ছোটগল্প : দোষের ছায়া

ক্ষুদীরাম দাস :

মায়াপুর গ্রামে ছিল নদীর কোল ঘেঁষে একটা ছোট্ট বসতি। সেখানে থাকত সাধন, এক দিনমজুর। তার ছোট্ট মাটির ঘর আর এক টুকরো জমি ছিল তার সংসারের ভরসা। গ্রামের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন জমিদার রশিদ চৌধুরী। তার বিশাল হাভেলি আর গ্রামের অর্ধেক জমির মালিকানা তাকে প্রায় রাজার মর্যাদা দিয়েছিল। তার একমাত্র ছেলে রুবেল ছিল বখাটে, কিন্তু তার দোষ কেউ মুখ ফুটে বলার সাহস পেত না।

এক বছর গ্রামে মেলা বসেছিল। সাধন তার জমিতে ফলানো কিছু শসা আর কুমড়ো মেলায় বিক্রি করতে নিয়ে গিয়েছিল। দিনশেষে ভালো বিক্রি হয়ে তার মুখে হাসি ফুটেছিল। কিন্তু রাতে মেলা থেকে ফেরার পথে রুবেল আর তার বন্ধুরা মদ্যপ অবস্থায় সাধনের গাড়ির ওপর হামলে পড়ল। তারা হাসতে হাসতে সাধনের শসা-কুমড়ো ছুঁড়ে ফেলল, কিছু পিষে ফেলল। সাধন বাধা দিতে গেলে রুবেল তাকে ধাক্কা দিয়ে বলল, “চুপ থাক, গরিব! এইটুকুতে কী হয়েছে?”

পরদিন সাধন গ্রামের পঞ্চায়েতে গিয়ে বিচার চাইল। গ্রামের মানুষ জড়ো হলো, কিন্তু রশিদ চৌধুরীর সামনে কারোর মুখ খোলার সাহস হলো না। রশিদ চৌধুরী হেসে বললেন, “আরে, রুবেল তো তরুণ ছেলে, মজা করেছে একটু। তুমি এত কথা বাড়াচ্ছ কেন, সাধন? তুমি নিশ্চয়ই গাড়ি ঠিকমতো বাঁধোনি, তাই মাল পড়ে গেছে।” গ্রামের কিছু লোকও বলে উঠল, “হ্যাঁ, সাধন, তুমি সাবধান হলে এমন হতো না।”

সাধনের চোখে জল এলো। তার সারা বছরের শ্রম মাটিতে মিশে গেল, কিন্তু দোষ তারই হলো। রুবেলের কোনো শাস্তি হলো না। গ্রামের মানুষ ফিসফিস করে বলল, “প্রভাবশালীদের দোষ কখনো ধরা পড়ে না। দোষ তো সবসময় গরিবের।”

কয়েক মাস পর, রশিদ চৌধুরীর গোয়ালে আগুন লাগল। গ্রামের লোকেরা বলল, এটা দুর্ঘটনা। কিন্তু গ্রামের এক বুড়ো কাঠুরে, যিনি সব দেখেও চুপ থাকতেন, সাধনকে বললেন, “বাবা, এই দুনিয়ায় প্রভাবশালীদের ভুল মাফ হয়, আর গরিবের কপালে দোষ চাপে। তবে মনে রাখ, সময় সব হিসেব বুঝিয়ে দেয়।”

সাধন হাল ছাড়ল না। সে অন্যের জমিতে কাজ করে, ধার করে নতুন বীজ কিনল। তার কঠোর পরিশ্রমে পরের বছর আবার ফসল ফলল। গ্রামের মানুষ তার সততা দেখে ধীরে ধীরে তার পাশে দাঁড়াল। আর রুবেলের দুষ্টুমি গ্রামের মানুষের মনে প্রশ্ন জাগালÑপ্রভাবশালী হলেও কি সব দোষ মাফ করা উচিত?

মঙ্গলবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৫

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময় ও চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy