

মিজানুর রহমান রানা :
শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের সীমায় আবদ্ধ নয়, এটি আমাদের চিন্তা, কল্পনা ও মানবিকতা গঠনের প্রধান ভিত্তি। একজন ভালো শিক্ষক যেমন শিক্ষার্থীর ভেতরের সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলেন, তেমনি একটি ভালো শিক্ষাব্যবস্থা সমাজের অগ্রগতির পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার ধরন বদলেছে, আর প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তা হয়ে উঠেছে আরও সহজলভ্য, মজার ও ফলপ্রসূ। বিশেষ করে করোনাকালীন সময়ে অনলাইন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও জনপ্রিয়তা বহুগুণে বেড়েছে। আজকের এই ফিচারে আমরা তুলে ধরছি বাংলাদেশের ও বিশ্বের সাতটি জনপ্রিয় অনলাইন শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম, যারা নতুন প্রজন্মের শ্রেণিকক্ষ হয়ে উঠেছে।

১. ১০ মিনিট স্কুল
২০১৫ সালে আয়মান সাদিকের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ১০ মিনিট স্কুল। শুরুটা ছিল ইউটিউবে শিক্ষামূলক ভিডিও আপলোডের মাধ্যমে, কিন্তু অল্প সময়েই এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অনলাইন শিক্ষার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়। এখানে রয়েছে প্রায় ১৯,৪০০টি ভিডিও এবং ৫০,০০০-এর বেশি কুইজ। পঞ্চম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সব বিষয়ের পাঠ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, চাকরির প্রস্তুতি, স্কিল ডেভেলপমেন্ট—সবকিছুই এক ছাদের নিচে। প্রায় ১৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ইতিমধ্যে এই প্ল্যাটফর্ম থেকে উপকৃত হয়েছে।
১০ মিনিট স্কুলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর কনটেন্টের বৈচিত্র্য ও সহজবোধ্যতা। শিক্ষার্থীরা এখানে ভিডিও দেখে, কুইজে অংশ নিয়ে, লাইভ ক্লাসে যুক্ত হয়ে এক নতুন ধরনের শিক্ষার অভিজ্ঞতা অর্জন করে। এটি শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থা।
২. শিক্ষক বাতায়ন
বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে তৈরি শিক্ষক বাতায়ন মূলত শিক্ষকদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানে শিক্ষকরা তাদের তৈরি করা ভিডিও, প্রেজেন্টেশন, ছবি ইত্যাদি আপলোড করতে পারেন এবং অন্যদের তৈরি কনটেন্টও ব্যবহার করতে পারেন। এ পর্যন্ত ৪৪,০০০-এর বেশি শিক্ষামূলক ভিডিও এবং ২,১৪,০০০-এর বেশি প্রেজেন্টেশন জমা হয়েছে।
এই প্ল্যাটফর্মের বিশেষত্ব হলো—এটি শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক শেখার সুযোগ তৈরি করে। একজন শিক্ষক তার ভালো উপস্থাপনার মাধ্যমে অন্যদের শেখাতে পারেন কীভাবে বিষয়গুলো সহজভাবে বোঝানো যায়। ভালো কনটেন্টের জন্য শিক্ষকদের পুরস্কারও দেওয়া হয়, যা তাদের উৎসাহিত করে আরও মানসম্পন্ন উপকরণ তৈরি করতে।
৩. স্টাডিপ্রেস
চাকরির পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য স্টাডিপ্রেস একটি জনপ্রিয় অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। এখানে পাওয়া যায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি, পুরোনো প্রশ্নপত্র, অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা ও বিশ্লেষণ। বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ, সরকারি চাকরি—সব ধরনের পরীক্ষার জন্য এটি একটি কার্যকরী সহায়ক।
প্রায় ১,১৯,০০০ শিক্ষার্থী এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে। শিক্ষার্থীরা এখানে পুরোনো প্রশ্ন দেখে নিজের ভুল ধরতে পারে, সংশোধন করতে পারে এবং অধ্যায়ভিত্তিক প্রস্তুতি নিতে পারে। সহজ ইন্টারফেস ও নিয়মিত আপডেটের কারণে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছে এটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।
৪. রেপটো এডুকেশন সেন্টার
ফ্রিল্যান্সিং ও স্কিল ডেভেলপমেন্টে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য রেপটো একটি আদর্শ প্ল্যাটফর্ম। এখানে রয়েছে অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, ইলাস্ট্রেশনসহ শতাধিক কোর্স। পাঁচশোর বেশি শিক্ষক এই কোর্সগুলো পরিচালনা করছেন এবং এক লাখ দশ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত।
রেপটো শুধু শেখায় না, বরং দক্ষ শিক্ষার্থীদের চাকরির সুযোগও করে দেয়। কোর্স শেষে সার্টিফিকেট, প্রজেক্ট ভিত্তিক মূল্যায়ন এবং ক্যারিয়ার গাইডলাইন—সবকিছুই এখানে পাওয়া যায়। এটি বাংলাদেশের স্কিল-ভিত্তিক শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
৫. খান একাডেমি
বিশ্বজুড়ে অনলাইন শিক্ষার বিপ্লব ঘটানো একটি নাম হলো খান একাডেমি। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সালমান খান এটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে গণিত, বিজ্ঞান, প্রোগ্রামিং, অর্থনীতি, ইতিহাসসহ নানা বিষয়ের ৪,৫০০-এর বেশি ভিডিও ও কোর্স একদম বিনামূল্যে পাওয়া যায়।
খান একাডেমির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর গ্লোবাল অ্যাক্সেসিবিলিটি। ঘরে বসেই যে কেউ, যেকোনো বয়সে, যেকোনো জায়গা থেকে শিখতে পারে। এটি শিক্ষাকে করেছে truly democratic—সবার জন্য উন্মুক্ত, সহজ ও মানসম্পন্ন।
# ৬. শিখো অ্যাপস
শাহীর চৌধুরী ও জিশান জাকারিয়ার উদ্যোগে তৈরি ‘শিখো’ অ্যাপটি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ একাডেমিক প্ল্যাটফর্ম। এখন পর্যন্ত ৩০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী এটি ব্যবহার করছে। ২০ জনের বেশি মেন্টর শিক্ষার্থীদের গাইড করেন, আর ১.৮ লাখের বেশি লার্নিং ম্যাটেরিয়াল রয়েছে।
শিখো অ্যাপের বিশেষত্ব হলো—এটি ক্লাসের পাঠ্যক্রম অনুযায়ী সাজানো, যেখানে রয়েছে ভিডিও ক্লাস, কুইজ, পরীক্ষার প্রস্তুতি, এবং নির্দেশিত ক্লাস। শিক্ষার্থীরা এখানে নিজের গতিতে শিখতে পারে, আবার প্রয়োজন হলে লাইভ সাপোর্টও পায়। এটি বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তনের নাম।
৭. ডুয়োলিংগো
ভাষা শেখার ক্ষেত্রে ডুয়োলিংগো একটি জনপ্রিয় ও কার্যকরী অ্যাপ। এটি তৈরি করেন পিটসবার্গের কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুইস ভন আহন ও তার ছাত্র সেভেরিন হ্যাকার। অ্যাপটিতে ভাষা শেখাকে গেমের মতো করে সাজানো হয়েছে, যাতে শেখা হয় মজার ও সহজভাবে।
ছোট ছোট লেসনের মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন শব্দ, ব্যাকরণ ও বাক্য গঠন শেখা যায়। ইংরেজি, স্প্যানিশ, ফরাসি, জার্মানসহ বহু ভাষা শেখার সুযোগ রয়েছে। এটি শুধু ভাষা শেখার নয়, বরং ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি করার একটি প্ল্যাটফর্ম।
এই সাতটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আমাদের দেখায়—শিক্ষা এখন আর শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শিক্ষা পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, ঘরের কোণে, এমনকি হাতে ধরা স্মার্টফোনে। শিক্ষার এই নতুন দিগন্তে আমরা পাচ্ছি নতুন সম্ভাবনা, নতুন পথ, আর নতুন ভবিষ্যৎ।
শিক্ষা যদি আলোর মতো হয়, তাহলে এই প্ল্যাটফর্মগুলো সেই আলোর বাহক—যারা আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যাচ্ছে। এখন সময় এসেছে এই আলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের স্বপ্নকে বাস্তব করে তোলার।
শুক্রবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৫















