

আনিসুল হক সুমন, দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধিঃ
হাটি হাটি পা পা করে যে মুনিরা তাহের দুর্গাপুর জামিউল উলূম কাচারি মাদরাসায় পড়াশোনা করতো, পরবর্তি সময়ে দুর্গাপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল নিয়ে এসএসসি পাশ করেছে, আজ সেই মুনিরা তাহের, মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম বাংলাদেশী নারী হিসেবে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে তিনি তার গবেষণাকর্মের জন্য সর্বোচ্চ ফলাফল ‘মুমতাজ’ গ্রেডে উত্তীর্ণ হয়েছেন।
এগর্ব শুধু মিশরের ঐতিহ্যবাহী ও বিশ্বখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, এ গর্ব পুরো বাংলাদেশের। এগর্ব পুরো নেত্রকোনা তথা দুর্গাপুরবাসীর।
আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক সায়েন্স ফর ফরেইনার স্টুডেন্টস-এর অধীনে ইমাম আহমদ আত-তাইয়্যিব মিলনায়তনে, সোমবার (৫ অক্টোবর) তার এমফিল থিসিস ডিসকাশন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারগণ তাকে সর্বোচ্চ ফলাফল ‘মুমতাজ’ গ্রেডে উত্তীর্ণ ঘোষণা করেন।
মুনিরা তাহের আবু তাহেরের গবেষণার বিষয় তাফসির ও উলুমুল কুরআন। তার গবেষণাপত্রের শিরোনাম ‘হুরূফুল মাআনি এবং পবিত্র কুরআনের দ্বিতীয়ার্ধের তাফসিরে এর প্রভাব সংকলন ও পর্যালোচনা।’
মুনিরা তাহের নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার এক শিক্ষানুরাগী পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। ওনার বাবা মাওলানা মোহাম্মদ আবু তাহের দুর্গাপুর জামিউল উলূম কাচারি মাদরাসা ও ফাতিমা (রা.) মহিলা মাদরাসাসহ বহু দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠাতা করেছেন।
দুর্গাপুর জামিউল উলূম কাচারি মাদরাসায় হিফজুল কুরআন সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে মুনিরার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তিতে দুর্গাপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। উচ্চতর ইসলামী শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে ২০১০ সালে মিশরে এসে মাআহাদ দিরাসা আল-খাসসাহর মাধ্যমে আল-আজহারে তার একাডেমিক পথচলা শুরু হয়।
পরবর্তিতে ২০১৮ সালে অনার্স, ২০২১ সালে দশ কিরাআত এবং ২০২২ সালে মাস্টার্স (তামহিদি) সম্পন্ন করেন মুনিরা তাহের। ২০২৩ সালে এমফিল গবেষণার জন্য থিসিস নিবন্ধন করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও অধ্যবসায়ের পর ২০২৬ সালে তার গবেষণাকর্ম সম্পন্ন হয়। পরবর্তিতে আল-আজহারে অধ্যয়ন ও গবেষণার পাশাপাশি মুনিরা তাহের আবু তাহের মিশরের জামিয়া সুফারা আল-হিদায়া-তে কুরআন শিক্ষিক হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
একজন বাংলাদেশি নারী গবেষকের সর্বোচ্চ ফলাফলে এমফিল ডিগ্রি অর্জনকে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও গবেষক সমাজের জন্য গৌরবজনক অর্জন হিসেবে দেখছেন মিশরের আল-আজহারের মতো বিশ্বখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তার এই সাফল্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারী শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় আরও উৎসাহিত করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে মুনিরা তাহেরের এই কৃতিত্বে তাকে অভিনন্দন ও ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়েছে আযহার ওয়েলফেয়ার সোসাইটি বাংলাদেশ, মিশর। তার পক্ষ থেকে মুনিরার ছেলে মুহাম্মাদ হুজাইফা সংগঠনটির সভাপতি আবদুর রহমান মুহাম্মাদ নওয়াব ও সদস্য প্রতিনিধি আবু আদনান মহিবুর রহমানের কাছ থেকে সম্মাননা গ্রহণ করেন এবং পরে ওই উপহার তার মায়ের হাতে তুলে দেন।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে মুনিরা তাহের আবু তাহেরের এ অর্জনে আনন্দ ও গর্ব প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তার ইলম, গবেষণা ও কর্মজীবনে আরও বরকত এবং জ্ঞান ও গবেষণার মাধ্যমে দ্বীন, দেশ ও মানবতার কল্যাণে আরও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করা হয়েছে।
এ নিয়ে মুনিরা তাহেরের বড় ভাই, দুর্গাপুর জামিউল উলূম কাচারি মাদরাসার মোহতামিম মাওলানা ওয়ালী উল্লাহ্ বলেন, আল-আজহারের হাজার বছরের ইতিহাসে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এমফিল ডিগ্রি অর্জনের এই মাইলফলক স্পর্শ করেছে মুনিরা তাহের। বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে অনেক প্রতিভাবান শিক্ষার্থী রয়েছে বিধায় প্রায় প্রতিবছরই হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা প্রথম স্থান অর্জন করে।
তিনি আলো বলেন, আমি মনেকরি বাংলাদেশের মাদরাসা গুলো থেকে আলেমা গবেষক তৈরি হওয়া এখনো সম্ভব, এটা মুনিরা তাহের তা প্রমান করে দেখিয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন শুধু একটু সাহস, পরিবারের সার্বিক সহায়তা ও সঠিক দিকনির্দেশনা। মুনিরা তাহের সেটাই প্রমাণ করেছেন। দেশবাসীর কাছে আমার আকুল আবেদন, মুনিরার জন্য দোয়া করবেন, সে যেনো তার কর্মজীবনে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনতে পারে। মুনিরা শুধু দুর্গাপুরের মেয়ে নয়, সে সারা বাংলাদেশের মেয়ে।
মুনিরা তাহেরের এই সাফল্যে অভিনন্দন জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোনা – ১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, দুর্গাপুর জামিউল উলূম কাচারি মাদরাসা পরিবার, দুর্গাপুর প্রেসক্লাব পরিবার, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় সুধীমহলগণ।
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

শেয়ার করুন
–
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.














