ছবি : সোহানুর রহমান অনন্ত

এক.

এখন অনেক রাত, ছাদের এক কোণে দাড়িয়ে আছে আকাশ। ঘুম আসছিলো না তাই মাঝ রাতে ছাদের এক কোণে দাড়িয়ে আকাশ দেখছে। আজ দুপুরে নিউ মার্কেটের সামনে ছবির সাথে দেখা হয়েছে আকাশের। যে মানুষটিকে এতোটাকাল হৃদয় প্রাসাদে ছবি করে বাঁধিয়ে রেখেছে সে আবার এসে দেখা দিয়েছে দীর্ঘ ১৫টি বছর পর। ছবিকে চিন্তে আকাশের বিন্দুমাত্র কষ্ট হয়নি। যাকে সকাল সন্ধ্যা হৃদয়ের চোখ দিয়ে দেখছে সে কি এত সহজে চোখের আঁড়ালে লুকিয়ে যেতে পারে? আকাশ কে দেখে চমকে গিয়েছিল ছবি যেন সুন্দর বন থেকে আসা কোন বাঘের সামনে পড়েছে। পড়ে অবশ্য যখন চিন্তে পারলো তার সামনের দাড়িয়ে আছে ১৫বছর আগের মেধাবী ক্লাসমেট আকাশ। তখন ছবি নিজেকে স্বাভাবিক করে নিল। আকাশ এতে কিছু মনে করেনি ভূল হওয়াটাই স্বাভাবিক। মাঝখান দিয়ে যে কেটে গেছে ১৫টি বছর । তাছাড়া আকাশ এখন আর আকাশের মত সুন্দর নেই। কালের খেয়া চলতে চলতে কখন যে নিরবতার মাঝে হারিয়ে গেছে, সে বিষয়টা টেরই পাইনি। আকাশ আজ অঝড় শ্রাবণের কালো মেঘে ঢেকে আছে। কবির মতো কাঁধে এখন সব সময় একটি ধূসর রঙের ব্যাগ থাকে। মুখ ভর্তি দাড়ি আর গায়ে কম দামি পোষাক। পথে পথে ঘুরে অথবা পার্কের বেঞ্চের উপর ঘুমিয়ে দিন কাটে। বেশিক্ষণ নয় মাত্র ৫মিনিট সময় ছবি আকাশের সামনে ছিল। এই ৫মিনিট যেন আকাশের জীবনে শ্রেষ্ঠ সময়।

দুই.
নীল শাড়ি পরা ছবিকে সত্যি খুব সুন্দর লাগছিলো। অপূর্ব লাগছিলো ওর চোখ দুটো। সুপ্ত ভালবাসা জেগে উঠে আকাশের। ছবিকে কাছে পাওয়ার এক তীব্র আঙ্কাখা মনে দোলনায় দোল দেয়। ছবি কোথায় থাকে সেটা জানা হলো না আকাশের। জানার চেষ্টাও করেনি আকাশ। ছবির স্বামি দেশের নাম করা একজন লেখক যদিও নামটা বলেনি ছবি। এতটুকুই শুধু জানার সৌভাগ্য হয়েছে। ছবির সাথে একটি মেয়ে ছিল বয়স তিন বছর হবে। সম্ভবত ছবির মেয়ে। ওর মতোই সুন্দর হয়েছে মেয়েটি। আকাশ জিজ্ঞেস করেছিল ছবিকে। অনুমান ঠিক ছবির মেয়ে, নাম হিমেলা। খুব সন্দুর নাম বলে উঠলো আকাশ। মেয়েটিকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়িয়েও আবার ফিরেয়ে নেয়। আকাশকে দেখে মেয়েটি ভয় পেয়ে ছবির আড়ালে লুকিয়ে পরে। তারপর আকাশকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। ছবি খুব সুখে আছে সেটা ওর মুখ দেখলেই বোঝা যায়।

অথচ আকাশ…………ছবির অনলে পুরে দিন দিন ছাই হয়ে যাচ্ছে। ব্যস ছবি আকাশের পেছনে বেশি সময় নষ্ঠ করতে চাইলো না। আকাশের মত এমন যাযাবর মানুষের সাথে ছবিকে কেউ দেখে ফেললে ওর সম্মানে যে কালি পড়বে। এটা আকাশও বুঝতে পারে, কেবল বুঝতে চায় না আকাশের মন। বিদায় নিয়ে এক সময় ছবি আকাশের চোখের সামনে থেকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। আকাশ বাঁধা দেয় না। আচমকা দমকা হাওয়া এসে ছবির চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়। ছবির খোঁপা থেকে ঝড়ে পড়ে একটি লাল গোলাপ। ছবি দেখতে পায় কিন্তু তুলে না নিয়ে আকাশের পানে একবার তাকায়, তারপর আবার হাঁটতে থাকে হিমেলাকে নিয়ে। আকাশ তাকিয়ে থাকে ছবির দিকে। ইচ্ছে করে আর কিছুক্ষণ ছবির সুন্দর মুখটাকে দেখতে কিন্তু ফেরাবে  সেই অধিকার ওর নেই। আকাশ কেমন আছে, কোথায় আছে, বিয়ে করেছে কি না সেটা জানতে চায়নি ছবি। অবশ্য সেটা জানতে চাইবে বা কেন? ছবিতো আর আকাশকে ভালবাসে না। আকাশ তাকিয়ে থাকে ছবির চলে যাওয়ার পথে। যতক্ষন তাকিয়ে ছিল চোখ দু’টো যেন স্বার্থকতা খুঁজে পেয়েছিল।  হঠাৎ কালো একটা পাজারো এসে ছবিকে আড়াল করে নিয়ে যায়। দু’চোখে নেমে আসে কষ্টের ধুসর ছায়া।

তিন.
ছবির ফেলে যাওয়া শেষ স্মৃতিটুকু কুড়িয়ে নেয় আকাশ। এক অন্যরকম সুন্দর্য্য আছে গোলাপটার মাঝে তার সাথে মিশে আছে ছবির কালো কেশের মিষ্টি ঘ্রাণ। এই মিষ্টি ঘ্রাণের স্বাধ নেওয়ার জন্য আকাশ যুগ যুগ ধরে অপেক্ষা করতে পারে। মনে মনে বিধাতাকে ধন্যবাদ জানায়। ফুলটা ছুঁটে গিয়ে একটু ভুল হয়ে গেছে, গোলাপটা আকাশ ঠিক মত ধরতে পারেনি তাই তার কাটার আঘাতে রক্তাত হলো ওর হাত। এটা কিছু নয় আকাশের কাছে, যেখানে হৃদয়টাতেই প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হচ্ছে সেখানে এই সামান্ন রক্ত কিছুই না। ছবি আর একবার ভুল করে গেল। এই ফুলটি সত্যি আকাশকে কষ্টের সাগরে ইচ্ছে মত ডুবাবে। ফুলটি হাতে নিয়ে মূর্তির মতো আকাশ দাড়িয়ে থাকে। তাকিয়ে থাকে ছবি যে পথে গিয়েছিল সে পথে। আকাশ থেকে ফোটা ফোটা বৃষ্টি ঝড়ে পড়ে আকাশের চোখে মুখে। তবু মনের দাবানল নিবে না।

চার.
আকাশ জানে ওর চোখে আজ সারারাত ঘুম আসবে না।  আজ স্বপ্নও আসবে না আপন করতে। আকাশের মনে পড়ে যায় অতিতের সে দিন গুলোর কথা। ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা আর হাসি গানের কথা। আকাশের হাতের সাথে ছবির হাতের ছোঁয়া অনেক বার লেগেছে। মনে হয় যেন এখনো আকাশের হাতে জড়িয়ে আছে ছবির হাত। একদিন বৃষ্টিভেজা বিকেলে রেললাইনের পথ ধরে ছবির সাথে আকাশ অনেক দূর হেঁটে গিয়েছিল হাত রেখে হাতে। হয়তো ছবিও আকাশের মুখ থেকে সেই না বলা কথাটা শুনতে চেয়েছিল।  আজও সেই হাতের স্পর্শ আকাশকে শিহরিত করে। ছবিকে নিয়ে এক সাথে অনেক পথ চলেছে আকাশ কিন্তু কোনদনি মুখ ফুটে বলতে পারেনি মনের কথাটা। ছবিকে অনেক বার বলতে গিয়েও অন্যপ্রসঙ্গে চলে গেছে আকাশ। না পারা ব্যর্থতাটা শুধু আকাশকে নিরবে কাঁদায়নি। ছবিকে নিয়ে গেছে দূর থেকে বহুদূরে। আকাশ এক সময় জানতে পারলো ওর সারাজবিনের ভালবাসায় ঘেরা ছবি অন্য ভালবাসার ফ্রেমে বাধা পড়ে গেছে। তারপর নিশ্চুপে নিরবে সববাইকে না জানিয়ে আকাশ ছবির কাছ থেকে অনেক দূর চলে যায়।

পাঁচ.
ফেরারী মতো একলা কষ্ট বয়ে বেড়ায় দিন রাত ছবির ছবিটাকে বুকে ধরে। ছবি জানতে পারেনি তাকে ভালবেসে কোন একটি জীবন আঁধারে তলিয়ে গেছে…..আজও জানেনি সে কথা…আর কোনদিন জানবেও না। আকাশ আজ বুঝতে পারছে না বলতে পারা সেই চার অক্ষরের শব্দটা ওর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। এনে দিয়েছে মুঠো মুঠো বড়া সমাহীন কষ্ট,যন্ত্রনা।  আকাশ কখনো ভাবতে পারেনি এভাবে আবার জীবনের কোন এক প্রান্তে এসে ছবির সাথে ওর দেখা হবে, কথা হবে। এতদিন আকাশ ছবিকে নিয়ে শুধু স্বপ্নই দেখতো। আজ তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ছবি এখন আগের চেয়ে আরো বেশি সুন্দর হয়েছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোন শিল্পির তুলিতে আঁকা ছবি। ভালবাসার রঙ তুলি দিয়ে আকাশ ছবিকে আঁকতে পারেনি হয়তো তাই ছবির হৃদয় আসনটা জয় করতে পারেনি সে। কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামায় আকাশ। এই ব্যাগের মধ্যে আকাশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে আছে। গোলাপ ফুলটি হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। হাতে তুরে নেয় ছবির জন্য  রাত জেগে লেখা চিঠিগুলো আর ছবির নিথর ছবিটাকে। এখনও যত্ন করে রেখেছে আকাশ সাথে আরেকটা স্মৃতিও যোগ হয়েছে। যখন বেশি মন খারাপ হয় চিঠিগুলো বের করে ছবির ছবিটাকে পড়ে শোনায়। কি রাস্তার পাশে কি পার্কে যেখানেই হোক যেভাবেই হোক।  পাগলের মতো বক বক করে একা একা। জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আকাশ এই চিঠিগুলো আগলে রাখবে নিজের কাছে। কোনদিন এই চিঠিগুলো ছবির ঠিকানা পৌঁছাবে না……..কোনদিন ছবিও পড়তে পারবে না এই চিঠিগুলো।

ছয়.
আকাশ আজও বিয়ে করেনি, কারো জন্য অপেক্ষায় নয় বরং একলা মনে কাউকে ধরে রাখার জন্য। আকাশের হৃদয় প্রাসাদে চিত্রপটে যে ছবি আছে সে কখনো আকাশকে ছেড়ে যাবে না। তাইতো আজও আকাশ ছবিকে ভালবেসে যায় বেদনার আড়ালে লুকিয়ে। এই জীবনে আর ছবির সাথে আকাশের দেখা হবে কিনা আকাশ জানে না। চোখের আঁড়ালে থাকাটা খুব সোঝা কিন্তু মনের আঁড়ালে থাকাটা অনেক কঠিন। খুব ইচ্ছে করছে আকাশের। যেখানটায় ছবির সাথে আকাশের দেখা হয়েছে এই নিঝুম রাতে সেখানে যেতে। ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আকাশ রাস্তায় নেমে পড়ে। গেটের সামনে টেবিলের উপর ঘুমিয়ে থাকা দাড়োয়ান চমকে উঠে আকাশের কান্ড দেখে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আকাশে দিকে। আকাশ এক পা দু’পা করে হেঁটে যায় পিচঢালা পথ দিয়ে।

(রচনাকাল ২৪-১২-১১ইং)

প্রকাশিত : বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy