এক মহৎ জীবনের পুনরালোকে: ইয়াছিন আলী প্রামাণিক (রহ.)

দুই বছর আগে এই সময়ে আমরা হারিয়েছিলাম এক আলোকিত মানুষকে— একজন নরম হৃদয়ের নেতা, নীতিতে অবিচল জনদরদী, সমাজের প্রতি নিবেদিত এক সৎ চরিত্রবান মানুষ— মোঃ ইয়াছিন আলী প্রামাণিক (রহ.)।

মানুষের ভিড়ে মানুষ তো অনেক, কিন্তু সকলের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে খুব কমজন। তিনি ছিলেন সেই অল্প কয়েকজনের একজন— যার কণ্ঠে ছিল ভদ্রতা, আচরণে ছিল নম্রতা, আর হৃদয়ে ছিল সবার জন্য অসীম ভালোবাসা। শৈশবে পাওয়া নৈতিকতা, পরিবারে পাওয়া ঈমানের শিক্ষা, এবং জীবনের প্রতিটি ধাপে সত্যের পাশে দাঁড়াবার দৃঢ়তা তাঁকে পরিণত করেছিল এক নীতির বাতিঘরে— যার আলো আজও আমাদের পথ দেখায়। রাজনীতি, সমাজসেবা, দ্বীনি দায়িত্ব কিংবা পারিবারিক আস্থা— যেখানেই তাকান, তিনি ছিলেন আস্থার প্রতীক, স্বচ্ছতার প্রতিমূর্তি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক অটল সাহসী কণ্ঠস্বর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লড়াই করেছেন মানুষের জন্য, মূল্যবোধের জন্য, ন্যায় ও সচ্চরিত্রের জন্য। মিথ্যা মামলা, হয়রানি, নির্যাতন—কিছুই তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি; কারণ তাঁর হৃদয়ে ছিল এই বিশ্বাস— “সত্যের পথে দাঁড়ালে ভয় বলে কিছু থাকে না।” ২১ নভেম্বর ২০২৩— এই দিনটি আমাদের বুকের ভেতর এক শূন্যতা রেখে গেছে। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, শিক্ষা ও আলো— আজও আমাদের ভিতর বেঁচে আছে, আমাদের পথ দেখায়, আমাদের সঠিক পথে চলতে শিখায়। এই স্মরণিকার মাধ্যমে আমরা শুধু তাঁকে স্মরণ করি না— আমরা স্মরণ করি তাঁর সততা, তাঁর ত্যাগ, তাঁর মানবিকতা, তাঁর ঈমানী দৃঢ়তা। আমরা স্মরণ করি সেই মানুষটিকে, যিনি ছিলেন পরিবারের আশ্রয়, সমাজের অভিভাবক, এবং ন্যায় ও সত্যের পথে হাঁটা এক অনন্য পথিক।

বাংলার মাটি ও মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় বেড়ে ওঠা এক অনন্য ব্যক্তিত্ব— ইয়াছিন আলী প্রামাণিক (রহ.)। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়, নম্র আচরণ, প্রজ্ঞাময় নেতৃত্ব এবং অবিচল নীতিবোধের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। কাউকে আঘাত না করে, কাউকে ছোট না করে; বরং ভালোবাসা, সৌম্যতা ও শান্ত ভাষায় মানুষকে একতাবদ্ধ করাই ছিল তাঁর জীবনের মূল শক্তি।

শৈশব, জন্ম ও পরিবার

১৯৬৫ সালের ১ জানুয়ারি, নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চকহরিনারায়ন গ্রামের শান্ত-নির্মল ভোরে জন্ম নেন মোঃ ইয়াছিন আলী প্রামাণিক। গ্রামটির সরলতা, ধর্মীয় পরিবেশ ও মানবিক মূল্যবোধ যেন শৈশব থেকেই তাঁর মানসগঠনে এক অমলিন ছাপ ফেলে যায়।
তার পিতা মরহুম আব্দুল্লাহ প্রামাণিক ছিলেন আল্লাহভীরু, ন্যায়পরায়ণ, আত্মমর্যাদাশীল ও পরোপকারী একজন মানুষ। পিতার চরিত্রই ইয়াছিন আলী প্রামাণিকের জীবনে হয়ে ওঠে নৈতিকতার মশাল। পিতৃস্নেহে পাওয়া আদর্শ, সততা ও ঈমানের শিক্ষা তাঁকে জীবনের প্রতিটি পদে সৎ, সোজা-সাপ্টা ও আপসহীন ন্যায়ের পথে অটল রাখে।
পরিবার—যেখানে তিনি রেখে গেছেন তাঁর আদর্শের বীজ
তিনি রেখে গেছেন এক স্বপ্নময় পরিবার—
একটি পরিবার, যাদের ভেতর আজও বেঁচে আছে তাঁর শেখানো মূল্যবোধ, তাঁর নৈতিকতা, তাঁর দৃঢ় ঈমান।

পরিবারের প্রতি তাঁর অনাবিল ভালোবাসা ছিল অবিচল। দুই পুত্র ও তিন কন্যাসহ একটি পরিপূর্ণ পরিবার তিনি রেখে গেছেন, যারা আজ তাঁর আদর্শ ও স্বপ্নকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে।
প্রথম পুত্র
মোঃ শাহাদাত হোসেন প্রামাণিক—হাদিস বিভাগ থেকে কামিল সম্পন্ন করে আজ সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, পিতার সততা ও নৈতিকতার ধারক হিসেবে।
দ্বিতীয় পুত্র
ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান প্রামাণিক—ব্যাচেলর অব ইউনানী মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি (BUMS) সম্পন্ন করে এমপিএইচ ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন; তিনি পিতার মানবিকতা, প্রজ্ঞা ও জনসেবার অনুপ্রেরণা নিয়ে এগিয়ে চলা একজন চিকিৎসক-শিক্ষক।
তিন কন্যা
বড় কন্যা আছিয়া বেগম রোকন,
দ্বিতীয় কন্যা বিলকিস বানু রোকন,
এবং ছোট কন্যা সামসুন নাহার রোকন প্রার্থী—
তাদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে ফুটে ওঠে পিতার মূল্যবোধ, কোমলতা ও সুস্থ নৈতিক শিক্ষা।
তার সহধর্মিণী শহিদা বেগম—যিনি জীবনের প্রতিটি বাঁকে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন—তিনিও সন্তানদের নিয়ে এখনও ইসলামী আন্দোলনের সেবা ও দাওয়াতি কাজে নিবেদিত।
এই পরিবার আজও বহন করছে তাঁর স্বপ্ন, তাঁর আদর্শ, তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার।
মোঃ ইয়াছিন আলী প্রামাণিক ছিলেন শুধুই একজন জনপ্রতিনিধি নন—
তিনি ছিলেন নীতির বাতিঘর, পরিবারের ভরসাস্থল,
আর সমাজের জন্য আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক।
তার জীবন-আদর্শ আজও মানুষের হৃদয়ে উজ্জ্বল হয়ে আছে
ইসলামী আন্দোলনের প্রতি তাঁর অটল অঙ্গীকার— জাতির জন্য অনুপ্রেরণার বাতিঘর

সব ব্যস্ততা, দায়িত্ব ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা চাহিদার ঊর্ধ্বে তিনি ইসলামী আন্দোলনের কাজকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতেন।
পরিবার, সামাজিক নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দায়িত্ব— কোথাও কোন কমতি রাখেননি; তবুও ইসলামী দাওয়াহ, সংগঠন ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ নিবেদিতপ্রাণ।

দীনের কাজে তাঁর এ আন্তরিকতা ছিল নিঃস্বার্থ, ছিল শুদ্ধ উদ্দেশ্যের পরিচয়।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“যে জাতি আল্লাহর দীনকে প্রতিষ্ঠা করে, আল্লাহ সেই জাতিকে সম্মান ও শক্তি দান করেন।”

প্রতিটি কর্মীকে তিনি শিখিয়েছেন—
ইখলাস, ত্যাগ, দায়িত্ববোধ, এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই একটি ইসলামী আন্দোলনের প্রকৃত চালিকাশক্তি।

তাঁর জীবন ছিল এমন এক বাস্তব উদাহরণ—
যেখানে দেখা যায় কিভাবে একজন মানুষ সংসার, সমাজ, রাজনীতি, নেতৃত্ব এবং দাওয়াহ—
সবকিছুর মাঝে ভারসাম্য রেখে
ইসলামী আন্দোলনকে নিজের জীবনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করতে পারেন।

এই দৃঢ়তা, ত্যাগ ও নিবেদন—
আজও দেশ ও জাতির জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল বাতিঘর হয়ে আছে।

মানুষের নেতা— সকল দলের শ্রদ্ধাভাজন

রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও সকল মানুষের জানাজায় অংশ নেওয়া, অনুরোধে ইমামতি করা—
ছিল তাঁর চরিত্রের উজ্জ্বল নিদর্শন।
সকল দলের মানুষই তাঁকে সম্মান করত, কারণ তাঁর ভাষা ছিল ভদ্রতার, আচরণ ছিল মানবিকতার, আর হৃদয় ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।

জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান ও নেতৃত্ব

তিনি ১৯৮৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে রোকন হিসেবে শপথগ্রহণ করেন।
ধীরে ধীরে মান্দা উপজেলার নায়েবে আমীর, মান্দা থানা দক্ষিণ থানা আমির, জেলা কর্মপরিষদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠা ও দক্ষতার সঙ্গে।
সৌম্য নেতৃত্ব, বিচক্ষণতা ও সংগঠনপ্রেম তাঁকে ইসলামী আন্দোলনের এক নির্ভরযোগ্য স্তম্ভে পরিণত করে।

ইসলামী চেতনার আলোকবর্তিকা

তিনি ছিলেন গবেষণামুখী আলেমে দ্বীন, ছিলেন অসংখ্য তরুণ ও আলেমদের রূহানি শিক্ষক।
ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষা, দ্বীনের চিন্তা প্রসার ও চরিত্রগঠনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন এক প্রজ্ঞাবান পথপ্রদর্শক।

জাতীয় আন্দোলনের অবিচল সৈনিক

স্বৈরাচারী আইয়ুববিরোধী আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা-উত্তর প্রতিটি গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তিনি ছিলেন দৃঢ় ও সাহসী।
৮২–৯০ সালের স্বৈরশাসন বিরোধী আন্দোলনে তাঁর অংশগ্রহণ আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে

জঙ্গিবাদ দমনে দৃঢ় অবস্থান

ইসলামের নাম ব্যবহার করে যেসব গোষ্ঠী সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিল—
তাদের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন অকুতোভয়।
তাঁর নেতৃত্বে শীর্ষ জঙ্গিদের গ্রেপ্তার ও বিচার প্রমাণ করে—
তিনি শান্তি, ন্যায় ও মানবতার রাজনীতির একজন নির্ভীক যোদ্ধা।

২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ও রাজনৈতিক হয়রানি

২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে তিনি জনগণের বিপুল সমর্থনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
মানুষের প্রতি আন্তরিকতা, উন্নয়নমুখী পরিকল্পনা ও জনসেবার মনোভাব তাঁকে অতুলনীয় জনপ্রিয়তা এনে দেয়। কিন্তু সেই সময়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর জনপ্রিয়তাকে ঠেকাতে একের পর এক মিথ্যা মামলা, হামলা ও হয়রানির আশ্রয় নেয়। বানোয়াট অভিযোগে তাঁকে কারাবরণ করতে হয়—
তবুও তিনি অবিচল ছিলেন সত্য, নীতি ও ধৈর্যের পথে।

মিথ্যা মামলা, রিমান্ড ও মানসিক নির্যাতন— কিন্তু অটল মনোবল

চেয়ারম্যান ইয়াছিন আলী প্রামানিকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে এলাকাবাসী স্মরণ করছেন—
তিনি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে নানা মিথ্যা অভিযোগ, হয়রানিমূলক মামলা ও রাজনৈতিক নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন। তবুও তিনি ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন, আপসহীন সততা ও ঈমানের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। সত্য ও ন্যায়ের জন্য তিনি আজীবন সংগ্রাম করেছেন এবং সেই পথেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন এর আগে ২০২২ সালে ও ২০১০ সালের ২৯ জুন তাঁর বিরুদ্ধে আনা হয় বানোয়াট ও হয়রানিমূলক অভিযোগ। রিমান্ডে নেওয়া হয়, মানসিক চাপ সৃষ্টি করা হয়—

কিন্তু কোনো যুদ্ধই তাঁর মনোবল ভাঙতে পারেনি।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
“সত্যের পথে যে হাঁটে, তাকে ভয় ও নির্যাতন দমাতে পারে না।”

 

দুনিয়া থেকে বিদায়— ২১ নভেম্বর ২০২৩

জীবনের প্রতিটি দিন মানুষ, ধর্ম, ন্যায় ও আদর্শের জন্য উৎসর্গ করে
২১ নভেম্বর ২০২৩, বেলা ১১টা
তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর মৃত্যু সমাজ, রাজনীতি এবং নৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্র তৈরি করেছে গভীর শূন্যতা।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলো, আদর্শ ও শিক্ষামূলক জীবন আজও অগণিত মানুষের অন্তরে জ্বলজ্বল করছে।

এক মহৎ জীবনের শেষ পাঠ

ইয়াছিন আলী প্রামাণিক (রহ.) ছিলেন মানুষের আশ্রয়, তরুণদের প্রেরণা, আলেমদের শ্রদ্ধাভাজন এবং রাজনীতির সততা ও ন্যায়ের প্রতীক।
নম্রতা ছিল তাঁর পোশাক, নীতিনিষ্ঠতা ছিল তাঁর অলংকার, আর মানুষের কল্যাণ ছিল তাঁর আজীবনের লক্ষ্য।

দোয়া ও শ্রদ্ধা
হে আল্লাহ,
তাঁর গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন,
তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন,
আর তাঁর অনুসৃত সত্য, নীতিবোধ ও মানবিকতার পথে আমাদের চলার তাওফিক দিন।
আমিন।

লেখকঃ ডাঃ সিদ্দিকুর রহমান প্রামাণিক
বিইউএমএস, এম পি এইচ, এইচ ইউ বি
প্রতিষ্ঠাতা, মাডার্ণ শেফা ক্লিনিকি
প্রভাষক, চাঁদপুর ইউনানী তিব্বীয়া কলেজ

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর ২০২৫

 

You might like

About the Author: priyoshomoy