খাদ্য নিরাপত্তা নাকি জনস্বাস্থ্যের চরম হুমকি: সান্তাহারের ঘটনা কী বার্তা দেয়?

সম্পাদকীয়
গত ৩ নভেম্বর প্রিয় সময়ে প্রকাশিত ‘সান্তাহারে হোটেলের খাবার খেয়ে পাঁচজন হাসপাতালে, কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ইউএনওর কাছে অভিযোগ’ শিরোনামে সংবাদটি পাঠকসমাজকে হতাশ করেছে। প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি যে, বগুড়ার সান্তাহার স্টেশন রোডের ‘বিসমিল্লাহ হোটেলে’ মুরগির চাপ ও গ্রিল খেয়ে একই সঙ্গে বেশ কয়েকজন গ্রাহকের গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন খাদ্য বিষক্রিয়া বা ফুড পয়জনিংয়ের ঘটনা নয়।

এটি আমাদের খাদ্যাভ্যাস, রেস্তোরাঁ ব্যবসা এবং সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তার এক বিষাদময় বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পচা-বাসি বা ভেজাল খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় দু’জন অভিযোগকারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে বিচার চেয়েছেন এবং নওগাঁ সদর হাসপাতালে বাকি পাঁচজন শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে এখনও চিকিৎসাধীন। যে সাধারণ মানুষগুলো একটি হোটেলের ওপর ভরসা করে রাতের খাবার খেতে গিয়েছিলেন, তাদের শেষ পরিণতি যদি হয় হাসপাতালের শয্যা—তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, আমাদের নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা কোথায়? রেস্তোরাঁ ও খাদ্য দোকানগুলোতে নিম্নমানের, বাসি কিংবা অনিরাপদ উপাদান ব্যবহারের অভিযোগ নতুন কিছু নয়।

তবে সান্তাহারের এ ঘটনা প্রমাণ করে, বিষয়টি দিনে দিনে কতটা ভয়ংকর মাত্রা ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে অধিক মুনাফা লাভের আশায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বাসি ও পচা মাংস রাসায়নিক বা অতিরিক্ত মশলা দিয়ে ঢেকে বিক্রি করে থাকেন। স্বাস্থ্যঝুঁকি জেনেও গ্রাহকদের সামনে তুলে দেওয়া হয় এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার। সান্তাহারের হোটেলে যা ঘটেছে, তার মধ্যদিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনকে কতটা তুচ্ছ ও অবহেলার চোখে দেখা হয়, সেটাই উন্মোচিত হলো। বিষাক্ত ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য পরিবেশন করা আর মানুষের মুখে বিষ তুলে দেওয়া—এ দু’য়ের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। খাদ্য মানুষের মৌলিক চাহিদা।

অথচ এই মৌলিক চাহিদার জায়গাতেই আজ চরম অনিশ্চয়তা ও ভয় তাড়া করে ফিরছে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় যারা খেতে যান, তারা অর্থ পরিশোধ করেই খাবার কেনেন; কারো করুণা বা দয়ায় নয়। তা সত্ত্বেও যদি টাকার বিনিময়ে অসুস্থতা কিনতে হয়, তবে আইনের শাসন ও তদারকি ব্যবস্থার ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে যাওয়া স্বাভাবিক। এই ঘটনার পর ভুক্তভোগীরা যেভাবে আইনের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। সাধারণ মানুষের এমন সচেতনতা ও প্রতিবাদী অবস্থানই পারে অসাধু চক্রকে প্রতিহত করতে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম এই লিখিত অভিযোগটি খতিয়ে দেখে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই আশ্বাস যেন শুধুই কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্রের ফাইলে বন্দী হয়ে না পড়ে। সান্তাহারের এই ঘটনাকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে অবিলম্বে বিসমিল্লাহ হোটেলের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া এ ধরনের ঘটনায় কেবল সাময়িক জরিমানা বা লোকদেখানো লোকাল মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করাই যথেষ্ট নয়; বরং যেসব হোটেল স্বাস্থ্যবিধি মানছে না, সেগুলোর লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর শাস্তির আওতায় আনা জরুরি। শুধু একটি মাত্র রেস্তোরাঁর ওপর ব্যবস্থা নিলেই পুরো সমস্যার সমাধান হবে না।

প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় স্থায়ী ও নিয়মিত খাদ্য তদারকি সেল গঠন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ঝটিকা অভিযান বাড়াতে হবে এবং খাদ্য তৈরির রান্নাঘর থেকে শুরু করে পরিবেশন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে বজায় রাখা নিশ্চিত করতে হবে। যেসব ব্যবসায়ী মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের বোঝাতে হবে যে জনস্বাস্থ্য বিনষ্ট করার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

আমরা আশা করি, সান্তাহারের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মধ্যদিয়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এই বিচার যেন উদাহরণ হয়ে থাকে অন্য সব অসাধু ব্যবসায়ীর জন্য। নাগরিকের নিরাপদ খাবারের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব, আর সেই দায়িত্ব পালনে প্রশাসনের সুনির্দিষ্ট এবং কঠোর অবস্থান দেখতে চায় সাধারণ জনগণ।

প্রকাশিত: বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy