

সপ্তাহ খানিক ধরে জবা ভাই আমাদের সাথে গোসল করতে আসেন না। বিষয়টি আমরা লক্ষ্য করলাম, কি হল জবা ভাইয়ের। অথচ একদিন তিনিই আমাদের ধরে নিয়ে গিয়ে গোসল করাতেন। আমরা যদি কোন রকম গোসল করা নিয়ে বাহানা করতাম জবা ভাই আমাদের চোখ রাঙ্গীয়ে বলতেন তোরা সব কুকুরের দল, সারাদিন যেমন কুকুর ছাঁইয়ের মাধ্যমে থাকে তোদের কে দেখলে মনে হয় তোরাও ছাঁয়ের মাধ্যমে বাস করিস। সারা গায়ে ছাঁই ছাঁই দেখাচ্ছে। আমরা কেউ মাঁথা উঁচু করে কিছুই বলতে পারতাম না।
শুধু ভয়ে ভয়ে জবা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এমনকি জবা ভাই আমাদের কে ঘুরার নাম করে পাড়ার সুন্দর সুন্দর মেয়েদের সামনে নিয়ে জাতা ভাষায় অপমান করতেন। একদিন জবা ভাই এক কান্ড ঘটিয়ে বসেছেন। আমাদের পাড়ার সুন্দরী মেয়ে লাইলির সামনে আমাদের গোসল সম্পর্কে কথা তুললেন। ঐ সময় আমার কি যে লজ্জা লাগল। আমি জবা ভাইয়ের পাশে বসে ছিলাম। ঠিক সে সময় জবা ভাই আমার দিকে হাতের আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে দিল তাও আবার আমার নাম উচ্চারন করে বলল এ মজিব প্রায় আট দিন ধরে গোসল করে না। যখন না মাত্র আমি লাইলির দিকে তাকালাম সঙ্গে সঙ্গে আমার দিকে লাইলিও তাকিয়ে মুখটাকে ভ্যাংচি কাটিয়ে আধা বাকা করে মাথা গুরিয়ে নিল। অথচ আমি মনে মনে লাইলি কে কত ভালবাসি যা ওজন করে দেখানো যাবে না। সে থেকে আমি মনে মনে পতিজ্ঞা করে নিলাম আর কখনও গোসল না করে থাকবো না।

একদিন আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে জবা ভাইয়ের সাথে পিটি করলাম জবা ভাই আমাদের সবাই কে সারি সারি কাতার সাজিয়ে শপথ পাঠ করালেন। আমরা সবাই হাত সামনে বাড়িয়ে শপথ বানী পাঠ করলাম। জবা ভাই আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে আমাদের কে শপথ করাতে লাগলেন, আমরা শপথ করিতেছি যে, আজ থেকে জীবনে যতদিন বাঁচবো সকলে মিলে মিশে গোসল করিব। আমরা আরও শপথ করিতেছি যে যত ঝড় হোক তোপান হোক আমরা যে যেখানে থাকি সময় মতো গোসল করে নিব। এবং শীতের মৌসুম হলেও আমরা শীতকে ভয় না করে গোসল করে নিব। সেদিন আমরা সবাই জবা ভাইয়ের এই নিষ্ঠুর শপথ পাঠ করে নিয়েছি। কিন্তু আজ কয়েক দিন ধরে জবা ভাই আমাদের সাথে দেখাও করেন না এবং আমাদের কোন খোজ খবরও পর্যন্ত নেন না। আগেতো জবা ভাই আমাদের কাছে এসে বলতেন কিরে তোরা সবাই গোসল করেছিস। আমরা সবাই এক বাক্যে বলতাম হ্যাঁ জবা ভাই। তার পর জবা ভাই আমাদের কে নিয়ে ঘুরতে যেতেন।
একদিন আমাদের সাথের আসলাম গোসল করে নাই বলে জবা ভাই চোখ বড় বড় করে আসলামের দিকে তাকিয়ে থেকে বলে কি হয়েছেরে কুত্তা। গোসল করিসনি কেন। আসলাম ভয়ে ভয়ে বলল, জবা ভাই আজকে আমার সর্দ্দি হয়েছে। জবা ভাই আসলামকে ধমক দিয়ে বলল ব্যাঙ্গের আবার সর্দ্দি কিসের এই কথা শুনে আমরা সবাই উঁচা সুরে হাঁসি দিয়ে ফেললাম। তাই দেখে জবা ভাই আমাদের সবার চোখে এক নজরে তাকিয়ে বলল তোদের আবার কি হল হত্ত ছাড়ারা।
আসলে সব কয়টা আধা পাগলের দল। তার পর জবা ভাই মেজাজ কে কঠর করে বলল আর যেন ভুল না হয়। জবা ভাই বললেন জ্বর হোক কাশি কিংবা সর্দ্দি হোক গোসল করে নিবি। গোসল করলে শরীরে জ্বর থাকে না কিংবা সর্দ্দিও। জবা ভাইয়ের সেদিনকার কথা সত্যি কি না আমরা বিশ্বাস করিতে পারিনি। রতন প্রায় বলেই ফেলল জবা ভাইকে, জ্বর আসলে লেপের নীচে ঘুমানের টাইম পাব না তিনি বলছেন গোসল করবে। আমি হঠাৎ রতনের মুখ চাপা দিয়ে ফেললাম। তা না হলে জবা ভাই শুনলে আজকে রতনের আস্তা থাকতো না।
বিকালে জবা ভাই আমাদের কে নিয়ে জরুরি মিটিং ডাক দিয়েছেন। কিন্তু সেটি কিসের জন্য আমরা কেউ বুঝতে পারিনি। কারও সাদ্ধ ছিল না জবা ভাইকে জিজ্ঞাসা করার। কারন তিনি আমাদের মুরুব্বি। জবা ভাই আমাদের সবাইকে এই আদব টুকু শিক্ষা দিয়েছেন মুরুব্বিদের সম্মান করার। আমরাও জবা ভাইয়ের সাথে সাথে চলে কিছুটা আদব কায়দা শিকে নিয়েছি। চলার পথে সবাই কে ছালাম দিয়ে থাকেন জবা ভাই। সে ছোট হোক আর বড় হোক জবা ভাইয়ের সালাম দেখে আমরাও ছালাম দেয়া শিকেছি। জবা ভাই বলতেন সালাম দেওয়া নেওয়া দুটিয়ে ছোয়াবের কাজ। জবা ভাই সকালে নাস্তার টেবিলে বসে বললেন বিকালে থাকিস সবাই, মিটিং আছে। আমরা হ্যাঁ বলে জবা ভাইকে বিদায় দিয়ে চলে এলাম। বিকালে আমরা সবাই সবার কাজ কর্ম সেরে এক সাথে মিলিতো হলাম। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল। তাহল জবা ভাই, মানে আমাদের আজকের সভার প্রধান অতিথিও বলতে পারেন। প্রায় দুইটা কিংবা চারটা বেজে গেল। জবা ভাইয়ের কোন দেখা নেই।
আমরা সবাই ভাবলাম যেহেতু জবা ভাই আজকের সভার প্রধান অতিথি সেই জন্য মনে হয় দেরি হচ্ছে। তাই আমরাও জবা ভাইয়ের জন্য বসে বসে অপেক্ষা করছি। কিছুক্ষন পর চোখ ঘুরিয়ে দেখতে পেলাম জবা ভাই চাদর মুড়ি দিয়ে আমাদের কাছে আসতাছে। আমরা কেউ তাকে চিনতে পারিনি। হঠাৎ করে কালু বলে উঠল এই পাগল লোকটি এখানে আসছে কেন। আমরা সবাই কালুর দিকে তাকালাম। তার পরে যেই না মাত্র লোকটির দিকে তাকাই দেখতে পাইলাম তিনি অন্য কেউ নয় ইনি হলেন আমাদের প্রধান অতিথি জবা ভাই। সেই মূহর্ত্যে আমরা জবা ভাইকে দাঁড়িয়ে সম্মান দিতে ভুলে গেছি। যার কারন হলো যে জবা ভাই আমাদের এখানে এসেছেন তিনি আমাদের সকালের জবা ভাই নয়। ইনি হলেন বিকালের অসুস্থ্য জবা ভাই। তাড়া তাড়ি করে জবা ভাই আমাদের সামনে এসে বসতে চেষ্টা করেও পারেননি। হঠাৎ করেই বিছানায় শুইয়ে গেলেন।
আমরা সবাই জবা ভাইকে ধরে বসাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু জবা ভাই মুখে বাজিয়ে বাজিয়ে কি যেন বলতে ছাইছেন প্রথমে আমরা কেউ বুঝতে পারলাম না। কালু বলে পেলল গেউ গেউ করে জবা ভাই বলছেন মাথা ঘুরাচ্ছে। এই কথা শুনে আমরা সবাই জবা ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালাম। দেখি জবা ভাই চোখ দুটি লাল করে কালুর দিকে তাকিয়ে রইল। আমরাও কালুর দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর ভাবলাম আজকে আর কালুর রক্ষা নেই। কারন এর আগেও কালু একটি খারাপ কথা বলেছেন এখন আবার আরেকটি খারাপ কথা তাও আবার সেই জবা ভাইয়ের সম্পর্কে।
দুইটি অপরাধের ক্ষমা জবা ভাই করবেন কিনা তা বলা বাহুল্য। জবা ভাই এই বার স্পষ্ট ভাষায় বললেন আমাকে বসা। আমরা সবাই ধরতে চেয়েছি কিন্তু জবা ভাই কালুর দিকে হাত বাড়িয়ে বল ও যেন আমাকে না ধরে। আবারও আমরা একবার করে ভয় পেয়ে গেছি। কারন জবা ভাই কালুর আচরন গায়ে মেখে নিয়েছে আইকার মতো। তাহলে আজকে কালুর বিচার শক্ত হাতে জবা ভাই নিজেই করবে। এর আগে একদিন রতন জবা ভাইয়ের সামনে অপরাধ করেছেন।
সেই দিন আমরা ভাবছিলাম হয়তো জবা ভাই রতন কে বড় ধরনের একটা শাস্তি দেবেন কিন্তু এতো বড় ন্যাপরায়ন ও ক্ষমাশীল জবা ভাই রতনের বিচার আমাদের হাতে তুলে দিলেন। সেই দিনের জবা ভাই আর আজকের জবা ভাইয়ের মধ্যে দেখা যাচ্ছে অনেক বেবধান যেন আকাশ পাতাল। জবা ভাই কালুকে বলে এই দিকে আয়। কালু ভয়ে ভয়ে জবা ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়াল প্রথমেতো কালু আসতেই চাইছে না। আমরা সবাই বলে পাঠালাম। জবা ভাই বলল কি বললিরে শুয়ার আমি কি বলেছি। কালু বলল ভাই আমাকে মাপ করে দিন। কালুর সাথে সাথে আমরাও ভয় পাচ্ছি আর ভাবচ্ছি আজ জানি কি হয়। কিন্তু এই কি হল। একে একে দুই বার রেকর্ড গড়লেন মহান জবা ভাই। তিনি আবারও কালুকে ক্ষমা করে দিলেন।
তিনি বললেন আজ যেহেতু আমাদের আলোচনা সভা ছিল তার কারনে আজ তোকে মাপ করে দিলাম। তা না হলে.. এই বলে জবা ভাই চুপ করে গেলেন। আমরা আর ফিরে তা না হলের বিষয়টা জানতে চাইনি। এমনিতে জবা ভাই রেগে আছেন। কিন্তু ফের টুকু বলে ফেলল জবা ভাই তা না হলে কি করতেন জবা ভাই টুকুর দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। জবা ভাইর দিকে তাকিয়ে আমরা জিব্বায় কামড় বসিয়ে দিয়েছি। না জানি জবা ভাই কি তিলছমতির কান্ড বসিয়ে দেয়ন। তা আর হল না জবা ভাই মুখ বাকিয়ে বাকিয়ে বলল তা হলে তোর হাড় গুলো কুত্তারে খাওয়াতাম উল্লুখ কোথাকার। সে দিন আর মিটিং হল না। জবা ভাইয়ের মহান আচরন আমাদের কে অনেক কিছু শিখার কলা কৌশল দান করেছেন। যেমন করে আমরা জবা ভাইয়ের কাছ থেকে গোসলের আদবটা পেয়েছি। মাঝে কয়েক দিন জবা ভাইয়ের কোন খোজ খবর পেলাম না। আমরা সবাই হুলস্তুর হয়ে পড়লাম।
এই সময় জবা ভাই কোথায় যাবে। এর আগেও জবা ভাই যেখানে যেত আমাদের কাছ থেকে বলে যেত। আমাদের কাছ থেকে জবা ভাই হারিয়ে যাবে তাতো আমরা মেনে নিতে পারি না। একদিন বিকালে দেখলাম জবা ভাই মোড়ের করিম মিয়ার চায়ের দোকানে বসে বসে চা খাচ্ছেন। আমরা জবা ভাইয়ের কাছে যেতে চাইলাম কিন্তু যেতে পারিনি। কারন জবা ভাই নিজেই বলেছেন মুুরুব্বিদের সাথে দোকান পাটে বসতে নেই। সেই কথা মনে করে আর যাওয়া হল না। কিছুক্ষন পরে দেখা গেল জবা ভাই আমাদের দিকে আসতাছেন। আমরা জবা ভাইকে দেখে তার দিকে এগিয়ে গেলাম। এই কদিনে জবা ভাইয়ের অবস্থা যা হয়েছে দেখেতো আমরা আটাস খেয়ে গেলাম। মনে হয় জবা ভাই দু’চার ছয়মাস পুকুরে যায়নি। গা থেকে এক ধরনের দূষিত গন্ধ আসতাছে। আমরা কেউ জবা ভাইয়ের কাছে গেষিনি। এবং নাকে হাত দেওয়ার সাহস পাইনি। কালু নাকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। জবা ভাই কালুর দিকে কিছু সময় তাকিয়ে থেকে মাথা নিছু করে ফেলেছেন।
আমাদের জবা ভাইয়ের মন্টা ছিল উদার। তিনি মন প্রান দিয়ে ভালবাসতেন মানুষকে। ছোটদেরকে দিতেন স্নেহ ও ভালবাসা। তিনি ছেয়ে ছিলেন তার এই ভালবাসা দিয়ে তার এলাকাকে দূষন মুক্ত করবেন। তা আর হল না। জবা ভাই নিজেই দূষিত হয়ে গেলেন। কারন তা হল মজীব যে মেয়ে কে ভালবাসতে চেয়েছে সেই সুন্দরী মেয়ে লাইলির পান্দে পড়ে ছ্যাঁকা খেয়ে তার এই দশা। পরে আমরা জানতে পারলাম জবা ভাই পান্দে পড়ে ঠান্ডা খেয়ে তার এই দশা হয়েছে। জবা ভাই সুন্দরী মেয়ে লাইলিকে ভালবাসার অপার করে ছিলেন। লাইলিও জবা ভাইয়ের এই প্রস্তাব সাদরে গ্রহন করে। কিন্তু জবা ভাই বুঝতে পারেনি লাইলি তার সাথে চলনা করবে।
একদিন জবা ভাই লাইলিদের বাড়িতে গেলেন। সেদিন ছিল পচন্ড শীত তাও আবার সকাল বেলায়। সরল সহজ জবা ভাইকে লাইলি প্রেমের পরীক্ষা করার জন্য তাদের পুকুরে গোসল করার জন্য বলে। জবা ভাইও সাদা মনে গোসল করতে যেই না মাত্র নেমেছেন, সঙ্গে সেঙ্গ হাউ মাউ করে উঠে গেলেন। জবা ভাই লাইলিকে বলেন আমি গোসল করব না, পুকুরের পানি আমাকে কামড়াতে লাগল। সে থেকে লাইলিও জবা ভাইয়ের এই পবিত্র ভালবাসা পত্যাক্ষান করে চলে গেল। এর পর আমরা বুঝতে পারলাম জবা ভাই পানির কামুড়ের ভয়ে আমাদের সাথে গোসল করতে আসেন না।
প্রকাশিত : বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রি.
















