

ক্ষুদীরাম দাস :
বিরামপুর রেলস্টেশনের তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে সন্ধ্যা নামলেই একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে। উত্তরবঙ্গের হিম বাতাস যখন মেহগনি গাছের পাতাগুলো নাড়িয়ে দিয়ে যায়, তখন দূর থেকে কুশিয়ারা এক্সপ্রেসের হুইসেল শোনা যায়। শহরের আলো এ প্ল্যাটফর্মে পৌঁছায় না বললেই চলে, কেবল দু-একটা মিটমিটে বাতি আর স্টেশনের পুরানো ইটের দেয়াল বেয়ে ওঠা ছায়ার খেলা দেখা যায়।
আসিফ বিরামপুর স্টেশনে বসে ছিলো। তার হাত থেকে এক কাপ চা জুড়িয়ে ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিলো। অফিসে একটা কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়ার পর সে কিছুদিনের জন্য ঢাকা ছেড়ে এখানে এসেছে, নিজের গ্রাম আর পুরানো স্মৃতিগুলোর মাঝে একটু শান্তি খুঁজে পাওয়ার জন্যে। কিন্তু স্টেশনের এই কোণে এসে তার দৃষ্টি আটকে গেলো একটা নির্দিষ্ট অবয়বের ওপর।

প্ল্যাটফর্মের দূরবর্তী কোণায় একটি লাল জামা পরা মেয়ে বসে ছিলো। মেয়েটি বয়সে খুব বড় নয়, বোধহয় সতেরো বা আঠারো হবে। তার সামনে একটা পুরানো ডায়েরি খোলা, হাতে একটা পেনসিল। সে একের পর এক আঁকিঝুঁকি কাটছিলো। ট্রেন আসার খবর শুনে অন্য সব যাত্রী যখন হুড়মুড় করে দরজার দিকে দৌড়াচ্ছিলো, মেয়েটি কিন্তু একটুও নড়লো না। তার এই অচঞ্চল ভাব দেখে আসিফের মনে একটা অদ্ভুত কৌতূহল তৈরি হলো।
আসিফ আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির থেকে কিছুটা দূরে বেঞ্চে বসলো। মেয়েটির মুখের দিকে তাকাতেই সে বুঝতে পারলো, মেয়েটির চোখে কোনো ভয় বা উদ্বেগ নেই, বরং এক ধরনের অদ্ভুত উদাসীনতা রয়েছে।
“তুমি কি কোনো ট্রেনের জন্যে অপেক্ষা করছো?” আসিফ মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
মেয়েটি মুখ তুলে তাকালো। তার চোখ দুটো এতোটাই গভীর আর স্থির যে আসিফ এক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেলো। মেয়েটি কোনো উত্তর দিলো না, শুধু ঘাড় নেড়ে জানালেÑ’না’।
“তাহলে এতো রাতে এখানে বসে আছো যে?” আসিফ আবার প্রশ্ন করলো।
মেয়েটি এবার হাত থেকে পেনসিলটা রাখলো। তারপর মৃদু কন্ঠে বললো, “মানুষের অপেক্ষা শেষ হওয়ার দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগে। কিন্তু কেউ যখন কাউকে ছেড়ে চলে যায়, সেই দৃশ্য দেখতে একদম ভালো লাগে না।”
কথাটা শুনে আসিফের চমকে ওঠার মতো অবস্থা। এই বয়সে এতো গভীর কথা কীভাবে বলে একটা মেয়ে? আসিফ বিরামপুরের স্থানীয় মানুষ হলেও মেয়েটিকে আগে কখনো দেখেনি।
“তোমার বাড়ি কোথায়? কারো সাথে এসেছো?”
মেয়েটি হালকা হাসলো। তারপর হাতের ডায়েরির পাতা উল্টে একটি ছবি দেখালো। সেখানে বিরামপুর স্টেশনেরই একটি সুন্দর স্কেচ করা। ছবিতে কেবল দু’জন মানুষের স্পষ্ট অবয়ব আঁকা, বাকি সব অস্পষ্ট।
মেয়েটি বললো, “আমার নাম নদী। আমি প্রতিদিন এই প্ল্যাটফর্মে আসি। আমার বাবা একসময় স্টেশনের মাস্টার ছিলেন। তিনি বলতেন, স্টেশন হলো এমন একটা জায়গা যেখানে সবাই কেবল অতিথি। কেউ আসে, কেউ যায়, কেউ চিরকালের জন্যে থেকে যায় না। বাবা যখন মারা গেলেন, তখন আমার মনে হলো এই স্টেশনটাই বাবার সবচেয়ে কাছের জায়গা ছিলো।”
আসিফ মেয়েটির কথাগুলো শুনছিলো। সে লক্ষ্য করলো নদী কথা বলার সময় ভীষণ সহজ আর সরল। তার মধ্যে কোনো বাড়তি অহংকার বা কৃত্রিমতা নেই। অহংকারের মতো কুৎসিত ভাবটা মানুষের সরলতাকে কীভাবে নষ্ট করে দেয়, তা আসিফ ঢাকায় অনেক দেখেছে। কিন্তু নদীর সরলতা তাকে ভেতর থেকে স্পর্শ করলো।
“তুমি কি প্রতিদিন এখানে এসে ছবি আঁকো?” আসিফ জিজ্ঞেস করলো।
“হাঁ,” নদী জবাব দিলো, “ছবি আঁকা আমার একটা নেশার মতো। মানুষ যখন ট্রেনের জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকায়, তাদের মুখের ভাবগুলো আমি আঁকার চেষ্টা করি। কারো চোখে নতুন শহরে যাওয়ার আনন্দ, কারো চোখে প্রিয়জনকে ছেড়ে আসার কষ্ট। এই এতোটা অনুভূতি একসাথে আর কোথাও পাওয়া যাবে কি? পাওয়া যাবে না।”
আসিফ মৃদু হাসলো, “তুমি তো বেশ পর্যবেক্ষণ করতে পারো! তা তোমার বাড়িতে কে কে আছেন?”
“আমি আর আমার মা থাকি,” নদী ডায়েরিটা বন্ধ করতে করতে বললো, “মা ঘরে বসে সেলাইয়ের কাজ করেন। আমি মায়ের জন্যে সুতো কিনে নিয়ে যাই। আর প্রতিদিন এই স্টেশনে কিছুটা সময় কাটাই। মা জানেন আমি কোথায় আছি, তাই কোনো চিন্তা করেন না।”
হঠাৎ করেই স্টেশনে আবারো একটা ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠলো। রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস এসে থামলো এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে। অমনি স্টেশনের নীরবতা ভেঙে হইচই শুরু হয়ে গেলো। কুলিদের হাঁকডাক, হকারদের চিৎকার আর যাত্রীদের ছোটাছুটি শুরু হলো।
নদী উঠে দাঁড়ালো। “এবার আমার বাড়ি ফেরার সময় হয়েছে। রাত হয়ে গেছে তো।”
আসিফও উঠে দাঁড়িয়ে বললো, “আমি কি তোমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দেবো? এতো রাতে একা যাওয়া ঠিক হবে না।”
নদী কিছুক্ষণ আসিফের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, “না, আমি একাই যেতে পারবো। আমি তো এই রাস্তারই মেয়ে, কাউকে ভয় পাই না। তাছাড়া কারো সাহায্য নেয়ার অভ্যাস আমার নেই।”
মেয়েটির স্বাবলম্বী আর আত্মবিশ্বাসী মনোভাব দেখে আসিফ আর জোড়াজুড়ি করতে পারলো না। সে নদীর চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইলো। নদী ধীরপায়ে হেঁটে স্টেশনের বাইরের আঁধার রাস্তাটির মধ্যদিয়ে মিলিয়ে গেলো।
পরদিন সন্ধ্যায় আসিফ আবার বিরামপুর স্টেশনে এলো। তার মনে হচ্ছিলো আজকেও সে নদীকে সেই লাল জামা পরে কোণার বেঞ্চে বসে থাকতে দেখবে। কিন্তু প্ল্যাটফর্মের পুরোটা ঘুরেও সে নদীকে খুঁজে পেলো না। তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের সেই পুরানো ইটের দেয়ালটা আজ যেন আরো বেশি নিস্তব্ধ হয়ে ছিলো।
আসিফ প্ল্যাটফর্মের টিকেট কাউন্টারের কাছে গিয়ে এক পুরানো কর্মচারীকে জিজ্ঞেস করলো, “আচ্ছা, নদী নামের একটা মেয়ে প্রতিদিন এখানে আসতো না? লাল জামা পরা, হাতে ডায়েরি থাকতো?”
লোকটি আসিফের দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালো। তারপর বললো, “ওহ্, নদীমাস্টারের মেয়ের কথা বলছেন? ও তো গত ছয় মাস হলো আর এখানে আসে না।”
আসিফ বেশ চমকে উঠে বললো, “বলেন কি! আমি তো কাল রাতেই ওর সাথে এই তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে বসে কথা বললাম!”
কর্মচারীটি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লো। “স্যার, আপনার ভুল হচ্ছে হয়তো। নদী মেয়েটি মাসছয়েক আগে এক ট্রেনের দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলো। স্টেশনের কাছেই একটা বাচ্চাকে বাঁচাতে গিয়ে সে নিজে লাইনে পড়ে যায়। মেয়েটার বাবাও মারা যান তার কিছুদিন পর।”
কথাটা শোনামাত্র আসিফের পুরো শরীর যেন হিম হয়ে গেলো। তার পায়ের নিচের মাটি সরে যাওয়ার মতো অনুভূতি হলো। সে কাল রাতে কার সাথে কথা বললো? সেই স্পষ্ট লাল জামা, সেই ডায়েরি, সেই মিষ্টি হাসি আর গভীর কথাগুলোÑসব কি তবে তার মনের ভুল ছিলো? নাকি নদীর ভালোবাসা আর স্মৃতির এক অবিনশ্বর অংশ এখনো এই বিরামপুর স্টেশনের বাতাসে ভেসে বেড়ায়?
আসিফ ধীরপায়ে তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের সেই কোণার বেঞ্চটার দিকে হেঁটে গেলো। বেঞ্চের ওপর একটি পুরানো পেপারের টুকরো বাতাসে উড়ছিলো। আসিফ নিচু হয়ে কাগজটি হাতে নিলো। সেখানে পেনসিল দিয়ে খুব সুন্দর করে আঁকা এক যুবকের ছবি, যে এক কাপ চা হাতে বিষণ্ন মনে বসে আছে। আর ছবির নিচে ছোট করে লেখাÑ”অপেক্ষা।”
আসিফ আকাশের দিকে তাকালো। রাতের বাতাস মেহগনি গাছের পাতায় এক রহস্যময় শব্দ সৃষ্টি করছিলো। আসিফ বুঝতে পারলো, বিরামপুরের এই অচেনা মেয়েটি তাকে শিখিয়ে দিয়ে গেলো যে, কিছু উপস্থিতি চোখের দৃশ্য দিয়ে পরিমাপ করা যায় না, তা শুধু অনুভূতির গভীরতা দিয়েই অনুভব করা যায়। আর বিরামপুরের এই স্টেশনটি নদীকে কোনোদিন ভুলতে দেবে না; প্রতি রাতে যখন ট্রেন এসে থামবে, কোনো না কোনো যাত্রী নদীর সেই অমলিন উপস্থিতি ঠিকই টের পাবে।
প্রকাশিত : সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬

















