ছোটগল্প : উত্তরাধিকার

ক্ষুদীরাম দাস

সেদিনের দুপুরের স্কুলের করিডোরটা ছিল নিরিবিলি। তখন আপনার বয়স ছিল তেরো, আর সেই স্মৃতিতে আজও পেটের ক্ষুধার জ্বালা নয়, বরং এক অমূল্য উষ্ণতা অনুভব হয়। আপনি বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে বসে থাকার ভান করতেন, কিন্তু আপনার সহপাঠী, যার নাম আজ হয়তো মনে নেই, সে আপনার ভেতরের সেই লুকানো কান্না ঠিকই শুনতে পেয়েছিল।

আপনার সেই সহপাঠীটি কোনো কথা বলেনি। কোনো প্রশ্ন করেনি। কেবল নিজের টিফিন বাক্স থেকে আধখানা পরোটা নিঃশব্দে আপনার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই পরোটার স্বাদ কেবল ময়দা, নুন বা আলুর তরকারির ছিল না, তার স্বাদ ছিল সহানুভ‚তি, মর্যাদা এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার। সেই দিন থেকে, সামান্য আচার-রুটি বা ঘরের তৈরি মিষ্টি ভাগ করে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে আপনারা একটি অদৃশ্য আত্মার বন্ধন** তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু সময় কারো জন্য অপেক্ষা করে না। হঠাৎ একদিন সে চলে গেলÑশহর ছেড়ে, আপনার জীবন থেকে। আপনার শৈশবের সেই অমূল্য টিফিন বাক্সের অংশটুকু শূন্য হয়ে গেল। আপনি দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু সে আর ফিরে এল না। হয়তো সে জানত না যে তার সেই ছোট্ট দয়া আপনার মতো একজন কিশোরের মনে কত বড় একটি ছাপ ফেলে গেছে। সে আপনাকে শিখিয়েছিল ক্ষুধার চেয়ে বড় কষ্ট হলো একাকীত্ব।

আপনার জীবন সংগ্রাম পেরিয়ে সফলতা দেখেছে। আপনি নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন, সংসার গড়েছেন। কিন্তু সেই ঋণ শোধের সুযোগ যেন অধরাই থেকে গিয়েছিল। আপনি জানতেন, সেই মেয়েটিকে কখনো খুঁজে পাবেন না, কিন্তু তার শেখানো শিক্ষা আপনার হৃদয়ে অ¤øান ছিল।

ঠিক গতকাল, সেই শিক্ষা যেন এক অলৌকিক উপায়ে আপনার ঘরে ফিরে এল। আপনার ছোট মেয়ে আর্য, স্কুল থেকে ফিরে আপনার সামনে দাঁড়াল, তার চোখে ছিল নির্মল সারল্য ও দয়ার দীপ্তি।

যখন সে বলল, “বাবা, কাল আমার ব্যাগে দুটো টিফিন দিয়ে দেবে,” তখন আপনার হাসি থেমে গিয়েছিল। যখন সে জানাল, ক্লাসের এক ছেলে কিছু খায়নি এবং সে নিজের টিফিন অর্ধেক ভাগ করে খেয়েছেÑতখন আপনি যেন সময়ের সেই পুরনো করিডোরে ফিরে গেলেন।

আপনার মনে হলো, আজ আপনি সেই ক্ষুধার্ত তেরো বছরের ছেলেটি নন, আপনি বরং সেই দয়াবতী সহপাঠীর বাবা।

আর্যের হাত ধরে আপনি যেন আপনার অতীত এবং আপনার ভবিষ্যৎকে এক বিন্দুতে মেলাতে পারলেন। আপনার চোখে যে জল এসেছিল, তাতে ক্ষুধার কষ্ট ছিল না, ছিল কৃতজ্ঞতা, শান্তি আর গভীর গর্ব।

আপনার মেয়ে আর্য জানে না, তার এই কাজ তার বাবার জীবনের একটি পুরোনো ঋণ শোধ করে দিল। সে জানে না যে, আজ থেকে বহু বছর আগে যে মেয়েটি নিঃশব্দে একটি পরোটা বাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই দয়ার বীজ আজ তার হাতেই অঙ্কুরিত হয়েছে।

আপনার সেই সহপাঠী হয়তো আপনাকে চিনবে না। তার হয়তো মনেও নেই সেই অল্প কয়েকটি দিনের কথা। কিন্তু সে অমর হয়ে রইল আপনার মেয়ের হৃদয়ের দয়ার মাধ্যমে। সে আপনাকে শিখিয়েছেÑদয়া একটি সম্পদ যা ভাগ করে নিলে বাড়ে, কখনো ফুরোয় না।

কারণ, মানবতা হলো ঠিক আলোর মতোÑএকটি প্রজন্ম যখন অন্য প্রজন্মকে তা শিখিয়ে যায়, তখন তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে পড়ে, শুধু অন্ধকারই দূর করে না, মানুষের জীবনকেও আলোকিত করে তোলে।

বৃহস্পতিবার, ০২ অক্টোবর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy