

মো. মজিবুর রহমান রনি:
বসন্তের শেষে গ্রীষ্মের প্রারম্ভে প্রকৃতি যখন নব পত্রপল্লবে পাখির কুজনে মুখরিত এমনি মূহুর্ত।পুব আকাশে রক্তিম আভা ছড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৃথিবী সূর্যের আলোয় আলোকিত হবে। এমনই পরিবেশে কৃষকের বাড়িতে ঢেঁকিতে ধান ছাঁটে গৃহিণীরা। পাখির কিচিরমিচির ডাকের সঙ্গে ঢেঁকির ধুপধাপ শব্দ ভেসে বেড়ায় কৃষকের আঙিনায়।

আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ঢেঁকি এখন আর আগের মতো চোখে পড়ে না। এক সময় ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি লুকিয়ে ছিল আমাদের গ্রামবাংলার প্রাচীন জনপদে। ভোরের আজানের পাশাপাশি স্তব্ধতা ভেঙে ঢেঁকির শব্দ ছড়িয়ে পড়ত গাঁও গ্রামের চারদিকে।গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যে সেই ঢেঁকি এখন আর চোখে পড়েনা ।আধুনিকতার ছোঁয়ায় যান্ত্রিকতার ঢেউয়ে তলিয়ে গেছে গ্রাম বাংলার এতিহ্যের ঢেঁকি ।
প্রাচীন কাল থেকে এই উপমহাদেশে ঢেঁকি ব্যবহার হয়ে আসছে। তখন বাংলার ঘরে ঘরে চিড়া কোটা, চাল ও চালের গুড়া করার জন্য ঢেঁকিই ছিল একমাত্র মাধ্যম। বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যর ধারক ঢেঁকি গৃহস্থের স্বচ্ছলতা ও সুখ সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে প্রচলিত ছিল।
বাংলাদেশের শহর থেকে শুরু করে গ্রামে গঞ্জেও এখন পুরোপুরি যান্ত্রিক ঢেউ লেগেছে। ফলে দিন দিন একেবারেই হারিয়ে গেছে বল্লিই চলে গ্রামীণ ঐতিহ্যের এ যন্ত্রটি (ঢেঁকি)। মাছে ভাতে বাঙালির ঘরে এক সময় নবান্নের উৎসব হতো ঘটা করে।উৎসবের প্রতিপাদ্যটাই ছিল মাটির গন্ধ মাখা ধান। ছিল ঢেঁকিতে ছাঁটা ধানের চালের ভাত আর সুস্বাদু পিঠার আয়োজন। রাতের পর রাত জেগে শরীরটাকে ঘামে ভিজিয়ে ঢেঁকিতে ধান ভানার পর প্রাণখোলা হাসি হাসত গাঁয়ের বধূরা।
গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই যন্ত্রটির সাথে কতো গল্প-কাহিনি যে জড়িয়ে আছে তা বলে শেষ করা যাবে না। গাঁয়ের বধুরা রাত জেগে ধান ভানার সময় কতো আনন্দ, হাসি-ঠাট্টায় যে মেতে উঠত তারও কোন হিসেব নেই। ঢেঁকিতে ধান ভানতে গিয়ে তারা বিভিন্ন ধরনের হাসি-তামাশার কথা বলতো আর মনের সুখ-দুঃখের গান গাইতো। গ্রামের মেয়েরাও পালাক্রমে ঢেঁকিতে ধান থেকে চাল তৈরির সময় নানা গীত পরিবেশন করত।
ঢেঁকির ঢেঁকুর ঢুঁকুর মিষ্টি মধুর শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মনের সুখে গান শুনতে শুনতে বৃদ্ধাদেরও চলতো পান খাওয়ার আড্ডা। আজকাল যা কেবলই স্মৃতি। কালের বিবর্তণে আর যান্ত্রিক সভ্যতার আগ্রাসনে গ্রাম বাংলার সেই ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে।
৭০ এর দশকের পর ইঞ্জিন চালিত ধান ভাঙা কল আমদানির পর গ্রাম অঞ্চল থেকে ঢেঁকি বিলীন হওয়া শুরু হয়েছে। ক্রমান্বয়ে ঐতিহ্য বাহী ঢেঁকি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে গ্রামের মানুষ ভুলে গেছেন ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের স্বাদ। যান্ত্রিক সভ্যতা গ্রাস করেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঢেঁকি শিল্পকে। ডিজিটাল যুগের আগামী প্রজন্ম ঢেঁকি কি তা চেনে না বললেই চলে। সব এলাকাতেই বর্তমান আধুনিক যুগে ঢেঁকির পরিবর্তে ধান ছাঁটাইসহ চালের গুঁড়া তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎচালিত মেশিনে। আর বিদ্যুৎচালিত মেশিনে ধান ছাঁটাই করার পর ওই চালগুলোতে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ইউরিয়া সার দিয়ে পালিশ করে তা চকচকে করে বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ রয়েছে জনমুখে। বাঙালির প্রধান খাদ্যবস্তু এই চালের সাথে রাসায়নিক মেশানোটা যে প্রযুক্তির আশির্বাদেই হচ্ছে তা বলা ঠিক হবে না। মুনাফালোভী এই কাজটা হচ্ছে আমাদের নৈতিক অধঃপতনের কারণে।
বাঙালি জীবনাচারণের আরেকটি বড় অংশ ছিল নবান্ন উৎসব। গ্রামে এক সময় নতুন ধান ওঠাকে কেন্দ্র করে নবান্ন উৎসব হতো। সেই উৎসবে পরিবারের শিশু-কিশোররা কত না আমোদ-আহ্লাদে নাচতো আর গাইতো। বাঙালি জীবনের এই উৎসবটার সাথেও ছিল ঢেঁকির সম্পর্ক। ঢেঁকিতে ছাঁটা চালের আটা হতে তৈরি হত নানা উপাদেয় বাহারী সাজের রকমারি পিঠা। বাড়ি বাড়ি পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। প্রবাদে আছে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। এক সময় ঢেঁকির সুরেলা শব্দ ফুটিয়ে তুলত নবান্ন উৎসব।
এখন গ্রামে গেলে কারও কারও বাড়িতেই ঢেঁকি দেখা যায়। বর্তমানে সেগুলো অধিকাংশই অব্যবহৃত অবস্থায় গরুর গোয়ালঘরে কিংবা পরিত্যক্ত কোনো ঘরে পড়ে আছে। ঢেঁকির আওয়াজের সঙ্গে মহিলাদের চুড়ি আর নূপুরের সমন্বয়ে এর শব্দ এখন আর নেই। বর্তমানে এই ঢেঁকির গল্প শোনা যাবে শুধু নানি-দাদিদের মুখে মুখে। এ ছাড়া এখন শোনা যায় যন্ত্রচালিত রাইস মিলের শব্দ। হয়তো বিভিন্ন জাদুঘরে গিয়ে দেখা যাবে এই ঢেঁকি। আধুনিক সভ্যতার বিকাশে সব কিছু বদলে যাচ্ছে। এক সময় সভ্যতার প্রয়োজনে ঢেঁকির আর্বিভাব ঘটেছিল। আর এখন গতিময় সভ্যতায় যাত্রা পথে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষেই তা বিলুপ্ত হতে চলছে। আবহমান বাঙালির হাজার বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্য ঢেঁকি শিল্প। ইতিহাসের সেই ঐতিহ্য শুধু স্মৃতির পাতায় অম্লান হয়ে থাকবে চিরদিন-চিরকাল।
আরো পড়ুন : শ্বেতীর সাদা দাগ দূর করার উপায়
আরো পড়ুন : মেহ প্রমেহ ও প্রস্রাবে ক্ষয় রোগের কার্যকরী সমাধানসমূহ
আরো পড়ুন : পাইলস রোগে করণীয়
আরো পড়ুন : জেনে নিন দীর্ঘক্ষণ মিলনের ঔষধ







