

মালিকুজ্জামান কাকা :
যশোরের চাঞ্চল্যকর বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন হত্যা বছর হতে চললো। এখনো রহস্য উন্মোচন হয়নি ১৬ আনা। মামলার তদন্ত শুরুর নয় মাস পেরিয়ে গেছে। এখনো আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেনি পুলিশ। এই সময়ে মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামিসহ সাতজন গ্রেপ্তার হয়েছে। গ্রেপ্তারের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাঁদের জবানবন্দিতে হত্যার পরিকল্পনা, অর্থ লেনদেন এবং হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।
তদন্তে এ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েকজন পলাতক থাকায় তদন্ত শেষ করতে সময় লাগছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, পলাতকদের গ্রেপ্তার করা গেলে হত্যার পুরো রহস্য উন্মোচন হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেনকে হত্যার জন্য ১৫ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। ঘটনার দিন হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে কথিত মূল শুটার ত্রিদিব চক্রবর্তী ওরফে মিশুককে এক লাখ টাকা ও একটি পিস্তল দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। বাকি চার লাখ টাকা হত্যাকাণ্ডের পর এবং অবশিষ্ট ১০ লাখ টাকা পরে পরিশোধের কথা ছিল।
আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এসব তথ্য প্রকাশ হয়েছে। তবে তদন্তাধীন বিষয় হওয়ায় এসব তথ্যের পূর্ণাঙ্গ সত্যতা পেতে কিছু সময় প্রয়োজন।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, আলমগীর হোসেনকে হত্যার পরিকল্পনায় ১০ থেকে ১২ জন অংশ নেয়। তাঁরা তিনটি মোটরসাইকেলে করে আলমগীরকে অনুসরণ করে। কেউ কেউ পথ রেকি করে।
চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি সন্ধ্যা ৬টার দিকে আলমগীর মোটরসাইকেল চালিয়ে শংকরপুর বটতলা হয়ে ইসহাক সড়কের দিকে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনটি মোটরসাইকেল তাঁকে অনুসরণ করতে থাকে। ইসহাক সড়কের এক দোকানের সামনে তিনি কিছু সময়ের জন্য থামলে হামলাকারীরা সেখানে অবস্থান নেয়।
পরে একটি মোটরসাইকেল সামনে চলে যায়। আলমগীর সাবেক কাউন্সিলর নয়নের অফিসের কাছাকাছি পৌঁছালে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে তাঁকে গুলি করে ত্রিদিব চক্রবর্তী ওরফে মিশুক।
গুলির পর হামলাকারীদের কয়েকজন দুটি মোটরসাইকেলে করে গোলপাতা মসজিদের দিকে পালিয়ে যায়। অন্য মোটরসাইকেলটি ঘুরিয়ে বটতলার দিকে চলে যায়।
আলমগীর হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী শামীমা খাতুন বাদি হয়ে যশোর কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। এজাহারে নিহতের মেয়ের স্বামী পরশ ও তাঁর বন্ধু সাগরকে আসামি করা হয়।
পরে তদন্তে হত্যাকাণ্ডে আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার সাত। আলমগীরের জামাতা পরশ, তাঁর সহযোগী সাগর, কথিত মূল শুটার ত্রিদিব চক্রবর্তী ওরফে মিশুক, শাহীন কাজী, মনিরুল ইসলাম, আলমগীরের ভাইপো রাকিব এবং অখিল ইসলাম প্রিন্স।
পুলিশের ভাষ্য, হত্যাকাণ্ডের পরপর পরশ ও সাগরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ত্রিদিবকে আটক করা হয়। ত্রিদিবের তথ্যের সূত্র ধরে রায়পাড়া তুলোতলা এলাকার শাহীন কাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। শাহীন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। তাঁর জবানবন্দিতে মনিরুল ইসলামের নাম উঠে আসে। পরে মনিরুলসহ আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাঁদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলমগীর হত্যার পরিকল্পনায় তাঁর সাবেক জামাতা পরশ সম্পৃক্ত। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্রসহ ১৭টি মামলা রয়েছে। আদালতে হাজির করা হলে সে আলমগীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দেয়। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সাতজনের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাঁদের জবানবন্দির বরাতে তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আলমগীর হত্যার পরিকল্পনায় তাঁর জামাতা পরশ সম্পৃক্ত। তদন্তে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি মোটরসাইকেল ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার মনিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে হত্যা ও অস্ত্রসহ ১৭টি মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আদালতে হাজির করা হলে তিনি আলমগীর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্য আসামিদের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপপরিদর্শক অলক কুমার দে জানান, ঘটনার পর তদন্তে বেশ কিছু নতুন নাম উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও কয়েকজন পলাতক।
তিনি আরো জানান, পলাতক আসামিরা ঘটনার পর এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা অব্যাহত। মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিলের প্রস্তুতি চলছে। এ
হত্যাকাণ্ডের নয় মাস পর অভিযোগপত্র দাখিল না হওয়ায় নিহত আলমগীর হোসেনের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে মামলার বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। তাঁদের দাবি, তদন্তে যাদের নাম এসেছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের সব তথ্য প্রকাশ করতে হবে।
আলমগীর হোসেন শংকরপুরের ইসহাক সড়কের ইন্তাজ আলী চৌধুরীর ছেলে। তিনি যশোর নগর বিএনপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি ‘গ্রিন প্রপার্টিজ’ প্রতিষ্ঠানের মালিক। প্রতিষ্ঠানটি জমি কেনাবেচা ও প্লট ব্যবসায় যুক্ত ছিল। তাকে হত্যার পর যশোরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। হত্যার নেপথ্যের কারণ নিয়ে নানা আলোচনা এখনো হচ্ছে।
প্রকাশিত: বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














