

মো. মজিবুর রহমান রনি:
’গোয়াল ভরা গরু গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ ’ গ্রামে প্রচলিত প্রবাদটি এখনও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষে মুখে মুখে শোনা যায় ।কিন্তু গ্রামের পর গ্রাম ঘুরেও খুঁজে পাওয়া যায়না কৃষকের উৎপাদিত ফসল সংরক্ষনের বাঁশের তৈরী ডোল-গোলা ।

যুগের হাওয়া পাল্টেছে, পাল্টেছে সারা বছরের জন্য কৃষকের ধান সংরক্ষনের পদ্ধতিও । দু’চার জন বড় গৃহস্থ ছাড়া ছোটো-খাটো প্রান্তিক কৃষক এখন আর সেভাবে ধান মজুদ রাখতে পারেননা । খাওয়া আর সাংসারিক খরচ মিটিয়ে যে সামান্য ধান থাকে তা কেউ বস্তায় কেউবা প্লাষ্টিকের তৈরী পাত্রে সংরক্ষন করেন।
ফলে এক সময়কার কৃষকদের অতিপ্রয়োজনীয় ধানের ডোল বা মাচা এখন চোখেই পড়ে না। অথচ এক সময় গোলা ভর্তি ধান না থাকলে গ্রামের গৃহস্থ পরিবার সেই বাড়িতে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে পর্যন্ত দিতে আগ্রহী হতেন না। এ কথা এখনো গ্রামাঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে। যাতে ধান নষ্ট না হয় সে কারণে গোলায় ধান রেখে মুখ মাটি দিয়ে লেপে বন্ধ করে রাখা হয়। আবার টাকার প্রয়োজন হলে গোলা থেকে ধান বের করে বাজার বা পাইকারের কাছে বিক্রি করা হয়। তখন চোর-ডাকাতের ভয়ে গোলার ধানের ভেতর স্বর্ণ ও টাকা লুকিয়ে রাখাত কৃষক । বাঁশের তৈরি ডোল- গোলার ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। গ্রাম এলাকায় বেশিরভাগ স্থাপনা পাকা ও টিনের গড়ে উঠায় বাঁশের চাহিদাও কমছে। এ কারণে বাঁশের আবাদ কমে যাওয়ায় এবং বাঁশের মূল্যবৃদ্ধির কারণে গোলা তৈরিতেও খরচ বেড়ে যাওয়ায় ফসল সংরক্ষনে কৃষকের এখন ভরসা প্লাষ্টিকের তৈরী বড় পাত্র ।
আমন ও বোরো দুই মৌসুমে ডোল তৈরির ভরা মৌসুম। ডোল তৈরি মানেই কারিগরদের মধ্যে উৎসব মুখর পরিবেশ। চাঁদপুর জেলার বাবুহাট বাজার হল ডোল তথা বাঁশের তৈরী জিনিসপত্রের বড় বাজার ।সপ্তাহে একদিন এই বাজারে অনেক বড় হাট বসে আর জেলার গ্রাম অঞ্চল থেকে লোকজন এসে এই বাজার থেকে সংগ্রহ করে থাকে বাঁশের তৈরী ডোল ।ঐ বাজারের ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ বলেন-আগে এবাজারে প্রতি সপ্তাহে অনেক ডোল বিক্রি হতো কিন্তু কালের আবর্তনে এর চাহিদা এখন আর নেই বল্লেই চলে ।যারা এই ডোল বানাতো তারা অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছে । আমন মৌসুমে দুই মাস এবং বোরো মৌসুমে এক মাস মিলে বছরে ৩ মাস ডোল তৈরি এবং বিক্রির মৌসুম চলতো কিন্তু এখন আর সেই মৌসুমও নেই ।
দেশে ধানের আবাদ কমে যাওয়ায় এবং প্লাষ্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ডোলের সেই কদর এখন নেই। পাহাড়ে বাঁশ ও বেতের অভাব রয়েছে।
একটি ডোল তৈরি করতে একদিন লাগে। পরিশ্রমের সাথে ডোল বিক্রির সামঞ্জস্য না থাকায় অনেক ডোল কারিগর তাদের পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাসহ বাঁশের গোলা ডোল দিয়ে ধান সংরক্ষণের ব্যাপারে চাষিদের উৎসাহিত করা হলে ডোলের কদর ফিরে আসবে বলে অনেকেই মনে করছেন।







