

বিনোদন প্রতিবেদক :
বাংলাদেশের ছোট পর্দায় এক উজ্জ্বল নাম জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। শিশুশিল্পী হিসেবে যাত্রা শুরু করে, নাচ-গান-আবৃত্তির মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী আজ নাট্যজগতে একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী। তাঁর অভিনয়জীবনের প্রতিটি ধাপে রয়েছে আবেগ, নিষ্ঠা এবং আত্মনিবেদন। এই ফিচারে আমরা হিমির বর্তমান অভিনয়যাত্রা, চরিত্র নির্বাচনের দর্শন, শিল্পীসত্তার গভীরতা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করব।

শৈশবের শিল্পচর্চা থেকে পেশাদার অভিনয়ে উত্তরণ
হিমির শৈশব কেটেছে কচিকাঁচা ও ছায়ানটের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে। বিটিভির শিশুতোষ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর পর্দায় আসা। নাচ দিয়ে শুরু, এরপর মডেলিং, তারপর অভিনয়—এই ধারাবাহিকতায় তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চরিত্রে ঢুকে পড়ার অভ্যাস ছিল তাঁর ছোটবেলার খেলা, যা আজ তাঁর পেশার ভিত্তি।
বর্তমান নাট্যজগতে সক্রিয়তা
২০২৫ সালে হিমি বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত অভিনেত্রী। সারা বছর জুড়ে একক ও ধারাবাহিক নাটকে তাঁর উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সম্প্রতি মোশাররফ করিমের সঙ্গে একাধিক নাটকে অভিনয় করেছেন, যেখানে তিনি ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। এক নাটকে তিনি ঠান্ডা মেজাজের চরিত্রে, অন্যটিতে ঝগড়াটে স্বভাবের নারী হিসেবে, আবার আরেকটিতে চঞ্চল ও হাস্যরসাত্মক ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
একটি নাটকে তাঁর চরিত্র এমন যে, তিনি ও মোশাররফ করিম এত ভালো ঝগড়া করেন যে তাঁদের ভাড়া করে নেওয়া হয় ঝগড়া করার জন্য। এই ধরনের ব্যতিক্রমী গল্পে অভিনয় করে হিমি প্রমাণ করেছেন, তিনি শুধু সৌন্দর্যনির্ভর নন, বরং অভিনয়গুণে পরিপূর্ণ একজন শিল্পী।
চরিত্র নির্বাচনে সচেতনতা ও বৈচিত্র্য
হিমি চরিত্র নির্বাচনে অত্যন্ত সচেতন। তিনি বলেন, “আমি এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই যা আমাকে চ্যালেঞ্জ করে, আমাকে নতুন কিছু শেখায়।” দর্শক তাঁকে ঝগড়াটে চরিত্রে বেশি দেখলেও তিনি এখন সফট, ঠান্ডা মেজাজের চরিত্রে অভিনয় করছেন, যাতে তাঁর অভিনয়ের পরিসর আরও বিস্তৃত হয়।
একটি নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন এমন এক নারীর চরিত্রে, যার স্বামী প্রথমবার দেশের বাইরে যাচ্ছে। সেই সুবাদে গ্রাম থেকে ঢাকায় আসা, নানা বিড়ম্বনা, দালালের খপ্পরে পড়া—এইসব অভিজ্ঞতা নিয়ে নাটকটি নির্মিত হয়েছে। এই ধরনের গল্পে অভিনয় করে তিনি সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।
অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা ও আত্মনিবেদন
হিমি বলেন, “শুধু টাকার জন্য নয়, ভালোলাগা থেকে অভিনয় করি।” তিনি গভীর রাত পর্যন্ত শুটিং করলেও ক্লান্তি অনুভব করেন না। তাঁর মতে, “অভিনয় আমার কাছে ন্যাচারাল। ছোটবেলা থেকেই এটা আমার ভেতরে ছিল।” তিনি নিজের কাজ নিয়মিত দেখেন, ভুলগুলো খুঁজে বের করেন এবং নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা করেন।
এই আত্মসমালোচনার অভ্যাসই তাঁকে একজন পরিপূর্ণ শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলছে। তিনি বলেন, “প্রথমদিকে কাজ কম পেয়েছি, তখনও ইনকামের চিন্তা মাথায় আসেনি। এখন পেশাদার অভিনয়শিল্পী, কাজ করলেও অনুভূতি একই।”
সহশিল্পীদের সঙ্গে রসায়ন ও শেখার অভিজ্ঞতা
মোশাররফ করিমের সঙ্গে কাজ করে হিমি অনেক কিছু শিখেছেন। তিনি বলেন, “মোশাররফ ভাই ছকেবাঁধা মানুষ নন। একেক গল্পে, একেক দৃশ্যে একেক রকম তিনি। তাঁর সঙ্গে কাজ করতে করতে কিছু বিষয় এমনিতেই নিজের মধ্যে চলে আসে।” প্রথমদিকে তাঁর সঙ্গে অভিনয়ে নার্ভাস হয়ে যেতেন হিমি, কারণ ছোটবেলা থেকেই তাঁর কাজ দেখে বড় হয়েছেন।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা
হিমি ভবিষ্যতে আরও বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করতে চান। তিনি চান এমন গল্পে কাজ করতে যা সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরে, মানুষের অনুভূতিকে স্পর্শ করে। তাঁর প্রিয় অভিনেত্রী শাবানা, এবং তিনি জয়া আহসান ও নুসরাত ইমরোজ তিশার কাজকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন। এই তিনজনের কাজ তাঁকে অনুপ্রাণিত করে এবং তাঁর অভিনয়জীবনের মানদণ্ড স্থির করতে সাহায্য করে।
শিল্পীসত্তা ও দর্শকদের সঙ্গে সম্পর্ক
হিমি মনে করেন, তাঁর প্রতিটি কাজই তাঁর ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “একটা নির্দিষ্ট নাটক নয়, বরং আমার সব কাজই আমাকে আজকের জায়গায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।” তিনি দর্শকদের সঙ্গে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।
জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি আজকের দিনে একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী, যিনি অভিনয়কে শুধু পেশা নয়, বরং ভালোবাসা ও দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। তাঁর প্রতিটি চরিত্রে থাকে আবেগ, বাস্তবতা এবং শিল্পের ছোঁয়া। নতুন প্রজন্মের অভিনেত্রীদের মধ্যে তিনি একজন অনুকরণীয় নাম, যাঁর প্রতিটি কাজ আমাদের নাট্যজগৎকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
এই ফিচারটি তাঁর বর্তমান অভিনয়জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেছে। তাঁর ভবিষ্যৎ যাত্রা নিশ্চয়ই আরও বিস্তৃত, আরও বৈচিত্র্যময় হবে—যেখানে তিনি নিজেকে আরও নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন এবং দর্শকদের আরও গভীরভাবে ছুঁয়ে যাবেন।
রোববার, ০৫ অক্টোবর ২০২৫














