গল্প: চার হাসিমুখের নারী ও এক পুরুষ

মিজানুর রহমান রানা :

ঢাকার এক পুরনো গলির ভেতরে, লাল ইটের দেয়াল ঘেরা একটি ছোট্ট বাড়ি। বাড়িটির নাম “আলোর ঠিকানা”—যেন নামেই এক ধরনের আশাবাদী ঘোষণা। এই বাড়িতে থাকে চারজন নারী, চারটি আলাদা জীবন, চারটি আলাদা গল্প, কিন্তু একটি মিল—তারা সবসময় হাসিমুখে থাকে। কেউ কেউ বলে, তাদের হাসি যেন জীবনের প্রতিকূলতাকে চূর্ণ করে দেয়। কেউ আবার বলে, এই হাসির পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর যন্ত্রণা। কিন্তু তারা নিজেরা বলে, “আমরা হাসি, কারণ আমরা বেঁচে আছি।”

প্রথম নারী—নাম তার রুবিনা। বয়স পঁয়ত্রিশ, পেশায় একজন নার্স। ছোটবেলা থেকেই মানুষের সেবা করার স্বপ্ন ছিল তার। বাবা ছিলেন রিকশাচালক, মা গৃহিণী। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার ঘাটতি ছিল না। রুবিনা স্কুলে পড়ার সময়ই বুঝে গিয়েছিল, তাকে নিজের জীবন নিজেকেই গড়তে হবে। নার্সিং কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য সে প্রতিদিন তিন ঘণ্টা হেঁটে ক্লাসে যেত। ক্লাস শেষে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত, যদি কোনো ওয়ার্ডবয় তাকে কিছু শেখায়। এই আগ্রহ দেখে একদিন এক সিনিয়র নার্স তাকে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান। সেখান থেকেই শুরু হয় তার পেশাগত জীবন।

আজ রুবিনা একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিনিয়র নার্স। রোগীদের সঙ্গে তার ব্যবহার এতই কোমল, যে অনেকে তাকে “হাসিমুখের ফেরেশতা” বলে ডাকে। কিন্তু এই হাসির পেছনে আছে এক গভীর ক্ষত। তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে, সন্তান নেই, পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন। তবু সে হাসে। কারণ তার বিশ্বাস, “যে মানুষ অন্যের ব্যথা কমায়, তার নিজের ব্যথা নিয়ে কাঁদার সময় নেই।”

দ্বিতীয় নারী—নাম তার শিউলি। বয়স ত্রিশ, পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। গ্রামের মেয়ে, কিন্তু শহরে এসে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। ছোটবেলায় তার বাবা মারা যান, মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে তাকে বড় করেন। শিউলি পড়াশোনায় ভালো ছিল, কিন্তু গ্রামের মানুষ মেয়েদের পড়াশোনায় উৎসাহ দিত না। একদিন স্কুলে শিক্ষক বলেছিলেন, “তুমি একদিন বড় শিক্ষক হবে।” সেই কথাটি তার মনে গেঁথে যায়।

শিউলি শহরে এসে একটি স্কুলে চাকরি নেয়। তার ক্লাসে শিশুরা শুধু পড়াশোনা শেখে না, শেখে ভালোবাসা, সম্মান, এবং স্বপ্ন দেখতে। সে শিশুদের বলে, “তোমরা বড় হয়ে যা-ই হও, মানুষ হও।” তার হাসি এতই প্রাণবন্ত, যে শিশুরা তাকে দেখে হাসতে শেখে। কিন্তু শিউলির নিজের জীবন সহজ নয়। সে একা থাকে, মা গ্রামে, ভাই নেই, আত্মীয়রা সম্পর্ক রাখে না। তবু সে হাসে। কারণ তার বিশ্বাস, “যে শিশুদের হাসাতে পারে, সে নিজেও হাসতে পারে।”

তৃতীয় নারী—নাম তার নাজমা। বয়স চল্লিশ, পেশায় একজন রাঁধুনি। সে “আলোর ঠিকানা”-র রান্নাঘরের দায়িত্বে। প্রতিদিন ভোরে উঠে বাজারে যায়, ফিরে এসে রান্না শুরু করে। তার হাতের রান্না এতই সুস্বাদু, যে আশেপাশের মানুষ এসে বলে, “আপনার রান্নায় মায়ের হাতের ছোঁয়া আছে।” নাজমা কোনোদিন স্কুলে যায়নি, লেখাপড়া শেখেনি, কিন্তু জীবনের পাঠ সে ভালোই শিখেছে।

নাজমার স্বামী ছিলেন একজন মাদকাসক্ত। একদিন মারধর করে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তখন তার বয়স মাত্র বাইশ। দুই সন্তানকে নিয়ে সে আশ্রয় নেয় এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখান থেকে শুরু হয় সংগ্রাম। প্রথমে বাসায় বাসায় কাজ, পরে রান্নার কাজ। আজ সে “আলোর ঠিকানা”-র প্রাণ। তার হাসি যেন প্রতিদিনের সংগ্রামকে জয় করার প্রতীক। সে বলে, “আমি হাসি, কারণ আমি হার মানিনি।”

চতুর্থ নারী অনন্যা—নামটি যেমন ব্যতিক্রম, জীবনটাও তেমনি। তার জন্ম হয়েছিল এক বর্ষার দিনে, যখন আকাশ কাঁদছিল, আর মাটিতে ছিল সজীবতা। মা বলেছিলেন, “এই মেয়েটা আলাদা হবে, তার চোখে থাকবে প্রশ্ন, আর মুখে থাকবে উত্তর।” সেই ভবিষ্যদ্বাণী যেন সত্যি হয়ে উঠেছিল।

অনন্যার শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা এক ছোট্ট গ্রামে। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক, মা একজন সেলাইশিল্পী। সংসারে অভাব ছিল, কিন্তু বইয়ের ঘ্রাণে ভরা ছিল তাদের ঘর। অনন্যা ছোটবেলা থেকেই অন্যরকম—সে খেলত না, বরং গাছের নিচে বসে পাখিদের দেখত, নদীর শব্দ শুনত, আর মায়ের সেলাইয়ের ফাঁকে গল্প খুঁজত।

স্কুলে সে ছিল মেধাবী, কিন্তু তার প্রশ্ন ছিল অস্বস্তিকর। “কেন মেয়েরা চুপ থাকে?”, “কেন গরিবদের জন্য আলাদা বই নেই?”, “কেন শিক্ষকরা শুধু পাঠ্যবই পড়ান, গল্প বলেন না?”—এইসব প্রশ্নে শিক্ষকরা বিরক্ত হতেন, কিন্তু অনন্যা থামত না। তার সাহস ছিল, কারণ সে জানত, প্রশ্ন না করলে উত্তর আসে না।

মাধ্যমিকের পর সে শহরে আসে কলেজে পড়তে। এখানে তার চোখ আরও খুলে যায়। সে দেখে, শহরের মেয়েরা সাজে, হাসে, কিন্তু ভেতরে ভাঙা। সে দেখে, ছেলেরা স্বাধীন, মেয়েরা সীমাবদ্ধ। অনন্যা সিদ্ধান্ত নেয়, সে শুধু পড়বে না, বদলাবে। সে লেখালেখি শুরু করে—ছোট গল্প, কবিতা, আর প্রতিবাদী নিবন্ধ। তার লেখায় উঠে আসে নারীর যন্ত্রণা, সমাজের দ্বিচারিতা, আর ভালোবাসার অসমতা।

একদিন তার লেখা “আমি অনন্যা” নামের একটি নিবন্ধ একটি জাতীয় পত্রিকায় ছাপা হয়। সেখানে সে লিখেছিল, “আমি সেই নারী, যে প্রেমে পড়ে, আবার প্রতিবাদও করে। আমি রান্না করি, আবার বিপ্লবও করি। আমি অনন্যা, কারণ আমি নিজেকে হারাই না।” এই লেখাটি তাকে পরিচিত করে তোলে, কিন্তু সমালোচনাও আসে। কেউ বলে, “অত্যন্ত সাহসী”, কেউ বলে, “অত্যন্ত বেয়াদব।”

অনন্যা তবু থামে না। সে একটি এনজিওতে কাজ শুরু করে, যেখানে সে গ্রামের মেয়েদের লেখাপড়া শেখায়, তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে। সে বলে, “তোমরা শুধু বাঁচবে না, তোমরা উড়বে।” তার প্রশিক্ষণে অনেক মেয়ের জীবন বদলে যায়। কেউ দোকান খোলে, কেউ স্কুলে ভর্তি হয়, কেউ স্বামীকে ছেড়ে নিজের পথ খুঁজে নেয়।

তার ব্যক্তিগত জীবনও ছিল সংগ্রামী। সে প্রেম করেছিল একজন সাংবাদিকের সঙ্গে, কিন্তু সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়, কারণ অনন্যা স্বাধীনতা চায়, আর সে চেয়েছিল নিয়ন্ত্রণ। অনন্যা কাঁদে, কিন্তু ভাঙে না। সে বলে, “ভালোবাসা যদি পাখা না দেয়, তবে তা শিকল।”

আজ অনন্যা একজন লেখিকা, সমাজকর্মী, এবং শিক্ষক। তার চোখে এখনো প্রশ্ন আছে, কিন্তু মুখে আছে আরও দৃঢ়তা। সে হাসে, কারণ সে জানে, হাসি শুধু আনন্দ নয়, এটি প্রতিরোধের ভাষা।

তার গল্প আমাদের শেখায়, নারী মানেই শুধু সহনশীলতা নয়—নারী মানে প্রশ্ন, প্রতিবাদ, এবং পুনর্জন্ম। অনন্যা সেই নারী, যে নিজের নামের মতোই অনন্য।

এই চার নারী—রুবিনা, শিউলি, নাজমা ও অনন্যা—একই ছাদের নিচে থাকে, একে অপরের বন্ধু, বোন, এবং সাহস। তারা রাতে একসঙ্গে বসে গল্প করে, হাসে, কাঁদে, আবার হাসে। তাদের হাসি শুধু মুখে নয়, হৃদয়ে। তারা জানে, জীবন সহজ নয়, কিন্তু হাসি সহজ করে তোলে।

একদিন “আলোর ঠিকানা”-তে একটি ছোট অনুষ্ঠান হয়। এলাকার কিছু মানুষ আসে, শিশুদের জন্য খাবার, গান, কবিতা। রুবিনা একটি কবিতা পাঠ করে, শিউলি শিশুদের সঙ্গে গান গায়, আর নাজমা রান্না করে। অনুষ্ঠানের শেষে এলাকার এক বৃদ্ধ বলেন, “তোমাদের হাসি আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।” এই কথাটি তিনজনের চোখে জল এনে দেয়, কিন্তু তারা আবারও হাসে।

এই গল্প শুধু চার নারীর নয়, এটি হাজারো নারীর, যারা প্রতিদিন সংগ্রাম করে, হাসে, এবং অন্যকে হাসায়। তাদের হাসি কোনো সাজানো মুখ নয়, এটি জীবনের গভীর থেকে উঠে আসা এক আলোকরেখা। তারা প্রমাণ করে, হাসি শুধু আনন্দের নয়, এটি শক্তির, সাহসের, এবং জীবনের প্রতীক।

“আলোর ঠিকানা” আজ একটি আশ্রয়স্থল নয়, এটি একটি প্রতীক—যেখানে হাসিমুখের নারীরা জীবনকে জয় করে। তাদের গল্প আমাদের শেখায়, কষ্ট থাকবেই, কিন্তু হাসি হারিয়ে গেলে জীবন থেমে যায়। তাই তারা হাসে, আমরা দেখি, এবং ভাবি—আমরাও কি এমনভাবে হাসতে পারি?

চারজন নারী—রুবিনা, শিউলি, নাজমা, এবং অনন্যা—তাদের হাসিমুখে জীবনকে জয় করার গল্পে একদিন যুক্ত হয় আরেকটি মুখ। তার নাম ইরফান। তিনি ছিলেন একজন সমাজবিজ্ঞানী, যিনি শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে মানুষের গল্প খুঁজে বেড়াতেন। তার বিশ্বাস ছিল, “মানুষের মুখে হাসি ফিরিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে বড় সমাজবদল।”

ইরফান প্রথম “আলোর ঠিকানা”-তে এসেছিলেন একটি গবেষণার কাজে। তিনি শুনেছিলেন, এখানে কিছু নারী আছেন, যারা নিজের জীবনকে নতুনভাবে গড়েছেন। তিনি এসেছিলেন তাদের গল্প শুনতে, কিন্তু থেকে গিয়েছিলেন তাদের পাশে দাঁড়াতে।

প্রথম দিনেই তিনি লক্ষ্য করেন, রুবিনার চোখে ক্লান্তি, শিউলির কণ্ঠে প্রশ্ন, নাজমার হাতে ব্যথা, আর অনন্যার লেখায় আগুন। তিনি বুঝে যান, এরা শুধু সংগ্রামী নারী নয়, এরা সমাজের আয়না। তিনি তাদের সঙ্গে বসে গল্প করেন, প্রশ্ন করেন, আবার চুপচাপ শুনে যান।

রুবিনার সঙ্গে তিনি হাসপাতালের রোগীদের জন্য একটি স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মসূচি শুরু করেন। শিউলির সঙ্গে শিশুদের জন্য একটি “স্বপ্ন পাঠশালা” গড়ে তোলেন, যেখানে শিশুরা শুধু পড়াশোনা নয়, জীবন শেখে। নাজমার রান্নাকে কেন্দ্র করে একটি “নারী উদ্যোক্তা” প্রকল্প শুরু করেন, যেখানে আশেপাশের নারীরা রান্না শিখে আয় করতে পারে। আর অনন্যার লেখাকে কেন্দ্র করে একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন, যেখানে নারীরা নিজেদের গল্প লিখে প্রকাশ করতে পারে।

ইরফান কখনো সামনে আসেন না, তিনি থাকেন পাশে। তিনি বলেন, “আমি তোমাদের টেনে তুলছি না, আমি শুধু পাশে দাঁড়াচ্ছি, যাতে তোমরা নিজেরাই উঠে দাঁড়াতে পারো।” তার এই ভঙ্গি নারীদের মনে আস্থা জাগায়। তারা বুঝে যায়, সহযোগিতা মানে করুণা নয়, সম্মান।

একদিন অনন্যা তাকে জিজ্ঞেস করে, “আপনি কেন আমাদের পাশে থাকেন?” ইরফান উত্তর দেন, “কারণ তোমাদের হাসি আমাকে বদলে দিয়েছে। আমি এখন শুধু সমাজবিজ্ঞানী নই, আমি একজন শিখতে থাকা মানুষ।”

“আলোর ঠিকানা” এখন শুধু একটি বাড়ি নয়, এটি একটি আন্দোলন। রুবিনা, শিউলি, নাজমা, অনন্যা, এবং ইরফান—পাঁচজন মানুষ, যারা একে অপরকে বদলে দিয়েছে, এবং সমাজকে নতুনভাবে ভাবতে শিখিয়েছে।

তাদের গল্প আমাদের শেখায়, পরিবর্তন আসে যখন কেউ পাশে দাঁড়ায়, হাত বাড়ায়, এবং সম্মান করে। ইরফান সেই পুরুষ, যিনি নারীদের শক্তিকে ভয় পান না, বরং তাকে সম্মান করেন। তিনি প্রমাণ করেন, সহযোগিতা মানে নেতৃত্ব নয়, বরং সহযাত্রা।

বুধবার, ০১ অক্টোবর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy