

জিল্লুর রহমান, সিরাজগঞ্জ থেকে :
সিরাজগঞ্জ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও পরিবহন কেন্দ্র। ঢাকা-উত্তরবঙ্গ মহাসড়কের অন্যতম ব্যস্ততম অংশে প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহন চলাচল করে। এই যানবাহনের চালকরা দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালান, তাদের বিশ্রামের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন একটি বিস্রামাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেয় সরকার। প্রায় ৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ট্রাক চালকদের বিস্রামাগারটি একসময় আশার আলো হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ সেই স্থাপনা পরিণত হয়েছে মাদকসেবিদের আডাখানায়। এই পরিবর্তন শুধু একটি স্থাপনার পতন নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশে সড়ক পরিবহন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিন হাজার হাজার ট্রাক চালক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পণ্য পরিবহন করেন। তাদের জন্য নিরাপদ বিশ্রামাগার নির্মাণের দাবি দীর্ঘদিনের। সিরাজগঞ্জে মহাসড়কের পাশে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিস্রামাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সড়ক ও জনপথ বিভাগ। প্রকল্পে ছিল চালকদের জন্য শোবার জায়গা, খাবারের ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, এমনকি বিনোদনের জন্য টেলিভিশন ও পাঠাগার। উদ্দেশ্য ছিল চালকদের ক্লান্তি দূর করা, নিরাপদে বিশ্রাম নেওয়া এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমানো।
প্রকল্প শেষ হওয়ার পর স্থানীয় মানুষ ও চালকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তারা ভেবেছিল, অবশেষে একটি জায়গা পেল যেখানে নিরাপদে বিশ্রাম নেওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন পথে মোড় নেয়। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে বিস্রামাগারটি ধীরে ধীরে অব্যবহৃত হয়ে পড়ে। চালকরা সেখানে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন, কারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল ছিল। ধীরে ধীরে জায়গাটি মাদকসেবিদের দখলে চলে যায়।
বর্তমানে বিস্রামাগারটি রাতের বেলা মাদকসেবিদের আড্ডায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যা নামলেই সেখানে জড়ো হয় মাদকসেবিরা। গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের মাদক সেখানে সেবন করা হয়। অনেক সময় সেখানে ঘটে চুরি, ছিনতাই ও মারামারির মতো ঘটনা। ফলে সাধারণ মানুষ ও চালকরা বিস্রামাগার থেকে দূরে থাকেন। যে স্থাপনা চালকদের নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, তা এখন ভয়ের জায়গায় পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি শুধু চালকদের নয়, পুরো সমাজের জন্যই ক্ষতিকর। মাদকসেবিদের আড্ডা বাড়ার ফলে এলাকায় অপরাধ প্রবণতা বেড়েছে। স্থানীয় তরুণদের মধ্যে মাদকের প্রতি আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। পরিবারগুলো আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। মাদকাসক্তদের কারণে এলাকায় সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের ওই এলাকায় যেতে দেন না। ফলে একটি সরকারি প্রকল্প সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিস্রামাগারটি এখন কার্যত অকেজো। সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও এর সুফল জনগণ পাচ্ছে না। বরং উল্টোভাবে এটি মাদক ব্যবসায়ী ও সেবিদের জন্য আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে এটি একটি বড় ক্ষতি। জনগণের করের টাকা দিয়ে নির্মিত স্থাপনা যদি জনগণের কাজে না লাগে, তবে তা রাষ্ট্রের জন্যও অপমানজনক।
ট্রাক চালকরা জানান, তারা বিস্রামাগারে যেতে ভয় পান। সেখানে নিরাপত্তার অভাব, মাদকসেবিদের উৎপাত এবং অপরাধীদের উপস্থিতি তাদের নিরুৎসাহিত করে। অনেক চালক বলেন, তারা গাড়ির ভেতরেই বিশ্রাম নিতে বাধ্য হন। এতে তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি দূর হয় না। দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিস্রামাগারটি যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো, তবে অনেক দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হতো।
স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জানলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। মাঝে মাঝে পুলিশ অভিযান চালালেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। মাদকসেবিরা আবার ফিরে আসে। বিস্রামাগারটি সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত তদারকি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ। কিন্তু এসবের অভাবে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ হচ্ছে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, বিস্রামাগারটি পুনরায় চালু করতে হবে। চালকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সেখানে নিয়মিত নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, মাদকসেবিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। তৃতীয়ত, স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে হবে। তারা যদি একসাথে দাঁড়ায়, তবে মাদকসেবিদের প্রতিরোধ করা সম্ভব। চতুর্থত, বিস্রামাগার পরিচালনার জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চালক সংগঠন এবং প্রশাসনের প্রতিনিধি থাকবে।
সিরাজগঞ্জের বিস্রামাগারের ঘটনা বাংলাদেশের অনেক সরকারি প্রকল্পের প্রতিচ্ছবি। অনেক সময় বিপুল অর্থ ব্যয়ে প্রকল্প নির্মিত হয়, কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা অকেজো হয়ে পড়ে। এর ফলে জনগণের অর্থ নষ্ট হয় এবং সামাজিক সমস্যা বাড়ে। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শুধু স্থাপনা নির্মাণই যথেষ্ট নয়, বরং তার সঠিক ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করাই আসল কাজ।
সিরাজগঞ্জে ৫৫ কোটি টাকার ট্রাক চালকদের বিস্রামাগার এখন মাদকসেবিদের আডাখানা। এটি শুধু একটি স্থাপনার পতন নয়, বরং সামাজিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে বিস্রামাগারটি পুনরায় চালু করা। চালকদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং মাদকসেবিদের প্রতিরোধ করা। অন্যথায় এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে এবং সমাজ আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জনগণের করের টাকা দিয়ে নির্মিত স্থাপনা জনগণের কাজে লাগতে হবে, নইলে তা হবে রাষ্ট্রের জন্য এক করুণ ব্যর্থতা।
প্রকাশিত/ মঙ্গলবার, ০৬ জানুয়ারি ২০২৬















