মুধময় চাঁদপুর : সোহানুর রহমান অনন্ত

(আমার শৈশবের স্মৃতিকথা)

পরিচিতি
নাম : সোহানুর রহমান অনন্ত
জন্ম : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭
গ্রাম : মুরাদপুর বেপারী বাড়ি
পো : রঘুনাথপুর
থানা : কচুয়া
জেলা : চাঁদপুর
মোবা : ০১৯২০৪৬৩৭৬৩

লেখালেখি
দৈনিক চাঁদপুর কণ্ঠ, মনোজগত, মাসিক টইটম্বুর, দৈনিক সংবাদ, কিশোর কণ্ঠ, আর্দশ নারী, দৈনিক বাংলাবাজার, অবকাশ, থেরাপি, বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রথমা, অনলাইন গল্প কবিতা.কম ইত্যাদি।

একটি মানুষের জীবনে অনেক রকম ঘটনা ঘটে থাকে। সবচেয়ে বেশি ঘটনা জমা পড়ে শৈশবের। আমার শৈশবের ঘটনাগুলো শেয়ার করার লোভ সামলাতে পাড়লাম না। তাই চাঁদপুরের বন্ধুদের কাছে আমার শৈশবের কিছু মধুময় স্মৃতি তুলে ধরলাম।

চাঁদনী রাতে গোল্লাছুট

আমাদের বাড়ির পূর্বে দিকে যতদূর চোখ যায় ধানের মাঠ। মাঠের শেষে সবুজে ঢাকা গ্রাম গুলোর ওপর আকাশ ঘুমিয়ে আছে। আমি রোজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘরের পেছনে ছুটে যেতাম। প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য দেখার জন্য। আমার সাথে প্রকৃতি দেখতে যোগ দিতো চাঁচাতো ভাই ইমরান। আমরা সুপারি বনে বৈঠক খানা বানালাম। এখন থেকে স্পষ্ট দেখা যায় চারিপাশ। এখন ধান কাটা শেষ তাই মাঠের বুকে সবুজ ঘাস জনসভা করছে। আমরা চাঁদনী রাতে মাঠের বুকে গোল্লাছুট খেলতাম। খুব মজা হতো। গাঁমের অন্য ছেলে মেয়েরা এসে আমাদের সাথে যোগ দিতো। যে ক’দিন চাঁদের আলো পড়ে সে ক’দিন আমরা রাতে খেলায় মেতে থাকতাম। আনন্দে কাটতো আমাদের সেই সময়টুুকু।

****************************************

বৈশাখী ঝড়ে আম কুড়ানো

গ্রীস্মে সবর্চে মজার বিষয় যেটা সেটা হচ্ছে, ঝড়ের মাঝে আম কুড়ানো। গ্রীস্মে এমনিতে স্কুল বন্ধু থাকে। আম-কাঠালের ছুটি পাওয়া যায় অনেক দিন। গ্রামের বাজারে মৌমাছি ছোটাছুটি করে। আম, জাম, কাঠালের গন্ধে ভরে ওঠে চারিপাশ। আকাশে মেঘ দেখলেই আমরা দুষ্ট ছেলের দল ছুটে যেতাম আম বনে। এমনিতে, বাগানের মালিক আম দিতে চাইতো না। তাই ঝড়ের মধ্যে আম কুড়াতাম। সেটা রাত হোক আর দিন হোক। ঝড়ের মধ্যে যখন মানুষ নিজেদের ঘর-বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত, আমরা তখন আম কুড়ানো নিয়ে প্রতিযোগিতা করছি। সেই দিন গুলোর কথা মনে পড়লে এখন নিজের অজান্তে হেসে উঠি।

জোনাক জ্বলা রাতে

রাতের আঁধারে ছুটে যেতাম পাখির ছানা খুঁজতে। মাঠের বুকটা যেন জোনাক পোকার দ্বীপ। আঁধারের মাঝে ক্ষুদে আলোর যোগান দিতো। সেই আলোতে আমরা পাখির বাসা খুঁজে ছানা বের করে আনতাম। (যদিও এখন বুঝি এটা কত বড় অন্যায়) আমরা জোনাক পোকাও ধরতাম। বাড়ির মুরব্বিরা আমাদের উপদেশ দিতো জোনাক পোকা ধরা ভাল নয়। অমঙ্গল হয় নাকি। কিন্তু আমরা সে কথা কান দিতাম না। জোনাক দ্বীপে হারিয়ে যেতাম বন্ধুরা মিলে।

****************************************

কাকতাড়ুয়া

মুরাদপুরে কোনো প্রাইমারী স্কুল না থাকায় আমাদের রোজ আধা মাইল হেঁটে স্কুল যেতে হতো। মাঝ খানে ছোট একটা বিল পারি দিতে হতো। ক্ষেতের মাঝ খানে কৃষকের কাকতাড়ুয়া দাড় করিয়ে রাখতো। আর আমরা দুষ্ট ছেলেরা রোজ কাকতাড়ুয়া ভেঙে দিতাম। তারপর দূর থেকে দেখতাম কি ঘটে। কিছুক্ষণ কৃষক এসে দেখতো তার কাকতাড়ুয়া ভেঙে চূড়ামার হয়ে পড়ে আছে। আশে পাশে তাকিযে যখন আমাদের দেখতো তখন লাঠি হাতে দৌড়ানি দিতো। আমরাও পরিমরি করে ছুটতাম। অনেক দ্রুত দৌড়াতে পাড়তাম একেবারে হরিণের মতো। শেষে কৃষক ধরতে না পেরে জোড়ে চিৎকার দিয়ে বলতেন, একবার হাতের কাছে পাইয়া নই মজা দেহাম নেই। আমরা সেই দৃশ্য দেখে খুব মজা পেতাম। কিন্তু এখন না

****************************************

গাঁয়ের হাঁটে

সাপ্তাহে বুধবার ছুটে যেতাম রঘুনার্থপুর বাজারে। খড়চা-পাতির জন্য মা টাকা দিতেন। সাথে আমাকে দিতেন ৫ টাকা কিছু খাওয়ার জন্য। দুপুর বেলা সবার সাথে আমিও হাটে ছুটে যেতাম। কেউবা ধানের বস্তা মাথায় করে আবার কেউবার হাঁস মুরগী বিক্রি করতো হাটে যেতেন। সকাল থেকেই দূর-দুরান্ত থেকে মানুষ এসে ঘুরে বেড়াতাম, মায়ের জন্য পান-সুপারি কিনতাম। পাঁচ টাকা সাথে আরো দু’ টাকা যোগ করে সারকেস খেলা দেখতাম। তারপর সাঁঝের বেলা আইসক্রিম খেতে খেতে বাড়ি ফিরতাম।

****************************************

বরর্ষার জলে নাঁও বাওয়া

নতুন পানির মাছের মতো আমরা সারাদিন নতুন জলে সাঁতার কাটতাম। আকাশে সারাবেলা মেঘেদের ছোটাছুটি। কোমড় সমান জলের মধ্যে নেমে জল ছোড়াছুড়ি আর বৃষ্টির গান গাইতাম। যখন বৃষ্টি শুরু হতো কচুপাতার ছাতা মাথায় দিয়ে কদম বনে গিয়ে খেলা করতাম। যদিও মা বাইরে যেতে না করতেন। ঘরে বসে জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখতাম। টিনের চালায় শুনতাম বৃষ্টির টাপুর-টপুর শব্দ। মা খিচুরী রান্না করতেন, বেশ মজা করে খেতাম।

হ্যারিকেনের আলোয় গল্প শোনা

আলী চাঁচার কাছে সন্ধ্যা হলেই বায়না ধরতাম গল্প শোনার জন্য। চাঁচা আমাদের শর্ত দিতেন, আগে পড়াশোন কইরা আয় পরে গল্প কমু। কথা মত আমরা পড়া শেষ করে মাদুল বিছিয়ে বসে পড়তাম উঠুনের মাঝখানে। হ্যারিকেনের আলোয় চাঁচা গল্প শোনাতেন। মাঝে মাঝে চাঁচা হরুৎ হরুৎ হুক্কা টানতেন আর কাশতেন। চাঁচা অনেক সুন্দর গল্প বলতে পাড়তেন। কত রকম গল্প যে শোনাতেন আমাদের তা’ বলে বোঝাতে পারবো না। আমাদের সাথে বাড়ির আরো অনেকেই এসে বসতেন গল্প শোনার জন্য। আমরা যেন সকাল থেকেই অপেক্ষা করতে থাকতাম কখন সন্ধ্যা হবে। আলী চাঁচা আজ নেই। কিন্তু তার সেই গল্প বলার ভঙি এখনো চোখে ভাসে।

****************************************

গোলবাহার মাঠে গোল উৎসব

মধুপুরের ছেলেদের সাথে আমরা ঠিক করলাম ফুটবল খেলবো। কয়েকদিন ধরে ওরা বেশ নাড়াচাড়া দিয়ে উঠেছে খেলার জন্য। খেলার প্রস্তাব দিতেই আমরা রাজি হয়ে গেলাম। আশে পাশে কোন মাঠ না থাকায় খেলাটা হবে গোলবাহার স্কুল মাঠে। যথাসময় আমরা মাঠে গেলাম। খেলা শুরু হলো। চারিদিকে দর্শক, আকাশ থেকে টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে। প্রথমে একটা গেলা খেলাম আমরা তারপরই জ্বলে উঠলাম। রীতিমত আমাদের গোল উৎসব শুরু হলো। হাফ ডজন গোল সেদিন দিয়েছিলাম আমরা। এরপর আর মধুপুরে ছেলেরা আমাদের সাথে খেলতে আসেনি।

****************************************

কাশ বনে লুকোচুরি

আকাশে সাদা মেঘ উড়ে যায়। বিলের জলে শাপলা হাসে আপন মনে। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে পাশের গ্রামের ছেলেদের সাথে মাছ ধরতে বিলে যেতাম। মাছ ধরার ফাঁকে ফাঁকে কাশের বনে গিয়ে হাঁসের ডিম খুজতাম। খেলতাম লুকোচুরি। মাথার জুটি দু’হাতে নাড়িয়ে মেয়েরা এসে বলতো, আমাদের সাথে চড়ুইবাতি খেলবি? আমরা রাজি হয়ে যেতাম। খুঁজে পাওয়া হাসের ডিম নিয়ে চড়ুইবাতি বেশ জমে উঠতো। মাটির হাড়ি পাতিলে ভাত রান্না হতো, মাছ আর শাক দিয়ে রান্না হতো তরকারী সাথে খুঁজে পাওয়া ডিমগুলো। কিন্তু রান্না শেষ হলেই বাধতো ঝগড়া। কে বেশি খাবে, কে কম খাবে চলতো প্রতিযোগিতা। এভাবেই আনন্দের মাঝে কাটাতাম সাদা মেঘের সময়ের দিনগুলো।

****************************************

আমার গাঁয়ে নবন্নের উৎসব

নবন্নেতে চাষি পাড়া জাগতো নতুন করে, হেমন্তের নতুন ধান ঘরে তুলে। কৃষাণীরা সারাক্ষনই ধান নেওয়ায় ব্যস্ত। নতুন চালের মিষ্টি গন্ধ আকাশে বাতাসে ভেসে আসে। অনেক রাত পর্যন্ত কুপির আলোয় ধান নেওয়া হয়। বাড়ির মুরব্বী থেকে শুরু করে সবাই এ কাজে যোগ দেয়। আত্মার বন্ধনে মিলে যায় সকলে। একান্নবর্তী পরিবার গুলোতে নেমে আসে সীমাহীন আনন্দ। আমরাও গিয়ে সেখানে উৎসবে যোগ দিতাম। নতুন চালের পিঠা খেতে বন্ধুদের নিমন্ত্রন করতাম কাঁঠাল পাতায় পত্র লিখে।

****************************************

খেজুর রসের মিষ্টি পিঠা

শীতের সকালে আব্বু বাজার থেকে রস ভর্তি হাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। মায়ের হাতের মিষ্টি পিঠার গন্ধে ঘুম ভাঙতো আমার। এমন মিষ্টি গন্ধ নাকে আসলে আর কি ঘুম থাকে। হাত-মুখ ধুয়ে ছুটে যেতাম রান্না ঘরে। গরম গরম পিঠা খেয়ে তৃপ্তি মেটাতাম। মা স্কুলে যাওয়ার সময় কিছু পিঠা দিয়ে দিতেন। বন্ধুদের নিয়ে মজা করে খেতাম। বাড়ির পাশেই কয়েকটা খেজুর গাছ ছিলো। সকাল বেলা হাড়ি ভরে চুপচাপ করে রস পড়তো। আমরা কয়েকজন মিলে খেজুর গাছের নীচে গিয়ে ওপরের দিকে হা করে থাকতাম। এক ফোটা এক ফোটা করে রস পড়তো আমরা খুব মজা করে খেতাম। আর কখনো বা রাতের আঁধারে চুপি চুপি রস চুরি করতে গিয়ে দৌড়ানি খেয়ে আসতাম।

****************************************

রঙিন ঘুড়ির টানে

সবচেয়ে বেশি মজা হতো বসন্তে। কি মাঝ রাত কি দুপুর বেলা। ককিলের কুহু কুহু সুরে মন ভরে উঠতো। দক্ষিনা বাতাসে সবুজ মাঠের বুকে সারাদিন ঘুড়ি উড়াতাম। পাশের গ্রামের ছেলেদের সাথে কাটাকাটি খেলতাম। ফুলে ফুলে প্রজাপতি উড়ে বেড়াতো। আমরা তাঁর পিছু পিছু ছুটতাম। সাঁঝের বেলা বাড়ি ফিরলে মা বকুনি দিতেন। রাতে আব্বুর কাছে বায়না ধরতাম। দুই টাকা দেওয়ার জন্য। আব্বু জিজ্ঞেস করতেন দুই টাকা দিয়ে কি হবে? আমি বললাম ঘুড়ি কিনবো। আব্বু হাসি মুখে দোয়েল মার্কা একটা নোট পকেট থেকে বের করে দিতেন।

****************************************

প্রথম ট্রেনে ভ্রমন

একটা মজার ব্যপার শেয়ার না করে পারলাম না। আমার খুব শখ ছিল ট্রেনে চড়ার কিন্তু ভাগ্য খারাপ। আমাদের গ্রামের আশ পাশে কোন ট্রেনের রাস্তা নেই। তাই একবার কয়েক বন্ধু মিলে ঠিক করলাম, হাজীগঞ্জ থেকে ট্রেনে চাঁদপুর সদরে যাবো। যেমন ভাবা তেমন কাজ, স্কুল ফাঁকি দিয়ে একদিন চলে গেলাম হাজিগঞ্জ। আকাশ থেকে টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছিলো। আমার কিছুক্ষণ ষ্টেশনে অপেক্ষা করার পর আকাশ পাতাল শব্দ ট্রেন এলো। আমাদের আনন্দ আর দেখে কে। ট্রেনে চড়ে বসলাম। জোড়ে বৃষ্টি শুরু হলো। ট্রেনে চড়ার মজাই আলাদা। কিন্তু বিপদে পড়লাম আসার সময়। বাসে করে হাজিগঞ্জ নেমে বাসায় ফিরতে ফিরতে সূর্য ডুবে গেছে। বাড়ির সবাই খুব চিন্তায় পড়ে গিয়েছিল। বাড়িতে এসে এক হালি বকা খেলাম। তবে সেই আনন্দের কাছে এই বকা কিছুই না।

ফিরে ফিরে আসি

জীবনের তাগিতে এখন গ্রাম ছেড়ে অনেক দূরে বসবাস করি। চাঁদপুরে আমার শৈশবের সেই আনন্দময় দিন গুলোর কথা মনে পড়লে দু’চোখের জল ধরে রাখতে পারিন। সেই সবুজ মাঠ, সেই চির সবুজ বন, রঙিন ঘুড়ি, বান্ধবীদের সাথে চড়ইবাতি এখন স্¦প্ন হয়ে দু’চোখে ভাসে। গ্রামে শহরে হাওয়া বইছে এখন। মাঠ, গাছ সব উজার হয়ে যাচ্ছে। বন্ধুরা এখন যার যার কর্ম নিয়ে ব্যস্ত। তবু যেখানেই থাকি যেভাবেই থাকি। বার বার আমার মন টানে গ্রামের সেই আকাঁ বাঁকা পথ, ফুল, মাটি, মাঠ। কেন যেন বার বার মনে হয় আবার যদি সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম। পরক্ষনেই আবার বুঝতে পারি এ যে হবার নয়। তাই নীড়ে ফেরা পাখির মতো বার বার আমি ফিরে আসি, আমার শৈশবে ঘেরা পল্লি মায়ের বুকে।

(রচনা কাল ২-১-২০১২)

সোহানুর রহমান অনন্ত
সুবাসি ভিলা, শেখদী, শনি-আখড়া, ঢাকা।
মোবা: ০১৯২০৪৬৩৭৬৩
ই-মেইল: ংযড়যধহথ৭ধ@ুধযড়ড়.পড়স

ডিজাইনার
দৈনিক যুগান্তর
মতিঝিল, ঢাকা।

ডিজাইনার
মাসিক টইটম্বুর
শান্তিনগর, ঢাকা।

প্রকাশিত : বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬ খ্রি.

ডায়াবেট্সি হলে কি করবেন?

শেয়ার করুন
প্রিয় সময়-চাঁদপুর রিপোর্ট মিডিয়া লিমিটেড.

You might like

About the Author: priyoshomoy