

ওয়্যারলেস সেট দেখিয়ে ভয়, মোবাইল রেখে যাত্রীবেশে ছিনতাই — রংপুরে বিক্রি হওয়া ইজিবাইকও উদ্ধার, চক্রের সবার বিরুদ্ধেই আগের মামলা
সজীব হাসান, বগুড়া প্রতিনিধি :
বগুড়ায় ডিবি পুলিশ, থানা পুলিশ ও সাংবাদিকের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে দিনদুপুরে ইজিবাইক-অটোরিকশা ছিনতাই করে আসছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ওয়াকিটকি সেট হাতে নিয়ে নিজেকে “সিভিল পুলিশ” দাবি করে চালককে ধমক দিয়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দিত চক্রটি। অবশেষে বগুড়া জেলা গোয়েন্দা শাখা-ডিবির বিশেষ অভিযানে সর্দারসহ চক্রের ৭ সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। উদ্ধার হয়েছে ছিনতাই হওয়া ৪টি ইজিবাইক, ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত ২টি ওয়াকিটকি, একটি প্রাইভেটকার এবং ৬টি মোবাইল ফোন।

যেভাবে ফাঁদে ফেলা হতো চালকদের
গত ২৫ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর। বগুড়া টিএমএসএস হাসপাতালের সামনে যাত্রী নামিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইজিবাইক চালক। এ সময় অজ্ঞাত এক যাত্রী তার গাড়িতে ওঠে। কিছুক্ষণ পর হাসপাতাল গেটে যাত্রীর “পরিচিত” আরেকজন আসে। দুজনে কয়েক মিনিট কথা বলার পর যাত্রীবেশী ব্যক্তি চালককে বলে, “তুমি ওর সাথে যাও, ওর মাইক্রোবাসে কাগজ আছে নিয়ে আসো। আমি গাড়িতে বসে আছি।”
চালক যেতে না চাইলে ওই ব্যক্তি নিজেকে বগুড়া সদর থানার “সিভিল পুলিশ” পরিচয় দিয়ে ধমক দেয়। হাতে ছিল ছোট ওয়্যারলেস সেট। বিশ্বাসযোগ্য করতে চালকের বাটন ফোনটিও জমা নেয় সে। সরল বিশ্বাসে চালক কাগজ আনতে গেলে ফিরে এসে দেখেন ইজিবাইকসহ “যাত্রী” হাওয়া।
ভুক্তভোগী চালক বিভিন্ন স্থানে খুঁজে না পেয়ে ৫ মে বগুড়া সদর থানায় লিখিত এজাহার করেন। পুলিশ মামলা নং-২৭, ধারা-১৭০/৩৭১ পেনাল কোড ১৮৬০-এ মামলা রেকর্ড করে।
ডিবির শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান: ভোর সাড়ে ৫টায় হোটেলে হানা
মামলার পরপরই বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, পিপিএম এর নির্দেশনায় সদর থানার পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা শাখা ছায়া তদন্তে নামে। ডিবির ওসির তত্ত্বাবধানে এসআই মোহাম্মদ ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি চৌকস টিম তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে চক্রটিকে শনাক্ত করে।
৫ মে ভোর সাড়ে ৫টায় বগুড়া শহরের চারমাথা এলাকার খাজা হোটেল-আবাসিকে আকস্মিক অভিযান চালায় ডিবি। ঘুম থেকে তুলে হাতকড়া পরানো হয় ঘটনার সাথে সরাসরি জড়িত ৫ জনকে:
1. মোঃ মামুন শিকদার (৪০) – সর্দার, মুন্সীগঞ্জ
2. মোঃ মিঠু পাটোয়ারী (৩০) – বরিশাল
3. মোঃ সুমন মিয়া (৩০) – গাইবান্ধা
4. মোঃ জাকির হোসেন (৪০) – পটুয়াখালী
5. মোঃ নিজাম (৪৬) – পটুয়াখালী
তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয় ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত ২টি ওয়াকিটকি সেট, ১টি চার্জার, অতিরিক্ত ব্যাটারি, ১টি প্রাইভেটকার চাবিসহ, ৬টি অটোর চাবি, ৫টি বাটন ফোন, ১টি স্মার্টফোন, ১টি হাতুড়ি ও ১টি কালো কসটেপ।
জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে এলো রংপুর কানেকশন
গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটি স্বীকার করে, বগুড়া থেকে ছিনতাই করা ৪টি অটোরিকশা-ইজিবাইক তারা রংপুর মেট্রোর হারাগাছ থানার বানুপাড়া এলাকায় বিক্রি করেছে। তথ্য পেয়ে ডিবির টিম ওইদিনই রংপুরে দ্বিতীয় দফা অভিযান চালায়।
বানুপাড়া থেকে গ্রেফতার করা হয় চোরাই গাড়ি ক্রেতা চক্রের ২ সদস্য:
6. মোঃ ওবায়দুল ইসলাম বেগ (৪০)
7. মোঃ জাহিদুল ইসলাম (৪২) – দুজনেরই বাড়ি বানুপাড়া, হারাগাছ, রংপুর
জাহিদুলের গ্যারেজ থেকে বাদীর ছিনতাই হওয়া ইজিবাইকসহ মোট ৪টি ভিন্ন মডেলের ছিনতাইকৃত অটোরিকশা-ইজিবাইক উদ্ধার করে জব্দ করে ডিবি।
*চক্রের সবার কপালেই পুরনো মামলার দাগ
সিডিএমএস পর্যালোচনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। গ্রেফতার ৭ জনের মধ্যে ৫ জনই পেশাদার অপরাধী:
আসামির নাম | আগের মামলা | জেলা |
মামুন শিকদার | ১টি চুরি মামলা | মুন্সীগঞ্জ |
মিঠু পাটোয়ারী | ২টি চুরি মামলা | বরিশাল |
জাকির হোসেন | ৩টি চুরি/দস্যুতা মামলা | পটুয়াখালী |
নিজাম | ১টি চুরি মামলা | পটুয়াখালী |
সবগুলো মামলাই আদালতে বিচারাধীন। অর্থাৎ জামিনে বের হয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়েছে চক্রটি।
পুলিশ সুপার বললেন: “মিথ্যা পরিচয় দিয়ে অপরাধ, কাউকে ছাড় নয়”
বগুড়ার পুলিশ সুপার মির্জা সায়েম মাহমুদ, পিপিএম বলেন, “ডিবি, পুলিশ বা সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও ছিনতাই করা হচ্ছে। এটা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা চক্রটিকে ১০ দিনের মাথায় ধরতে সক্ষম হয়েছি।”
তিনি আরও জানান, “ওয়াকিটকি ব্যবহার করে তারা নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য হিসেবে বিশ্বাসযোগ্য করত। আমরা সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করব, কেউ সিভিল পোশাকে পুলিশ পরিচয় দিলে অবশ্যই আইডি কার্ড দেখতে চাইবেন। সন্দেহ হলে ৯৯৯-এ কল করবেন।”
যেভাবে কাজ করত ‘ওয়্যারলেস পার্টি’
ডিবির এসআই মোহাম্মদ ফজলুল হক জানান, চক্রটির কৌশল ছিল ৩ ধাপে:
1. টার্গেট বাছাই: হাসপাতাল, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশনের মতো ব্যস্ত এলাকায় একা থাকা ইজিবাইক চালককে টার্গেট করত।
2. বিশ্বাস অর্জন: যাত্রী সেজে ওঠার পর “পরিচিত” আরেকজনকে দিয়ে নাটক সাজাত। এরপর ওয়াকিটকি দেখিয়ে ধমক দিয়ে চালককে গাড়ি থেকে নামাত।
3. দ্রুত বিক্রি: ছিনতাইয়ের ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই গাড়ি রংপুর, গাইবান্ধা বা অন্য জেলায় কম দামে বিক্রি করে দিত, যাতে ট্রেস করা না যায়।
উদ্ধার হওয়া প্রাইভেটকারটি তারা ছিনতাইয়ের পর পালানোর কাজে ব্যবহার করত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীদের আকুতি: “আমাদের রুটিরুজি ফিরে পেলাম”
ছিনতাই হওয়া ইজিবাইক ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাদী। “এই গাড়ি কিস্তিতে কেনা। এটা গেলে আমার পরিবার না খেয়ে মরত। ডিবি স্যারদের কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ”, বলেন তিনি।
বগুড়া জেলা অটোরিকশা-ইজিবাইক মালিক সমিতির সভাপতি বলেন, “গত ৬ মাসে বগুড়ায় ২০টার বেশি গাড়ি এভাবে গেছে। আজকের অভিযানে আমরা স্বস্তি পেলাম।”
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
গ্রেফতারকৃত ৭ আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৬ মে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের রিমান্ড চাওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিবি। উদ্ধারকৃত আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, চক্রের আরও সদস্য ও অন্য জেলায় বিক্রি হওয়া গাড়ির সন্ধানে অভিযান চলবে।
প্রকাশ: ৬ মে ২০২৬, মঙ্গলবার
















