

সম্পাদকীয়
ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় খাল-বিল, নদী-নালা একসময় ছিলো মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কৃষি, মৎস্য ও পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থার মূল ভরসা ছিলো এসব জলাশয়। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের নামে আজ সরকারি খালগুলো ধ্বংসের মুখে। গাজীপুর-মদনপুর এশিয়ান হাইওয়ে (ঢাকা বাইপাস) নির্মাণকাজে ড্রেজার দিয়ে খাল ভরাট করার ঘটনা তার স্পষ্ট উদাহরণ। গতকাল প্রিয় সময়ে ‘শীতলক্ষ্যা থেকে বিচ্ছিন্ন খাল, পাউবোর নীরবতা! সরকারি খাল গিলে খাচ্ছে বাইপাস, পাউবো চুপ!’ শিরোনামে সংবাদটি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা সংবাদ মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে, খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, ফলে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। অথচ খাল দখল ও ভরাট রোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর নীরবতা প্রশ্ন তুলছে।

১৯৮১ সালে জাইকার সহায়তায় গড়ে ওঠা “নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী ইরিগেশন প্রজেক্ট” কৃষি জমির সেচ ও পানি নিষ্কাশনে যুগান্তকারী ভ‚মিকা রাখে। প্রকল্পের আওতায় একাধিক খাল খনন করা হয়েছিল, যা’ শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছিলো। কিন্তু দীর্ঘদিন খাল পুনঃখনন হয়নি, হয়নি রক্ষণাবেক্ষণও। বরং সরকারি খালের উপর গড়ে উঠেছে শিল্পকারখানা, বালুর গদি, দোকানপাট ও বসতবাড়ি। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো খাল দখল করার পাশাপাশি বর্জ্যও ফেলছে খালে। ফলে খাল শুধু দখলই হয়নি, হয়ে উঠেছে দূষণের আধার। এ অবস্থায় সামান্য বৃষ্টিতেই ওই এলাকায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। কৃষিজমি ডুবে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় শত শত পরিবার। শুধু কৃষি নয়, মানুষের জীবন-জীবিকাও বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে, কারণ খোলা মাঠে কারখানার বর্জ্য মিশে যাচ্ছে জমাট পানিতে। অথচ স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী বহুবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ পাননি।
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন মাঝে মধ্যে অভিযান চালালেও তা’ মূলত প্রদর্শনীর মতো। দখলদারদের উচ্ছেদ না করে খÐ খÐ খাল উদ্ধার করে চলে যায়। কিন্তু খাল যদি নদীর সঙ্গে সংযুক্ত না থাকে, তবে উদ্ধার কার্যক্রম অর্থহীন। এ দায় থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড কিংবা সড়ক ও জনপথ বিভাগ কেউই মুক্ত নয়। বিশেষত বাইপাস নির্মাণকাজে খাল ভরাটের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার চরম নিদর্শন। সরকার সম্প্রতি নদী রক্ষায় জোরালো পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু নদীর শাখা খালগুলো বাঁচানো ছাড়া নদী রক্ষাও টেকসই হবে না। খাল দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দখলকৃত খাল পুনরুদ্ধার ও খননের মাধ্যমে শীতলক্ষ্যা নদীর সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করা জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে স্বচ্ছ সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।
উন্নয়ন মানুষের জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়। একটি সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে যদি সরকারি খাল বিলুপ্ত হয়ে যায়, তবে তা’ উন্নয়ন নয়, আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। খাল রক্ষায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা না থাকলে এই জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি খালগুলোকে দখল ও দূষণমুক্ত করাই সময়ের দাবি।
সোমবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
শেয়ার করুন










