আসুন আমাদের সন্তানদের মোবাইল রেখে বইমুখী করি

ক্ষুদীরাম দাস :

বর্তমান ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ডেকে এনেছে এক নীরব বিপর্যয়, যার সবচেয়ে বড় শিকার আজ আমাদের কোমলমতি শিশুরা। একসময় যে শৈশব কেটে যেত মাঠে খেলাধুলা, রূপকথার গল্প শোনা আর বইয়ের পাতার মায়ায়, তা আজ বন্দি হয়ে পড়েছে স্মার্টফোনের পাঁচ ইঞ্চি স্ক্রিনে। ইউটিউব শর্টস, ফেসবুক রিলস কিংবা অন্তহীন ভিডিও গেমের রঙিন দুনিয়া শিশুদের চরমভাবে গ্রাস করছে। এর ফলস্বরূপ তাদের চোখের জ্যোতি হ্রাসের পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে মনোযোগের মারাত্মক অভাব, খিটখিটে মেজাজ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা। এই ডিজিটাল আসক্তি থেকে আমাদের শিশুদের রক্ষা করতে এবং তাদের একটি সৃজনশীল ও সুশৃঙ্খল ভবিষ্যৎ উপহার দিতে এখনই সময় এসেছে মোবাইল সরিয়ে তাদের হাতে বই তুলে দেওয়ার, কারণ বইয়ের মতো বিশ্বস্ত ও উপকারী বন্ধু শিশুদের আর কেউ হতে পারে না।

বই পড়া শুধু একটি অভ্যাস নয়, এটি মানুষের মননশীলতা ও কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। যখন একটি শিশু বইয়ের পাতা ওল্টায়, তখন সে কেবল কিছু অক্ষরই পড়ে না, বরং সে প্রবেশ করে এক নতুন ভাবনার জগতে, যেখানে তার নিজের কল্পনার রঙে চরিত্ররা জীবন্ত হয়ে ওঠে। অথচ মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে শিশুদের সৃজনশীল চিন্তা করার ক্ষমতা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। বই পড়ার মাধ্যমে শিশুদের মধ্যে ধৈর্য, একাগ্রতা এবং গভীর মনঃসংযোগের মতো গুণগুলো বিকশিত হয়, যা আধুনিক যুগের এই চঞ্চল ও দ্রুতগতির সংস্কৃতিতে হারিয়ে যেতে বসেছে। একটি ভালো বই মানুষের ভেতরের নৈতিকতাবোধকে জাগ্রত করে, মনের দিগন্তকে প্রসারিত করে এবং তাকে একজন সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তাই শিশুদের মোবাইল থেকে দূরে রেখে বইমুখী করার এই লড়াই কেবল তাদের পড়াশোনার মানোন্নয়নের জন্য নয়, বরং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার স্বার্থেও অত্যন্ত জরুরি।

এই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে আমাদের নিজেদের ঘর থেকেই। শিশুরা অনুকরণপ্রিয়; বাবা-মা যদি সারাক্ষণ হাতে মোবাইল নিয়ে বসে থাকেন, তবে সন্তানকে বই পড়তে বলা কেবল বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। আমাদের নিজেদের স্ক্রিনটাইম কমিয়ে শিশুদের সঙ্গে নিয়ে বই পড়ার একটি সুন্দর পরিবেশ তৈরি করতে হবে। রাতের ঘুমানোর আগে বা ছুটির অলস দুপুরে গ্যাজেট ব্যবহারের নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং তার পরিবর্তে গল্প, কবিতা বা রূপকথার বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হতে পারে। পাশাপাশি, স্কুল ও সামাজিক পর্যায়ে পাঠাভ্যাস বাড়ানোর নানা প্রতিযোগিতা, বইমেলা এবং লাইব্রেরির সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।

পরিশেষে বলতে হয়, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের দেশ ও জাতির চালিকাশক্তি; তাদের যদি আমরা প্রযুক্তিগত দাসত্ব থেকে মুক্ত করে বইয়ের আলোর দিকে ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে আমাদের পুরো জাতিই মেধাশূন্যতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। আসুন, সচেতন হই, আজই সন্তানের হাত থেকে মোবাইল ফোনটি সরিয়ে তাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবে একটি সুন্দর বই তুলে দিই এবং তাদের সোনালী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি।

প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy