

হিরক খান, মেহেরপুর :
মেহেরপুরে দিনদিন বাড়ছে অ্যানথ্রাক্স আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। প্রথমে গবাদিপশু আক্রান্ত হচ্ছে, সেই আক্রান্ত পশুর মাংস খেয়ে কিংবা কাটাকাটির সময় সংস্পর্শে এসে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হচ্ছেন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। মেহেরপুরে এখন যেন আতঙ্কের আরেক নাম অ্যানথ্রাক্স। বছরের পর বছর রোগটির প্রাদুর্ভাব থাকলেও নেই নিয়মিত ভ্যাকসিনেশন ও পর্যাপ্ত জনসচেতনতা কার্যক্রম। ফলে প্রতি বছর বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। শরীরে দগদগে ক্ষত নিয়ে অনেকেই ভুগছেন দীর্ঘদিন।
২০০৭ সালে মেহেরপুর জেলায় প্রথম শনাক্ত হয় অ্যানথ্রাক্স রোগী। গাংনী উপজেলার কাজিপুর গ্রামে প্রথম অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলেও ধীরে ধীরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে রোগটি। এখন উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের নারী, পুরুষ এমনকি শিশুর শরীরেও দেখা মিলছে অ্যানথ্রাক্সের ক্ষত। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত প্রায় দুই দশকে গাংনী উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ৭ হাজার মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত এ রোগে মৃত্যুর ঘটনা না ঘটলেও অনেক রোগীকে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষত ও যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হয়েছে।

শরীরের বিভিন্ন স্থানে দগদগে ক্ষত। ক্ষত যত বড় হচ্ছে, বাড়ছে যন্ত্রণাও। চিকিৎসা নিয়েও পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না অনেকের। মেহেরপুরের গাংনীতে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত এসব মানুষ এখন আতঙ্ক আর অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
চলতি বছরের চিত্র আরও উদ্বেগের। গত চার মাসে অ্যানথ্রাক্স সন্দেহে ৫৫ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয় আইইডিসিআরে। এর মধ্যে ৪৫ জনের শরীরে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। আর চলতি বছরের নয় মাসে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬২ জনে। পাশাপাশি দুই শতাধিক গবাদিপশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
গাংনীর সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এছাড়া বাওট, কাজিপুর, মটমুড়া, সাহারবাটি ও বামন্দী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। রোগটি মূলত গবাদিপশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। আক্রান্ত গরু-ছাগল জবাই করে কম দামে মাংস বিক্রি করায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৯৯ জন। ২০১৪ সালে ২০৩, ২০১৫ সালে ১৫৪, ২০১৬ সালে ২৪০, ২০১৭ সালে ২৮১, ২০১৮ সালে ৪০৮, ২০১৯ সালে ৬৬০, ২০২০ সালে ৩৭৮, ২০২১ সালে ৪১৭, ২০২২ সালে ৬৪৪, ২০২৩ সালে ৭৯৩ এবং ২০২৪ সালে ৬৮৬ জন আক্রান্ত হন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত ছিলেন আরও ৬৩৭ জন। আর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪৬২ জন।
জেলার সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোতেই এ রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি। এছাড়া বাওট, কাজিপুর, মটমুড়া, সাহারবাটি ও বামন্দী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। রোগটি মূলত গবাদিপশু থেকে মানুষের শরীরে ছড়ায়। আক্রান্ত গরু-ছাগল জবাই করে কম দামে মাংস বিক্রি করায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভারত থেকে রাতের আঁধারে চোরাই পথে কম দামের মাংসের লোভে অনেকেই আক্রান্ত গরু ও ছাগলের মাংস কিনছেন। পশু জবাই, মাংস কাটা কিংবা রান্নার সময় যথাযথ সতর্কতা না থাকায় জীবাণুর সংস্পর্শে আসছেন মানুষ। এরপর শরীরে দেখা দিচ্ছে কালচে কিংবা দগদগে ক্ষত। প্রথমে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়ে অনেকেই সময় পার করছেন। পরে ক্ষত বড় হলে ছুটতে হচ্ছে বড় কোনো হাসপাতালে।
অ্যানথ্রাক্সের বিস্তার ঠেকাতে ইতোমধ্যে গাংনীতে কাজ শুরু করেছে জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান; আইইডিসিআরের একটি দল। সন্দেহভাজন রোগীদের নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হচ্ছে পরীক্ষার জন্য। পাশাপাশি কী ধরনের অ্যানথ্রাক্স তা নির্ণয় করে আক্রান্তদের চিকিৎসা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
আইইডিসিআরের টিমটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. আরিফ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন টেকনিশিয়ান আব্দুল গাফফারসহ আরও দুই সদস্য। গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা একরামুল হক বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিকভাবে মেহেরপুর জেলায় স্কিন অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। আমরা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছি।
গাংনী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আরিফুল ইসলাম বলেন, গাংনী দীর্ঘদিন ধরেই অ্যানথ্রাক্সপ্রবণ এলাকা। বিশেষ ব্যবস্থায় ভ্যাকসিনেশন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে ৩০ হাজার পশুকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন আবু সাঈদ জানিয়েছেন, অ্যানথ্রাক্সের ভয়াবহতা, সংক্রমণের ঝুঁকি এবং প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে জনগণকে সচেতন করতে উদ্যোগ নিয়েছে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে মাংস ক্রয়-বিক্রয়ের সময় অবশ্যই মানুষকে সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে মাংস কাটাকাটির সময় হাতে গ্লাভস ব্যবহার করা জরুরি।
প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














