ছোটগল্প : মায়ার খেলা

ক্ষুদীরাম দাস :

জীবন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা। যেখানে হিসাব মেলাতে গিয়ে মানুষ বারবার ভুল অঙ্কে আটকে যায়। কখনো রক্ত সম্পর্কের টান তুচ্ছ হয়ে যায় জেদের কাছে, কখনো আবার সাতপাক ঘুরে আসা সম্পর্কের মায়া সবটুকুকে ছাপিয়ে একা একাই মহাপ্রলয় সামলিয়ে নেয়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের করিডোরে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। ঘড়ির কাঁটা তিনটের ঘর ছুঁইছুঁই। হাসপাতালের হলদেটে আলোয় সাদা চাদরে ঢাকা দেহটির পাশে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব প্রমিলা বালা। তার স্বামীর নাম নিতাই বাবু। মাত্র আধা ঘণ্টা আগে ডাক্তার যখন নিতাই বাবুর বুকের ওপর থেকে স্টেথোস্কোপ তুলে নিয়ে মাথা নাড়লেন, তখন প্রমিলা বালার পৃথিবীটা এক মুহূর্তে থমকে গিয়েছিলো।

ঘটনার সূত্রপাত দিন চারেক আগে। নিতাই বাবুর শ্বাসকষ্ট হঠাৎ বেড়ে গিয়েছিলো। বড় ছেলে সুবল থাকে সৌদি আরবে। ফোনে খবর শুনে সে সাফ জানিয়ে দিলো, “বাবারে হাসপাতালে নাও। যতো টাকা লাগে আমি দেবো।” কিন্তু ছোট ছেলে বিমল, যে কি না বাড়িতেই থাকে, তার প্রবল আপত্তি। তার মতে, “বাপের বয়স হয়েছে, বাড়িতেই সেবা-শুশ্রƒষা করো। হাসপাতালে নিলে শুধু শুধু ভোগান্তি আর কাড়িকাড়ি টাকা খরচ।”

সুবল সৌদি থেকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও কলে ধমক দিয়েছিলো বিমলকে। বাধ্য হয়েই বিমল তার বাবাকে হাসপাতালে এনেছিলো, কিন্তু মনে মনে একটা গভীর ক্ষোভ পুষে রেখেছিলো। হাসপাতালে ভর্তির পর সে একবারও ভেতরে ঢোকেনি। মায়ের কাছে বাবার খারাপ অবস্থার খবর শুনে বিমল তার চিরচেনা সেই কর্কশ গলায় উত্তর দিয়েছিলোÑ “আমি তো হাসপাতালে নিতে বলিনাই। সৌদি থিকা আইসা বাপেরে দেইখা যাইতে কও! আমারে আর বিরক্ত করো না।”

প্রমিলা বালা সেই থেকে একা। হাসপাতালের ওয়ার্ডের কোণায় একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছেন তিনি। আজ যখন নিতাই বাবুর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পর বিমলকে ফোন করা হলো, সে ফোন ধরেনি। আত্মীয়-স্বজন? তাদের অনেকের কাছেই খবর পাঠানো হয়েছে। কিন্তু উত্তর এসেছে হতাশাজনক। নিতাই বাবুর এক ছোট ভাই সোজাসুজি জানিয়ে দিয়েছেÑ “যখন আমাদের প্রয়োজন ছিলো, তখন নিতাই তো বড়াই করে আমাদের দূর করে দিয়েছিলো। এখন লাশ নিতে গেলে যদি দু’ পয়সা খরচ করতে হয়, সেই ঝুঁকি কে নেবে?”

আমি ডিউটি ডক্টর হিসেবে রাউন্ডে ছিলাম। ওয়ার্ড থেকে বের হওয়ার সময় দেখি প্রমিলা বালা পাথরের মতো লাশের শিয়রে বসে আছেন। কোনো কান্নাকাটি নেই, কোনো হাহাকার নেই। শুধু চোখ দু’টি কোটরাগত।

আমাকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ডাক্তার বাবু, কয়টা বাজে? আজান দিতে আর কতোক্ষণ?”

আমি হাতের ঘড়ি দেখে বললাম, “বেশি না মা, আর দু’-আড়াই ঘণ্টা বাকি।”

শুনেই ভদ্রমহিলা আমার হাত দু’টি আকড়ে ধরলেন। তার হাতের স্পর্শে এক তীব্র অসহায়ত্ব। তিনি মিনতি করে বললেন, “আমারে হাসপাতাল থেকে বাইর করে দিয়েন না বাবা। সকাল হইলেই ভ্যান নিয়া চইলা যামু। এখন গেলে তো মাঝপথে বিপদ হবে। কোনো চেনা মুখ নাই আমার সাথে।”

একজন শোকার্ত নারীকে সান্ত¡না দেয়ার মতো ভাষা আমার জানা ছিলো না। যার স্বামী পাশে মৃত পড়ে আছে, অথচ যে নারী শোক প্রকাশের চেয়ে বেশি ভয় পাচ্ছে সমাজ আর একাকীত্বের অন্ধকারকে, তার বেদনা কতোটা গভীর হতে পারে? আমি শুধু তার মাথায় হাত রেখে বললাম, “থাকেন। কোনো সমস্যা নাই।”

ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়ালাম। হাসপাতালের নিস্তব্ধতায় আশি বছরের ওই মৃত বৃদ্ধের মুখটা ভেসে আসছিলো। যতোবার ভাবছি, ততোবারই মনে হচ্ছে জীবন কতোটা নিষ্ঠুর হতে পারে! যে নিতাই বাবু সারা জীবন খেটে খেয়েছেন, জমি জিরাত করেছেন, দু’ ছেলেকে মানুষ করেছেন, আজ তার শেষ যাত্রার সময় পাশে কেউ নেই।

সুবল সৌদি আরব থেকে ফিরতে পারবে না। বিমল জেদ ধরে বাড়িতে বসে আছে। অথচ এই ছেলেরাই এক সময় নিতাই বাবুর কাঁধে চড়ে মেলায় যেতো। প্রমিলা বালা একা একা লাশের সাদা কাপড় ঠিক করে দিচ্ছেন। মাঝে মাঝে বিড়বিড় করে কী যেন প্রার্থনা করছেন। আবার পরক্ষণেই অঝোরে কাঁদছেন। তার কান্নার শব্দ করিডোরের দেয়ালে লেগে প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করছে।
আমি ভাবলাম, আমরা এই জীবন নিয়ে কতো বড়াই করি! কতো অহংকার! অথচ আমাদের শেষ মুহূর্তের গন্তব্য একমুঠো ছাই অথবা সাড়ে তিন হাত মাটি। দাফন-কাফন বা সৎকারের কোনো নিশ্চয়তাও কি আমাদের আছে? এই যে নিতাই বাবু, কাল সকালে কি কোনো আত্মীয় আসবে তার শেষ কাজে হাত লাগাতে? নাকি কোনো সৎকার সমিতির লোক এসে বেওয়ারিশের মতো শ্মশানে নিয়ে যাবে?

ভোর হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে চারপাশ কেমন মায়াবী হয়ে ওঠে। আজানের সুর ভেসে এলো পাশের মসজিদ থেকে। প্রমিলা বালা তখনও বসে আছেন। তিনি যেন জেগে জেগে এক দুঃস্বপ্ন দেখছেন। আমি তাকে এক গøাস জল নিয়ে এগিয়ে দিলাম।

তিনি জলটুকু খেয়ে বললেন, “জানেন ডাক্তার বাবু, নিতাই সবসময় বলতোÑ ‘ছেলেরা আছে, ভাবনা কী!’ আজ বুঝলাম, রক্তের বাঁধন কতোটা হালকা। মানুষ একা জন্মায়, একাই মরে। মাঝখানে মায়ার খেলা।”

সকাল হতে না হতেই প্রমিলা বালা তার স্বামীর নিথর দেহটি একটি ভ্যানে তুলে নিলেন। একা। কোনো ঢাক-ঢোল নেই, কোনো কান্নাকাটির ভিড় নেই। ভ্যানটি যখন হাসপাতালের গেট দিয়ে বের হয়ে গেলো, তখন মনে হলো এক বিশাল পাহাড় যেন এক বৃদ্ধা নারীর কাঁধে ভর করে এগিয়ে চলেছে।

আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবলাম, এই জীবনের যতো জাঁকজমক, যতো জৌলুসÑ সব তো মিথ্যে। আসল সত্য তো ওই ধূলিময় পথটি, যেখানে একা একা চলে যেতে হয়। কারো জন্যে কেউ নেই, থাকার গ্যারান্টিও নেই। আমরা শুধু সময়ের যাত্রী মাত্র।

হাসপাতালের সেই করিডোরটি এখন খালি। নিতাই বাবুর ব্যবহৃত বেডটি পরিষ্কার করা হয়েছে। নতুন রোগী আসবে। আবার কেউ মরবে, কেউ বাঁচবে। কিন্তু প্রমিলা বালার সেই করুণ আকুতিÑ “আমারে হাসপাতাল থেকে বাইর করে দিয়েন না”Ñ আমার কানে সারাক্ষণ বাজতে থাকবে।

জীবন এতোটা নিষ্ঠুর না হলে হয়তো মানুষের এই বড়াইটুকুও থাকতো না। আমরা কি সত্যিই জানি, মৃত্যুর পর আমাদের কপালে শেষ কাজটুকু জুটবে কি না? যতোটা সময় আমরা একে অপরকে অবজ্ঞা করি, ততোটা সময় যদি একটু ভালোবাসতাম, তবে হয়তো নিতাই বাবুর মতো কাউকে এমন নিঃসঙ্গ হয়ে বিদায় নিতে হতো না।
আহারে জীবন! অথচ কী অসার এ অহংকার!

 

প্রকাশিত/ মঙ্গলবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy