টিকটকের ফ্যান্টাসিতে ঘর ছাড়ছে শিশুরা: আমরা কি সন্তানদের হারিয়ে ফেলছি?

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

কুমিল্লা থেকে চুনারুঘাট — ১২০ কিলোমিটার ভুল পথগত সোমবার সকালে কুমিল্লার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার ছাত্রী স্কুলের অনুষ্ঠানের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়। বয়স ৮ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। তিনজন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, একজন তৃতীয় শ্রেণিতে। ব্যাগে বইয়ের বদলে তারা নেয় বাবার মোবাইল, মায়ের গয়না। উদ্দেশ্য — টিকটকে দেখা স্বাধীন জীবন।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান পরে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “স্বাধীনভাবে জীবনযাপন ও উপার্জনের উদ্দেশে তারা ঘর ছেড়েছে। তারা মনে করেছে, টিকটক করলেই টাকা আসবে, বাড়ি লাগবে, গাড়ি লাগবে, কেউ বকা দেবে না।”বুধবার তাদের উদ্ধার করা হয় হবিগঞ্জের চুনারুঘাট থেকে। ১২০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছে চার শিশু। তাদের কাছে টিকটকের ফ্যান্টাসি সত্যি মনে হয়েছে, আর বাবা-মায়ের শাসন মিথ্যা।

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি ভয়াবহ সামাজিক মহামারির সতর্ক সংকেত।

১. টিকটক কীভাবে মগজে ফ্যান্টাসি তৈরি করে?টিকটকের অ্যালগরিদম পৃথিবীর সবচেয়ে আসক্তি তৈরি করা অ্যালগরিদম।

এর কাজ তিনটি:

ক) তুলনার ফাঁদ: আপনি সারাদিন দেখবেন ১৪ বছরের মেয়ে দামি ফোন, মেকআপ, কাপড় পরে ৫০ হাজার টাকা আয় করছে। অ্যালগরিদম আপনাকে কখনো দেখাবে না এর পেছনের প্রতারণা, যৌন হয়রানি, পরিবারের কান্না। আপনার মেয়ের মনে হবে — ও পারলে আমি কেন পারব না?

খ) স্বাধীনতার ভুল সংজ্ঞা: টিকটকে স্বাধীনতা মানে বাবা-মাকে অমান্য করা, পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া, শরীর দেখিয়ে ভিউ কামানো। ইসলাম এবং আমাদের সংস্কৃতিতে স্বাধীনতা মানে দায়িত্বশীল হওয়া। টিকটক শেখায় দায়িত্বহীনতাই স্বাধীনতা।

গ) ডোপামিন লুপ: একটা ভিডিও ১৫ সেকেন্ড। স্ক্রল করলেই নতুন বিনোদন। শিশুর মস্তিষ্ক প্রতি ১৫ সেকেন্ডে ডোপামিন পায়। বই পড়া, ক্লাস করা, নামাজ পড়া — এগুলোতে এত দ্রুত আনন্দ পাওয়া যায় না। তাই শিশু ধীরে ধীরে বাস্তব জীবনকে বিরক্তিকর মনে করতে শুরু করে।

কুমিল্লার ওই চার শিশুও এই লুপে পড়েছে। তারা ভেবেছে, স্কুলের অনুষ্ঠান বিরক্তিকর, কিন্তু টিকটক লাইভে টাকা উড়ছে।

২. ৮-১২ বছরের মেয়েরা কেন বেশি ঝুঁকিতে?

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ১০-১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া আসক্তি ছেলেদের চেয়ে ৩ গুণ বেশি।

এর কারণ:

১. পরিচয়ের সংকট: এই বয়সে মেয়েরা নিজেকে প্রশ্ন করে — আমি কে? আমি কি সুন্দর? টিকটক তখন উত্তর দেয় — তুমি সুন্দর যদি তোমার ভিউ বেশি হয়।

২. পারিবারিক যোগাযোগের অভাব: আমরা অনেক বাবা-মা সন্তানকে সময় না দিয়ে হাতে মোবাইল তুলে দিই। সন্তান কাঁদলে মোবাইল, খেতে না চাইলে মোবাইল। আমরা নিজেরাই তাদের হাতে নেশা তুলে দিচ্ছি।

৩. যৌন শিকারিদের টার্গেট: টিকটকে ছোট মেয়েদের ভিডিওতে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের কমেন্ট ভয়াবহ। “তোমাকে অনেক কিউট লাগছে, ইনবক্সে আসো” — এই ফাঁদে পড়ে অনেক মেয়ে পাচারের শিকারও হয়েছে। কুমিল্লার মেয়েরা ভাগ্যবান যে পুলিশ তাদের দ্রুত উদ্ধার করেছে।

৩. এই ফ্যান্টাসির শেষ কোথায়?

পুলিশের সাইবার ক্রাইম বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে টিকটক-কেন্দ্রিক ৪টি বড় অপরাধ বেড়েছে:

ক) ঘর থেকে পালানো: ২০২৩ সালে ৪৭ জন কিশোরী ঘর ছেড়েছে টিকটকার হওয়ার জন্য। ২০২৫ সালে সংখ্যাটা ১৮৩ জন।

খ) মোবাইল ও গয়না চুরি: পরিবারের অজান্তে মোবাইল বিক্রি, মায়ের গয়না বিক্রি করে রিং লাইট, ভালো ফোন কেনা। কুমিল্লার ঘটনায়ও একই ঘটনা ঘটেছে।

গ) অনলাইন যৌন হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল: টিকটকে পরিচয়, তারপর ইমো, হোয়াটসঅ্যাপে ব্যক্তিগত ছবি আদান-প্রদান, তারপর ব্ল্যাকমেইল।ঘ) পড়াশোনা ধ্বংস: প্রাথমিকের শিশুরা যখন রাত ২টা পর্যন্ত লাইভ করে, সকালে তার স্কুলে যাওয়ার শক্তি থাকে না।

৪. বাবা-মা হিসেবে এখনই কী করবেন?এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে — সন্তানকে মোবাইল দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না।

১. ১২ বছরের আগে ব্যক্তিগত স্মার্টফোন নয়: অনেক দেশে ১৪ বছরের আগে সোশ্যাল মিডিয়া নিষিদ্ধ। আপনি অন্তত ১২ বছর পর্যন্ত বাটন ফোন দিন। প্রয়োজন হলে আপনার ফোন থেকেই ৩০ মিনিট দেখতে দিন, তাও আপনার সামনে।

২. মোবাইল নয়, সময় দিন: সন্তান টিকটক দেখে কারণ তার গল্প শোনার কেউ নেই। প্রতিদিন ৩০ মিনিট তার সাথে কোনো স্ক্রিন ছাড়া গল্প করুন। তার স্কুল, বন্ধু, ভয় নিয়ে শুনুন।

৩. ডিজিটাল পর্দা শেখান: যেমন আমরা সন্তানকে শারীরিক পর্দা শেখাই, তেমনি ডিজিটাল পর্দাও শেখাতে হবে। বোঝান — শরীর, ঘর, পরিবারের ছবি ইন্টারনেটে দেওয়া মানে নিজের ইজ্জত অন্যের হাতে তুলে দেওয়া। এটি ইসলামেও হারাম।

৪. ফ্যান্টাসি ভাঙুন, বাস্তব দেখান: যে টিকটকারকে দেখে আপনার মেয়ে মুগ্ধ, তার আয়ের উৎস কী? তার শিক্ষা কী? তার পরিবার কোথায়? অধিকাংশ ভাইরাল টিকটকারের জীবনই ঋণ, মামলা আর হতাশায় ভরা। সন্তানকে সেটা দেখান।

৫. স্কুল ও মসজিদকে যুক্ত করুন: শুধু শাসন নয়, বিকল্প আনন্দ দিন। কুরআন শিক্ষা, খেলাধুলা, বিতর্ক ক্লাব, স্কাউট — যেখানে সে সম্মান ও পরিচয় পাবে, সেখানে সে টিকটকে পরিচয় খুঁজবে না।

কুমিল্লার চার শিশু ফিরে এসেছে। কিন্তু কাল আপনার ঘরের শিশুটি ফিরবে তো?টিকটক একটি অ্যাপ মাত্র। সমস্যা অ্যাপে নয়, সমস্যা আমাদের নজরদারির অভাবে।

আমরা সন্তানের হাতে আগুন দিয়ে বলছি — “পুড়ো না।”

আজই আপনার সন্তানের মোবাইল চেক করুন। সে কী দেখে, কাদের সাথে কথা বলে, রাতে কতক্ষণ জেগে থাকে — জানুন। কঠোর হোন, কিন্তু ভালোবেসে কঠোর হোন।

মনে রাখবেন, একটি টিকটক ভিডিও ১৫ সেকেন্ডে শেষ হয়, কিন্তু একটি ভুল সিদ্ধান্ত একটি পরিবারকে সারাজীবনের জন্য শেষ করে দেয়।

প্রকাশিত:  বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy