

ক্ষুদীরাম দাস
বিকেল হয়ে এসেছে। স্কুল ছুটির পর রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে আছে ছোট্ট রাহুল। বয়স নয়-দশের বেশি হবে না। ছেঁড়া জামা, ময়লা মুখ, হাতে এক গুচ্ছ ফুলÑলাল-নীল-হলুদ গাঁদা ফুল দিয়ে বানানো মালা। হাঁটাচলা করা মানুষদের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে সে। মাঝে মাঝে কেউ কিনে নেয়, বেশিরভাগই এড়িয়ে চলে।

আকাশে মেঘ জমেছে, হয়তো বৃষ্টি নামবে। রাহুলের চোখেও মেঘ, কারণ আজ সকাল থেকে মাত্র একটা মালা বিক্রি হয়েছে।
হঠাৎ পাশের রাস্তায় একটা গাড়ি থামে। গাড়ি থেকে নামল একটি ছোট মেয়ে, বয়স সাত-আট। পরনে স্কুল ড্রেস, চোখে বড় চশমা, হাতে মা’র হাত ধরা। নাম তার ইরা।
ইরা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাহুলের দিকে। তার পর মা’কে টেনে নিয়ে এল রাহুলের কাছে।
Ñ “মা, ওর ফুলগুলো কেমন সুন্দর না?”
রাহুল একটু কৌত‚হলী হয়ে তাকাল। সাধারণত এই বয়সের শিশুরা ওকে ভয় পায়, দূরে থাকে। কিন্তু ইরার চোখে ছিল কৌত‚হল, না-ভয়ের কোনো ছায়া।
মা কিছু বলার আগেই ইরা নিজের জমানো পকেটমানি থেকে পাঁচ টাকা বের করে রাহুলকে দিল, বলল, “একটা মালা দাও তো।”
রাহুল অবাক হয়ে মালা এগিয়ে দিল। কিন্তু ইরা সেটা নিজের গলায় না পরে বলল,
Ñ “তুমি মাকে একটা দাও, একটা তুমি রাখো। খুব সুন্দর বানিয়েছ।”
মা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হেসে বললেন, “কিন্তু তুমি রাখলে না কেন, মা?”
ইরা বলল, “ওর দরকার আমার চেয়েও বেশি। আমি তো রোজ খেলনা পাই, ও রোজ হয়তো খায় না।”
রাহুল প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারছিল না। কিন্তু ইরার মুখে একটুও করুণা ছিল না, ছিল বন্ধুত্ব। অনেক দিন পর কেউ তার দিকে তাকিয়ে হাসল, তাকে ‘অন্য’ মনে করল না।
সেদিনের সেই ছোট্ট ঘটনার পর, রাহুল ঠিক করলÑসে স্কুলে যাবে। সে রাতে নিজের মাকে বলল, “আমি লেখাপড়া শিখতে চাই, যাতে বড় হয়ে ইরার মতো কারো পাশে দাঁড়াতে পারি।”
আজ অনেক বছর কেটে গেছে।
রাহুল এখন একটি এনজিও-র প্রতিষ্ঠাতা, যার নাম “ছায়া”Ñসবাইকে ছায়া দেওয়ার অঙ্গীকার। পথশিশুদের জন্য কাজ করে সে, তাদের শিক্ষাদান করে, খাবার ও বস্ত্র দেয়। হাজার হাজার রাহুল আজ নতুন স্বপ্ন দেখছে।
এবং প্রতিটি অনুষ্ঠানে রাহুল গলায় একটি গাঁদার মালা পরে। কেউ যখন এর কারণ জিজ্ঞেস করে, সে শুধু বলেÑ
“একদিন, একটা ছোট্ট মেয়ে আমাকে একটা মালা দিয়েছিল। আর সাথে দিয়ে গিয়েছিল দয়া, আশ্রয়, আর একটা নতুন জীবন।”
এই গল্প আমাদের শেখায়: ছোট ছোট কাজ, একটা ছোট্ট হাসি, একটা সহানুভ‚তির চোখÑএগুলো কখনো ছোট হয় না। এগুলো কারো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। হয়তো আপনি ভুলে যাবেন, কিন্তু যার জীবনে আলো জ্বালান, সে আজীবন মনে রাখবে।
মানবতা কখনও মরে নাÑএটা শুধু এক হাত থেকে আরেক হাতে ছড়িয়ে পড়ে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
বৃহস্পতিবার, ০২ অক্টোবর ২০২৫














