অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার: সড়কে নিরাপত্তার বদলে বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি

সম্পাদকীয় :
গত ৪ নভেম্বর প্রিয় সময়ে ‘ চাঁদপুরে বিভিন্ন শাখা সড়কে অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, সড়কে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্পিড ব্রেকার বা গতিরোধক স্থাপন করা হয়। কিন্তু সেই স্পিড ব্রেকারই যদি অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করা হয়, তাহলে তা নিরাপত্তার পরিবর্তে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। চাঁদপুরের বিভিন্ন আঞ্চলিক মহাসড়ক থেকে ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় প্রবেশ করা শাখা সড়কগুলোতে অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার স্থাপনের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক।

চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহমাহমুদপুর ইউনিয়নের ঘোষেরহাট কলেজ সড়কের পাটওয়ারী বাড়ির সামনে পরপর দুটি স্পিড ব্রেকার স্থাপন এবং কুমারডুগী মাজার সড়কে একই ধরনের গতিরোধকের উপস্থিতি এ সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্পিড ব্রেকার নির্মাণের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রয়োজনীয় কারিগরি নির্দেশনা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অনুসরণ করা হয়নি। ফলে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে এবং বাড়ছে দুর্ঘটনার আশঙ্কা।

প্রশ্ন হচ্ছে, সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? কোনো এলাকার মানুষের মধ্যে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি নিয়ে উদ্বেগ থাকতেই পারে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, মসজিদ, জনবসতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার সামনে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু জননিরাপত্তার অজুহাতে যে কেউ নিজের ইচ্ছামতো সড়কে স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করতে পারেন না। কারণ, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের মতোই গতিরোধক স্থাপনের বিষয়টিও একটি কারিগরি ও প্রশাসনিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।

অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার শুধু যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে না, বরং মোটরসাইকেল, অটোরিকশা, সিএনজিচালিত যানবাহন, অ্যাম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে রাতে, বৃষ্টির সময় কিংবা অপরিচিত সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সতর্কতামূলক চিহ্নবিহীন স্পিড ব্রেকার ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। হঠাৎ গতিরোধকের মুখে পড়ে চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে যানবাহন উল্টে যাওয়া কিংবা পেছন থেকে অন্য যানবাহনের ধাক্কা দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। জরুরি রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সের চলাচলেও সৃষ্টি হতে পারে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব। এ ক্ষেত্রে চাঁদপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মদ রাহাত আমিন পাটওয়ারীর বক্তব্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানিয়েছেন, সড়কে স্থাপিত এসব স্পিড ব্রেকার সম্পূর্ণ অবৈধ। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়রা জোর করে কিংবা নিজেদের উদ্যোগে সড়ক মেরামতের পর এসব গতিরোধক নির্মাণ করেন। তাঁর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, জনসচেতনতার অভাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ তদারকির ঘাটতি—দুটিই সমস্যাটিকে বাড়িয়ে তুলছে।

আমরা মনে করি, এ সমস্যা সমাধানে প্রথমেই প্রয়োজন সড়কগুলোর সার্বিক পরিদর্শন ও জরিপ। কোথায় স্পিড ব্রেকার প্রয়োজন, কোথায় তা অপ্রয়োজনীয় এবং কোথায় বিদ্যমান গতিরোধক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তা প্রকৌশলগতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। যেসব স্থানে স্পিড ব্রেকার স্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে নির্ধারিত নকশা, উচ্চতা, প্রস্থ ও দৃশ্যমান সতর্কতামূলক চিহ্ন অনুসরণ করে তা নির্মাণ করতে হবে। অন্যদিকে, যেসব স্থানে অনুমোদনহীন ও অপরিকল্পিত স্পিড ব্রেকার রয়েছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে অপসারণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি।

স্থানীয় জনগণকে বুঝতে হবে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে যত্রতত্র গতিরোধক নির্মাণ করা নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচারও বাড়াতে হবে। সড়ক মানুষের চলাচলের জন্য, প্রতিবন্ধকতা তৈরির জন্য নয়। তাই নিরাপত্তার নামে অপরিকল্পিতভাবে সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। চাঁদপুরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারণ, একটি সড়ককে নিরাপদ করতে গিয়ে যেন সেটিই নতুন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। মানুষের নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাই হোক সড়ক ব্যবস্থাপনার মূল লক্ষ্য।

প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy