুণ কতোটা দূরদর্শী আর আত্মবিশ্বাসী হতে পারে, অরণ্যকে না দেখলে সে হয়তো বিশ্বাসই করতে পারতো না। নীলার মনে হলো, শুধু বাহ্যিক সাজগোজ বা ইংরেজি বলা স্মার্টনেস নয়; জীবনের সংকট কাটিয়ে উঠতে পারার যে ক্ষমতা, স্পষ্ট চিন্তা আর মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা— এটাই হলো প্রকৃত স্মার্টনেস।
কথা বলতে বলতে ট্রেনের হুইসেল শোনা গেলো। দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে ফুলবাড়ীগামী ট্রেন এসে লাগলো।
নীলা উঠে দাঁড়ালো। ব্যাগটি তুলতে গিয়ে কিছুটা কষ্ট পাচ্ছিলো। অরণ্য হাত বাড়িয়ে অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে নিলো।
“চলুন, আপনাকে ট্রেনে তুলে দিই।”
ট্রেনের দরজার সামনে এসে নীলা অরণ্যের দিকে তাকালো। তার চোখে ছিলো এক অদেখা অনুভূতির ছাপ। এত অল্প সময়ে অজানা এক স্টেশনে একজন অচেনা মানুষের এই সহমর্মিতা আর স্মার্ট উপস্থিতি তাকে পুরোপুরি দোলা দিয়ে গেলো।
নীলা মৃদু হেসে বললো, “ধন্যবাদ আপনাকে। আজ আপনি না থাকলে আমি হয়তো বেশ সংকটে পড়ে যেতাম।”
অরণ্য হালকা হেসে বললো, “অচেনা কাউকে সাহায্য করতে পেরে আমারও খুব ভালো লাগলো। পথচলায় সংকট তো আসবেই, তবে বুদ্ধিমত্তা আর মানবতা দিয়ে তা জয় করাই তো আসল কাজ।”
নীলা ট্রেনে উঠে জানালার পাশে বসলো। অরণ্য বাইরে দাঁড়িয়ে নীলার দিকে তাকিয়ে আবার সেই মুগ্ধ করা হাসি দিলো।
ট্রেন ছাড়ার আগে অরণ্য তার পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে নীলার হাতে দিলো। “যদি কখনো কোনো প্রয়োজনে বিরামপুরে আসতে হয় বা আমার কোনো সহযোগিতা লাগে, যোগাযোগ করতে পারেন।”
নীলা কার্ডটি হাতে নিয়ে দেখলো— সেখানে খুব সুন্দরভাবে নাম আর অরণ্যের স্টার্টআপ কোম্পানির ডিজিটাল বিবরণ লেখা। নীলার চোখের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।
ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলো। অরণ্য প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়লো। নীলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইলো। যতক্ষণ না ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে অনেক দূর চলে গেলো, নীলার চোখ দুটি অরণ্যের দিকেই আটকে ছিলো।
স্টেশন পার হয়ে ট্রেনটা যখন খোলা বাতাসের মধ্যদিয়ে ছুটে চললো, নীলা জানালার পাশে মাথা রেখে নিজের মনেই এক মিষ্টি রোমাঞ্চ অনুভব করতে লাগলো। বিরামপুর স্টেশনের সেই স্বল্প সময়ের স্মৃতি, প্ল্যাটফর্মের লালচে রোদ, আর একজন স্মার্ট যুবকের রুচিশীল ব্যক্তিত্ব তার হৃদয়ে এক অপূর্ব প্রেমের বীজ বুনে দিয়ে গেলো। নীলা কার্ডটি নিজের ডায়েরির ভেতরে যত্ন করে রেখে দিলো, আর মনে মনে ভাবলো— জীবনের এই পথচলায় তাদের আবার দেখা হবেই!
প্রকাশিত: রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.













