

ক্ষুদীরাম দাস :
এক.
আত্রাই নদীর জল যে দিনগুলোতে শান্ত কলকল শব্দে বয়ে যেতো, সেই দিনগুলোর কথা আজ শিবু মণ্ডলের খুব বেশি মনে পড়ে। নদীর হাওয়ায় ভেসে আসা শীতল বাতাস একসময় তার মনে আনতো এক অপরূপ আনন্দের অনুভূতির ছোঁয়া। প্রায় ১৪ বছর আগের কথা। শিবু তখন টগবগে এক যুবক। পরিশ্রমী, সৎ এবং নিজের কাজের প্রতি অগাধ নিষ্ঠাবান। কাজের তাগিদেই একদিন তার পরিচয় হয় সুচরিতা রায়ের সাথে। সুচরিতার চোখে সে দেখেছিল এক অদ্ভুত মায়াবী টান। সেই দেখা থেকেই তাদের ভালোবাসার শুভ সূচনা।

প্রেমের নদীটা সবসময় সোজা পথে চলে না। সুচরিতার পরিবার এই সম্পর্ক কোনোভাবেই মেনে নিতে চায়নি। তাদের কাছে সামাজিক মর্যাদা, জাত-পাত আর অর্থ-বিত্তই ছিলো সব। কিন্তু সুচরিতা শিবুকে মন থেকে ভালোবেসেছিলো। পরিবারের অমত আর সমাজের নানা রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে, শুধুমাত্র শিবুর ভালোবাসার টানেই সে নিজের ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে এসেছিলো। শিবুর হাতে হাত রেখে সে জীবনের নতুন পথচলা শুরু করে।
একদম সাধারণ আয়োজনে তাদের বিয়ে হয়েছিল। তারপর তারা চলে আসে নিজেদের স্বপ্নের সংসারে। ভালোবাসার ঘরে কোনো অভাব ছিল না, ছিল কেবল বেঁচে থাকার অসীম আনন্দ। শিবু দিনরাত কষ্ট করতো, খেটে খেতো কেবল স্ত্রীকে ভালো রাখার জন্য। সুচরিতাকে সে কখনো কোনো অভাব বুঝতে দেয়নি। হাটে-বাজারে ভালো কোনো খাবার দেখলে আগে স্ত্রীর জন্য নিয়ে আসতো, নতুন কোনো ভালো শাড়ি কিংবা পোশাক কিনতে পারলে আগে সুচরিতার হাসিমুখটা দেখতো। সুচরিতাও তখন বলতো, “তুমি পাশে থাকলে আমার আর কিচ্ছু চাই না।”
সংসার জীবনটা আরো রঙিন হয়ে উঠেছিলো যখন তাদের ঘরে জন্ম নেয় এক ফুটফুটে সন্তান—ছোট্ট দীপক। শিবু যেন নতুন করে বাঁচার পথ পেলো। সন্তান আর স্ত্রীকে ঘিরে তার স্বপ্নের পরিধি বাড়ে। সে ভাবতো, এই জীবনে সে খুব সুখী। মানুষের তো আর এদো কিছুর দরকার হয় না—একটু ভালোবাসা, একটু শান্তি আর আপন মানুষের হাসিমুখেই তো পরম সুখ। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, ভাগ্য সবসময় তা মেনে নেয় না। পৃথিবীর রঙের মোহে ঢাকা এই জীবনের গতি যে কতোটা অনিশ্চিত, তা শিবু তখনও বুঝতে পারেনি।
দুই.
দিনগুলো ভালোই কাটছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন শিবুর জীবনের শুভ্র আকাশটা কালো মেঘে ঢেকে গেলো।
সেদিন কাজের সূত্রে শিবুকে যেতে হয়েছিল দূর গন্তব্যে। পথে ঘটলো সেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। এক নিমেষে শেষ হয়ে গেলো শিবুর সাজানো পৃথিবী। একটি দ্রুতগামী যান শিবুর জীবনকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে চলে গেলো। বিকট শব্দ আর রক্তে ভেসে যাওয়া পথ ধরে শিবুকে যখন হাসপাতালে নেয়া হলো, তখন চিকিৎসকদের আর কিছুই করার ছিলো না।
জরুরি অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসক এসে শিবুর বৃদ্ধ বাবাকে বললেন, “ওর জীবন বাঁচাতে হলে একটা পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।”
যন্ত্রণা আর রক্তক্ষরণের মধ্য দিয়ে শিবুর একটি পা কেটে ফেলা হলো। যে শিবু নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পুরো সংসারের বোঝা টানতো, একদিনেই সে পা হারিয়ে শারীরিকভাবে একদম অক্ষম হয়ে পড়লো।
হাসপাতালের বেডে শুয়ে শিবু ভেবেছিলো, জীবনের এই সবচেয়ে কঠিন সময়ে অন্তত স্ত্রীর হাতটা সে শক্ত করে পাশে পাবে। সুচরিতা এসে তার মাথায় হাত বুলাবে, বলবে—“ভয় পেয়ো না, আমরা দু’জনে মিলে ঠিক পথ চলবো।” কিন্তু সেই আশা যে কেবলই একটা ভুল স্বপ্ন ছিলো, তা বুঝতে শিবুর বেশি সময় লাগলো না।
তিন.
সুস্থ হয়ে বা কৃত্রিম পা ছাড়াই পঙ্গু অবস্থায় শিবু যখন বাড়িতে ফিরলো, তখনই শুরু হলো আরেক এক মানসিক লড়াই। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল মানসিক যন্ত্রণা। সুচরিতার আচরণের পরিবর্তন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠলো।
আগে যে সুচরিতা সামান্য হাসিতেই ঘর ভরিয়ে রাখতো, এখন তার চোখে-মুখে কেবল বিরক্তি আর অবহেলা। শিবু যখন বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতো, সুচরিতা তখন দূরে দাঁড়িয়ে ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে থাকতো। সে বুঝতে পেরেছিলো, তার স্বামী এখন এক পঙ্গু মানুষ। এই মানুষ আর আগের মতো টাকা রোজগার করতে পারবে না, তাকে নতুন পোশাক কিনে দিতে পারবে না, কিংবা ভালো খাবার এনে দিতে পারবে না।
একদিন বিকেলে, ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের কাছে এক নীরব সন্ধ্যায় সুচরিতা শিবুর সামনে এসে দাঁড়ালো। তার চোখে কোনো কান্না ছিল না, মনে ছিল না কোনো অনুশোচনা।
সুচরিতা সোজা জানিয়ে দিলো, “আমি এই পঙ্গু মানুষের সাথে সারা জীবন কাজ করে খেতে পারবো না। তোমায় টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই।”
শিবু থমকে গিয়েছিলো। সে সুচরিতার মুখের দিকে তাকিয়ে বিশ্বাসই করতে পারছিলো না যে এই সেই নারী, যে একদিন তার ভালোবাসার টানে নিজের পরিবারকে ছেড়ে এসেছিলো।
শিবু মিনতি করেছিলো, “সুচরিতা, আমি তো ইচ্ছে করে পঙ্গু হইনি! আমরা একসাথে যুদ্ধ করবো। আমাদের তো একটা সন্তান আছে!”
কিন্তু সুচরিতা কোনো কথা শুনলো না। সে এক নির্মম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললো। শিবুকে একদম একা ও অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে সে একদিন বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। পরবর্তীতে সে অন্য এক জায়গায় বিয়ে করে নতুন করে সংসার শুরু করলো। কেবল তা-ই নয়, নিজের জন্ম দেওয়া সন্তানের থেকেও শিবুকে একদম আলাদা করে দেওয়া হলো। সন্তানকে পর্যন্ত সে শিবুর সাথে দেখা করতে দেয় না।
শিবু একা পড়ে রইলো তার শূন্য ঘরে। পা হারানোর যন্ত্রণার চেয়েও বুকে বেঁধে থাকা বিশ্বাসের ভাঙনের যন্ত্রণা তাকে তিলে তিলে শেষ করে দিতে লাগলো।
চার.
এখন শিবুর দিন কাটে চরম দুর্দশা আর অবর্ণনীয় সংকটের মধ্যদিয়ে। একদিকে পঙ্গুত্ব, অন্যদিকে বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস। আর তার ওপর রয়েছে বিশাল ঋণের বোঝা।
দুর্ঘটনার পর চিকিৎসায় বহু টাকা খরচ হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের থেকে ধার-দেনা করে প্রায় ৫ লাখ টাকা ঋণ হয়েছিল শিবুর। এই কঠিন সংকটে শিবু যখন একেবারে নিঃস্ব, তখন তার পাশে এসে দাঁড়ালেন তার বৃদ্ধ বাবা-মা আর ভাইয়েরা।
বৃদ্ধ বাবা প্রতিদিন সকালে কাজের খোঁজে বের হন, সন্তানকে একটু ভালো রাখার জন্য শেষ বয়সেও রক্ত জল করা পরিশ্রম করেন। ভাইয়েরা নিজেদের সাধ্যমতো শিবুর দেখাশোনা করেন, ওষুধ কিনে দেন। কিন্তু ৫ লাখ টাকা ঋণের বোঝা যেন এক বিশাল পাহাড়ের মতো শিবুর বুকে চেপে বসে আছে।
শারীরিক অক্ষমতার কারণে শিবু আর কোনো ভারী কাজ করতে পারে না। সে বিছানায় বসে শুধু ভাবে—এই ঋণ কিভাবে শোধ হবে?
একদিন সকালে শিবু তার বৃদ্ধ বাবাকে বললো, “বাবা, আমার জন্যে তোমাদের এই বয়সেও কষ্ট করতে হচ্ছে। আমি তো কোনো কাজের রইলাম না। এতগুলো টাকা ঋণ, আমি কি করে এটা শোধ করবো?”
বাবা কেঁদে ফেলে বললেন, “তুই বেঁচে আছিস, এটাই আমাদের বড় পাওয়া রে বাপ। টাকা-পয়সা আজ আছে কাল নেই, কিন্তু নীতি বেচে দেওয়া যায় না।”
পাঁচ.
কখনো কখনো শিবু একটু স্বস্তির খোঁজে নিজের এলাকা ছেড়ে আশেপাশের গ্রামের পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করে। বৈশাখ বা জ্যৈষ্ঠের রোদে বেতগাড়ি গ্রামের মধ্যদিয়ে যখন সে কাঠের ক্রাচে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে, তখন মানুষ তার দিকে এক করুণ দৃষ্টিতে তাকায়।
সে হেঁটে যায় ত্রিমোহনী মোড়ের দিকে। যেখানে তিন রাস্তার মোড়ে মানুষজন আড্ডা দেয়, নানা কথা বলে। শিবু একপাশে চুপচাপ বসে থাকে। সে দেখে—মানুষ কিভাবে একটু ভালো খাবার, আর একটু ভালো পোশাকের জন্য একে অন্যকে ঠকায়। কিভাবে সামান্য সুবিধার জন্যে মানুষ নিজের আপনজনকে পর করে দেয়।
ত্রিমোহনী থেকে আরো কিছুটা হেঁটে সে চলে যায় আত্রাই নদীর পাড়ে। আত্রাই নদীর হাওয়া যখন তার মুখে এসে লাগে, তখন তার মনে হয়—এই নদী তো যুগ যুগ ধরে একইভাবে বয়ে চলেছে, কিন্তু মানুষের মন এতো দ্রুত বদলে যায় কেন?
সেখানে বসে শিবু নিজের মনের সাথে কথা বলে। সে ভেবে পায় না, মানুষ কেন দুনিয়ার রঙের মোহে এতোটা অন্ধ হয়ে যায়? সামান্য একটু ভোগের জন্য, একটু বাহ্যিক সুখের জন্য মানুষ তার ভালোবাসা, মায়া ও নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়।
মানুষ মনে করে, দুনিয়াটা বুঝি চিরদিনের জন্য পাওয়ার জায়গা। সে ভুলে যায় যে তাকে একদিন মরে যেতে হবে। এই সামান্য পার্থিব চাওয়া-পাওয়ার জন্যে মানুষ বেইমানি করে। কিন্তু মৃত্যুর পর এই পোশাক, এই খাবার, এই ভোগ-বিলাসিতার তো কোনো দাম থাকবে না।
ছয়.
একদিন এক সন্ধ্যায় ডাঙ্গাপাড়া দিয়ে হেঁটে আসার সময় শিবুর সাথে দেখা হয় এক প্রবীণ বৃদ্ধের। শিবুকে ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে দেখে বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “কি ভাই, একা একা কোথায় যাচ্ছো? মনটা এতো খারাপ কেন?”
শিবু নদীর দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, “হায়রে জীবন! সময় খারাপ হলে মানুষের আসল রূপটা প্রকাশ পায়। এখন আমার আর কিছুই বলার নাই।”
বৃদ্ধ কথাটি শুনে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। শিবু বলতে লাগলো:
“দুনিয়াদারির রঙ মানুষকে বিমোহিত করে ফেলছে। নীতি-নৈতিকতা বলতে মানুষের মনে আর কিছুই নেই। মানুষ মনে করে সে কোনোদিন মরবে না। এই দুনিয়া ভোগের জন্য মানুষ অন্ধ হয়ে গেছে। অথচ সামান্য একটা জঙ্গলের মতো দেশে থেকে মানুষ মনে করে পুরো দুনিয়াটাই সে পেয়ে গেছে! মানুষ সামান্য একটু ভালো খাবার আর একটু ভালো পোশাকের জন্য বেইমানি করে। এগুলো তো সামান্য বিষয়, কিন্তু এই সামান্য চাহিদার জন্যে মানুষ দয়া, মায়া, ভালোবাসা—সব কিছু বিসর্জন দেয়!”
বৃদ্ধ শিবুর হাতটা ধরে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “সবাই তো আর একরকম হয় না রে বাবা।”
শিবু বিষণ্ন হেসে উত্তর দিলো, “এটাই হয়তো নারীদের এক ধরণের বৈশিষ্ট্য। তারা অনেকে চাপে পড়ে থেকে যায়, আবার অনেকে ভোগ-বিলাসিতার টানে থেকে যায়। সত্যিকারের বিপদে ক’জন পাশে থাকে?”
শিবু আবার নিজের ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটতে শুরু করলো। সন্ধ্যা নেমে এসেছে আত্রাই নদীর চরে। বেতগাড়ি, ত্রিমোহনী আর ডাঙ্গাপাড়ার পথগুলো আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে। শিবুর জীবনটাও হয়তো এখন এক গভীর আঁধারে ঘেরা, যেখানে ঋণের বিশাল চাপ, পঙ্গুত্বের কঠিন সত্য আর স্বজন হারানোর হাহাকার প্রতিদিন তাকে কষ্ট দেয়।
তবুও শিবু বেঁচে থাকে। সে বেঁচে থাকে নিজের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মমতায়, ভাইদের সহযোগিতায়। আর বুক ভরা এক রাশ কষ্ট নিয়ে ভাবে—সংসারের এই মোহ ও রঙ একদিন মিলিয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের করা বেইমানির দাগ কখনো মুছবে না।
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.














