কপাল পুড়তে পারে চাঁদপুরে অনেক চেয়ারম্যান প্রার্থীর

সজীব খান :

আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে চাঁদপুর সদর উপজেলার বিএনপির রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও হিসাব-নিকাশ। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতাদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে পদ ছাড়ার শর্ত সামনে এলে অনেকের নির্বাচনী স্বপ্নে ভাটা পড়তে পারে। এ নিয়ে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের মধ্যে যেমন কৌতূহল তৈরি হয়েছে, তেমনি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা আলোচনা।

গত বুধবার বিকেলে চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের মুনিরা ভবনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়। এ মতবিনিময়কে কেন্দ্র করে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, দলীয় শৃঙ্খলা, প্রার্থী বাছাই এবং স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা রয়েছে, ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে থেকে যারা চেয়ারম্যান প্রার্থী হতে চান, তাঁদের দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাংগঠনিক পদ ছাড়ার প্রয়োজন হতে পারে। এমন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দলীয় পদে থাকা অনেক নেতাকে চেয়ারম্যান হওয়ার স্বপ্ন ও সাংগঠনিক দায়িত্বের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে চাঁদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের তৎপরতা বেড়েছে। নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে অনেকেই ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার ব্যবহার করছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেও নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

এমন পরিস্থিতিতে দলীয় পদে থাকা নেতাদের প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করা হলে নির্বাচনী মাঠের হিসাব-নিকাশে পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা নেতাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দলীয় পদ ধরে রাখবেন, নাকি চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নেবে, এমন প্রশ্ন তাঁদের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় দলীয় পর্যায়ে সমন্বয় ও সিদ্ধান্ত গ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দলীয় পদে থাকা নেতাদের পাশাপাশি অন্য আগ্রহী প্রার্থীরাও নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ফলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় নীতিমালা, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার বিষয়গুলো আলোচনায় আসছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে। চাঁদপুর সদর উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়নেও দলীয় প্রভাব, সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নেতাদের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা রয়েছে।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ইউনিয়ন পর্যায়ে দলীয় দায়িত্বে থাকা নেতাদের কর্মকাণ্ড, জনসম্পৃক্ততা এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোনো নেতার বিরুদ্ধে অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার কিংবা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে তা নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে দলের ভাবমূর্তি রক্ষা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

এ অবস্থায় চাঁদপুর জেলা বিএনপির সভাপতি শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক স্থানীয় পর্যায়ের সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে সর্বশেষ পর্যন্ত ঘোষিতের বিষয়টি বহাল থাকা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের নজর সেদিকে থাকবে।

চাঁদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বিএনপি, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক বিরোধ নিষ্পত্তি, জমিজমা-সংক্রান্ত সালিশ এবং বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নেতাদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও রয়েছে। তবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকার বিষয়টি ও আলোচনা রয়েছে।

জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, জনসেবার অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়তে পারে। দলীয় পদ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি একজন সম্ভাব্য প্রার্থী জনগণের জন্য কতটা কাজ করেছেন, স্থানীয় সমস্যা সমাধানে তাঁর ভূমিকা কী এবং তিনি কতটা দায়িত্বশীল—এসব বিষয়ও বিবেচনায় আসা হতে পারে আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীদের বিষয়ে নির্বাচনের হিসেব নিকেশে।

ইউনিয়ন পরিষদ স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, রাস্তাঘাট সংস্কার, নাগরিক সেবা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা রয়েছে। তাই জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, সততা, জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহিকে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি স্থানীয় পর্যায়ে ক্লিন ইমেজের প্রার্থী বিষয়ে আলোচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হলে দলীয় বিরোধ কমানোর পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে দলীয় নীতিমালা, প্রযোজ্য নির্বাচনী বিধিবিধান এবং ভোটারদের স্বাধীন মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন রয়েছে।

চাঁদপুর সদর উপজেলার আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলীয় পদে থাকা নেতাদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের শর্ত নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা শেষ পর্যন্ত কোন দিকে যায়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এলে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নির্বাচনী পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে।

বিএনপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাঁদপুর সদর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মতে, এ পরিস্থিতিতে দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং প্রার্থী বাছাইয়ে সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ। তবে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা ও দলীয় সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলে বর্তমান আলোচনার পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে বলেও তাঁরা মনে করেন।

এদিকে আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে স্থানীয় মানুষের মধ্যে। ভোটাররা যেন নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী প্রার্থী নির্বাচন করতে পারেন এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, চাঁদপুর সদর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। দলীয় পদে থাকা নেতাদের চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত আসে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে দলীয় পদ ছাড়ার বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীর নির্বাচনী পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে। এ কারণে চাঁদপুর সদর উপজেলার রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে হাটবাজার ও চায়ের দোকানেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে।

প্রকাশিত:  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like