অন্ধকারের ইন্টারনেট: ডার্ক ওয়েবের অজানা দুনিয়া

মিজানুর রহমান রানা :

আপনি প্রতিদিন গুগলে যা সার্চ করেন, ফেসবুকে যা দেখেন, ইউটিউবে যা দেখেন – তা পুরো ইন্টারনেটের মাত্র ৪ থেকে ৫ শতাংশ। বাকি ৯৫ শতাংশই আমাদের চোখের আড়ালে। এই বিশাল অদৃশ্য অংশেরই সবচেয়ে গভীর এবং রহস্যময় স্তরটির নাম ডার্ক ওয়েব। নাম শুনলেই মনে হয় কোনো ভয়ংকর জগৎ, যেখানে আলো পৌঁছায় না। বাস্তবেও অনেকটা তাই।

অনেকে ভুল করে ডিপ ওয়েব আর ডার্ক ওয়েবকে এক মনে করেন। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করা যাক। ইন্টারনেটকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি সারফেস ওয়েব – যা গুগল, বিং-এর মতো সার্চ ইঞ্জিনে খুঁজে পাওয়া যায়। দ্বিতীয়টি ডিপ ওয়েব – যা সার্চ ইঞ্জিনে আসে না, কিন্তু বৈধ। যেমন আপনার জিমেইলের ইনবক্স, ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট, হাসপাতালের ডাটাবেস, ইউনিভার্সিটির রিসার্চ পেপার আর্কাইভ। এগুলো পাসওয়ার্ড দিয়ে সুরক্ষিত, তাই গুগল দেখতে পায় না। আর তৃতীয় ও সবচেয়ে গভীর স্তরটি হলো ডার্ক ওয়েব। এটি ইচ্ছা করেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে ঢুকতে বিশেষ সফটওয়্যার, বিশেষ কনফিগারেশন এবং বিশেষ লিংক দরকার হয়। সাধারণ ব্রাউজার দিয়ে এর অস্তিত্বও টের পাওয়া যায় না।

কেন এবং কীভাবে তৈরি হয়েছিল ডার্ক ওয়েব?

ডার্ক ওয়েবের জন্ম কোনো অপরাধীর হাতে হয়নি, হয়েছিল আমেরিকার সরকারি গবেষণাগারেই। এর মূল প্রযুক্তির নাম Tor – দ্য অনিয়ন রাউটার।

১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণা সংস্থা U.S. Naval Research Laboratory-এর বিজ্ঞানীরা একটি সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন। কীভাবে গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্টরা, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা ইন্টারনেটে নিজেদের পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রেখে যোগাযোগ করবে? যাতে কেউ ট্র্যাক করতে না পারে কে কোথা থেকে বার্তা পাঠাচ্ছে।

সেখান থেকেই ১৯৯৭ সালে Tor-এর ধারণা আসে। এর কাজের পদ্ধতিটা পেঁয়াজের খোসার মতো। আপনি যখন একটি বার্তা পাঠান, তখন Tor সেটিকে একবার নয়, তিনটি স্তরে এনক্রিপ্ট করে এবং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী সার্ভারের মধ্য দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে প্রাপকের কাছে পাঠায়। প্রতিটি সার্ভার শুধু তার আগের এবং পরের ঠিকানাটি জানতে পারে, পুরো পথটি জানে না। ফলে প্রেরকের পরিচয় প্রায় অসম্ভব হয়ে যায় খুঁজে বের করা।

প্রথমে এটি ছিল শুধুই সামরিক প্রজেক্ট। পরে ২০০২ সালে এর কোড উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় এবং ২০০৬ সালে Tor Project নামে একটি অলাভজনক সংস্থা এটির দায়িত্ব নেয়। উদ্দেশ্য ছিল মহৎ। সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, হুইসেল ব্লোয়ার এবং যেসব দেশে ইন্টারনেটে কঠোর সেন্সরশিপ আছে, সেখানকার সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদে কথা বলতে পারে, সেই স্বাধীনতা দেওয়া। এখনো বিবিসি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, এমনকি ফেসবুকেরও ডার্ক ওয়েবে নিজস্ব সাইট আছে, যাতে মানুষ পরিচয় গোপন রেখে তথ্য পাঠাতে পারে।

কিন্তু যে প্রযুক্তি গোপনীয়তা দেয়, সেই প্রযুক্তিই অপরাধীদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠল। পরিচয় গোপন রাখার এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে তৈরি হলো অন্ধকার দুনিয়া।

অপরাধীরা কীভাবে মানুষের ক্ষতি করছে?

ডার্ক ওয়েব নিজে অপরাধ নয়, কিন্তু এর অ্যানোনিমিটি বা পরিচয় গোপন রাখার ক্ষমতা এটিকে অপরাধের স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে। এখানে লেনদেন হয় ক্রিপ্টোকারেন্সি, বিশেষ করে বিটকয়েনে, যা ট্র্যাক করা কঠিন। ফলে অপরাধীরা ধরা পড়ার ভয় ছাড়াই ব্যবসা চালায়।

১. মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের বাজার: ডার্ক ওয়েবের সবচেয়ে বড় ব্যবহার মাদক ব্যবসা। ২০১৩ সালে Silk Road নামে একটি সাইট ছিল, যাকে বলা হতো মাদকের আমাজন। সেখানে হেরোইন থেকে শুরু করে নিষিদ্ধ ওষুধ সব পাওয়া যেত। এফবিআই সেটি বন্ধ করলেও এর অনুকরণে শত শত সাইট এখনো সক্রিয়। একইভাবে অবৈধ অস্ত্র, জাল পাসপোর্ট, জাল ডলার, জাল জাতীয় পরিচয়পত্র বিক্রি হয় এখানে।

২. তথ্য চুরি ও প্রতারণা: আপনার ফেসবুক আইডি হ্যাক হয়েছে? আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে? সেই তথ্য বিক্রি হয় ডার্ক ওয়েবে। হ্যাকাররা ব্যাংক, ই-কমার্স সাইট, হাসপাতাল হ্যাক করে কোটি কোটি মানুষের নাম, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ক্রেডিট কার্ডের তথ্য চুরি করে ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করে। এই তথ্য কিনেই প্রতারকরা আপনার নামে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলে, লোন নেয় বা আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করে। বাংলাদেশেও সম্প্রতি এনআইডি তথ্য ফাঁসের ঘটনায় ডার্ক ওয়েবে ডাটা বিক্রির অভিযোগ উঠেছিল।

৩. র‍্যানসমওয়্যার ও হ্যাকিং সার্ভিস: ডার্ক ওয়েবে আপনি ভাড়ায় হ্যাকার পাবেন। মাত্র কয়েকশ ডলারে কেউ আপনার শত্রুর ফেসবুক হ্যাক করে দেবে, কারো ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস করে দেবে। এখানে Ransomware-as-a-Service পাওয়া যায়। মানে আপনি কোডিং না জেনেও র‍্যানসমওয়্যার কিনে কোনো কোম্পানির সব ফাইল তালা মেরে মুক্তিপণ দাবি করতে পারেন।

৪. শিশু পর্নোগ্রাফি ও যৌন শোষণ: ডার্ক ওয়েবের সবচেয়ে জঘন্য এবং অমানবিক ব্যবহার এটি। বিশ্বজুড়ে শিশু নির্যাতনকারীরা এখানে নেটওয়ার্ক তৈরি করে। তারা শিশুদের যৌন নির্যাতনের ভিডিও ও ছবি আদান-প্রদান করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এটি দমন করা সবচেয়ে কঠিন কাজ, কারণ সবাই বেনামী।

৫. সুপারি কিলার ও মানব পাচার প্রতারণা: ডার্ক ওয়েবে অনেক সাইট দাবি করে তারা টাকার বিনিময়ে মানুষ খুন করে। যদিও তদন্তে দেখা গেছে এর ৯৯ শতাংশই প্রতারণা। মানুষ টাকা দেয়, কিন্তু খুন হয় না, টাকাটা মেরে দেয় স্ক্যামাররা। তবে মানব পাচার এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির মতো ভয়ংকর বিজ্ঞাপনও এখানে দেখা যায়, যার অনেকগুলোই তদন্তের দাবি রাখে।

৬. অনলাইন জুয়া ও জালিয়াতি: আপনার এলাকায় যে অনলাইন জুয়ার সাইটগুলো চলে, তার অনেক সার্ভার ও লেনদেনের নিয়ন্ত্রণ হয় ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে। ফলে পুলিশ সহজে তাদের ট্র্যাক করতে পারে না।

ডার্ক ওয়েবকে পুরোপুরি বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ Tor-এর মতো প্রযুক্তি তৈরি হয়েছিল ভালো উদ্দেশ্যেই এবং বিশ্বজুড়ে সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের এখনো এটি প্রয়োজন। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একমাত্র উপায় হলো সচেতনতা। কোনো অচেনা লিংকে ক্লিক না করা, একই পাসওয়ার্ড সব জায়গায় ব্যবহার না করা, টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখা এবং সন্তানরা ইন্টারনেটে কী করছে সে বিষয়ে খেয়াল রাখা। মনে রাখবেন, ইন্টারনেটের আলোর জগৎ যেমন বিশাল, তার অন্ধকার দুনিয়াটাও ততটাই গভীর।

অ প্রকাশিত : শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

.

You might like