হ্যাক ঠেকাতে ২৫ বছরের পুরোনো নোকিয়ায় ফিরছেন সাইবার গুরুরা!

তথ্য প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :

আপনার হাতে থাকা আইফোন ১৫ প্রো-ম্যাক্স বা গ্যালাক্সি S24 আল্ট্রা যে কোনো মুহূর্তে হ্যাক হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ২৫ বছর আগে কেনা আপনার ড্রয়ারে পড়ে থাকা নোকিয়া ৩৩১০ বা নোকিয়া ৯২১০ কমিউনিকেটরটি হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও, এটাই এখন সাইবার নিরাপত্তা বিশ্বের নতুন বাস্তবতা।

যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভয়ংকর সব র‍্যানসামওয়্যার, যখন একটি ক্লিকেই ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, তখন বিশ্বের শীর্ষ সাইবার বিশেষজ্ঞরাই ফিরে যাচ্ছেন ৯০ দশকের প্রযুক্তিতে। সাইবার নিরাপত্তার ভাষায় এই কৌশলের নাম Security by Antiquity বা Security by Obsolescence – অর্থাৎ, অপ্রচলিত হওয়াই সুরক্ষা।

হ্যাকারদের অর্থনীতি: কেন পুরোনো প্রযুক্তি নিরাপদ?
ফিনল্যান্ডের কিংবদন্তি সাইবার নিরাপত্তা গবেষক মিকো হিপ্পোনেন এই তত্ত্বের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। তিনি প্রায় এক দশক ধরে জিমেইল, আউটলুক বা হটমেইলের মতো আধুনিক ও সুরক্ষিত ইমেইল বাদ দিয়ে ব্যবহার করেছেন ‘ইউডোরা’ নামের একটি ইমেইল ক্লায়েন্ট, যার শেষ আপডেট এসেছিল ২০০৬ সালে। কোম্পানিটিই এখন আর নেই।

প্রশ্ন হলো, কেন? হিপ্পোনেনের যুক্তি খুব সোজা – হ্যাকিং একটি ব্যবসা। একজন হ্যাকার তার সময় এবং টুলস বিনিয়োগ করবে সেখানে, যেখানে লাখ লাখ শিকার আছে। জিমেইলে ১.৮ বিলিয়ন ব্যবহারকারী, তাই জিমেইলের জন্য একটি ভাইরাস বানালে লাভ অনেক। কিন্তু ইউডোরা ব্যবহার করেন হয়তো পৃথিবীতে ৫ হাজার মানুষ। এই ৫ হাজারের জন্য ম্যালওয়্যার বানিয়ে হ্যাকারের কোনো লাভ নেই। এটাই হলো সিকিউরিটি বাই অবসোলেসেন্স।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম্যাট বিশপ এই বিষয়টি প্রমাণ করতে একটি পরীক্ষা করেছিলেন। তিনি ইচ্ছে করেই একটি পুরোনো, দুর্বল সফটওয়্যার দিয়ে একটি সার্ভার অনলাইনে রেখে দেন – যাকে হানিপট বলে। অবাক করা বিষয়, ৬ মাসেও কোনো হ্যাকার সেটিতে আক্রমণ করেনি। অথচ যেই তিনি সফটওয়্যারটি হালনাগাদ করে নতুন ভার্সনে নিলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শত শত অটোমেটেড বট এবং হ্যাকার সেটিকে স্ক্যান এবং আক্রমণ করা শুরু করল। কারণ হ্যাকারদের অটোমেটেড টুলসগুলো নতুন প্রযুক্তির দুর্বলতা খোঁজার জন্যই প্রোগ্রাম করা, পুরোনোর জন্য নয়।

স্মার্টফোনের যুগে কেন ফিচার ফোন?
এই তত্ত্ব সবচেয়ে বেশি কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে। স্মার্টফোন মানেই একটি ছোট কম্পিউটার, যেখানে ১০ লাখের বেশি অ্যাপ, অপারেটিং সিস্টেম, ব্লুটুথ, ওয়াইফাই, জিপিএস – হ্যাক করার জন্য হাজারটা দরজা খোলা। পেগাসাসের মতো স্পাইওয়্যার একটি মিসড কলের মাধ্যমেই আপনার আইফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে।

কিন্তু ২৫ বছর আগের নোকিয়া ৯২১০ বা নোকিয়া ৩৩১০-এ কোনো অ্যাপ স্টোর নেই, কোনো ইন্টারনেট ব্রাউজার নেই, কোনো জিপিএস ট্র্যাকিং নেই। সেখানে পেগাসাস ইনস্টল করার কোনো জায়গাই নেই। তাই সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী, এমনকি অনেক দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারাও এখন অত্যন্ত গোপন বৈঠকের সময় স্মার্টফোন বাইরে রেখে একটি ২০ ডলারের ফিচার ফোন ব্যবহার করছেন। এটিকে বলা হয় ‘ডিজিটাল ডিটক্স সিকিউরিটি’।

নতুন তথ্য: সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তায় অ্যানালগে ফেরা
এই প্রবণতা শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ফিরে এসেছে। এবং এখানেই যোগ হচ্ছে নতুন সব তথ্য।

১. আকাশপথে: জিপিএস জ্যামিংয়ের ভয়
আধুনিক বিমান চলে জিপিএস-এর উপর ভর করে। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধে দেখা গেছে, রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয় পক্ষই ব্যাপকভাবে জিপিএস জ্যামিং করছে। ফলে আকাশে বিমানের নেভিগেশন বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই কারণে আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে এবং যুক্তরাজ্যের এভিয়েশন অথরিটি এখন ১৯৭০ সালের পুরোনো VOR (VHF Omnidirectional Range) নামের ভূ-ভিত্তিক রেডিও নেভিগেশন সিস্টেমকে আবার সচল রাখছে। এটি জ্যাম করা প্রায় অসম্ভব।

২. যুদ্ধের ময়দানে: কাগজের ম্যাপের পুনর্জন্ম
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথম দিকে রাশিয়ান সেনারা ডিজিটাল ম্যাপ এবং জিপিএস-এর উপর নির্ভর করে পথ হারিয়ে ফেলেছিল। ইউক্রেনীয়রা তাদের জ্যাম করে দিয়েছিল। এরপর থেকে ন্যাটোর স্পেশাল ফোর্স এবং ইউক্রেনীয় কমান্ডোরা আবার ফিরে গেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কৌশলে – কাগজের ম্যাপ, কম্পাস এবং প্রটেক্টর। কাগজের ম্যাপে কোনো ব্যাটারি লাগে না, কোনো সিগন্যাল নেই, তাই এটিকে হ্যাক বা জ্যাম করা যায় না। মার্কিন মেরিন কর্পস এখন তাদের রিক্রুটদের বাধ্যতামূলকভাবে অ্যানালগ নেভিগেশন শেখাচ্ছে, যাকে তারা বলে ‘অ্যানালগ রেসিলিয়েন্স’।

৩. লোরান এবং ই-লোরানের প্রত্যাবর্তন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আবিষ্কৃত LORAN (Long Range Navigation) ছিল জাহাজের জন্য। জিপিএস আসার পর এটি অপ্রচলিত হয়ে যায়। কিন্তু জিপিএস-এর দুর্বলতা বুঝতে পেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং দক্ষিণ কোরিয়া এখন eLORAN নামে এর আধুনিক সংস্করণ ফিরিয়ে আনছে। এর সিগন্যাল জিপিএস-এর চেয়ে ১৩ লাখ গুণ বেশি শক্তিশালী, ফলে জ্যাম করা কঠিন।

৪. সবচেয়ে বড় উদাহরণ: ম্যাগনেটিক টেপ ও ফ্লপি ডিস্ক
২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী র‍্যানসামওয়্যার হামলায় ক্ষতি হয়েছে ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। হ্যাকাররা আপনার কম্পিউটারে ঢুকে সব ফাইল এনক্রিপ্ট করে টাকা দাবি করে। কিন্তু ১৯৫০ সালে আবিষ্কৃত ম্যাগনেটিক টেপে যদি আপনার ব্যাকআপ থাকে, তাহলে সেটি অফলাইনে থাকে, ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত নয়। হ্যাকার চাইলেও সেটি এনক্রিপ্ট করতে পারবে না। তাই গুগল, অ্যামাজন এবং বিশ্বের সব বড় ব্যাংক এখনো তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডেটা ম্যাগনেটিক টেপে ব্যাকআপ রাখে।

আরও চমকপ্রদ তথ্য হলো, ২০১৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চলত ৮ ইঞ্চি ফ্লপি ডিস্কে! কারণ ফ্লপি ডিস্কে ইন্টারনেট থেকে হ্যাক করা যায় না।

৫. নির্বাচনে কাগজের ব্যালট
এস্তোনিয়া ছাড়া ইউরোপের প্রায় সব গণতান্ত্রিক দেশ, যেমন জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। তাদের যুক্তি – ডিজিটাল ভোটে একটি ভাইরাস দিয়ে পুরো নির্বাচন পাল্টে দেওয়া সম্ভব, কিন্তু কাগজের ব্যালটে একটি একটি করে জালিয়াতি করতে হয়, যা প্রায় অসম্ভব।

তাহলে কি আমাদেরও পুরোনোতে ফিরে যাওয়া উচিত?
উত্তরটি হলো – না, পুরোপুরি নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণ মানুষের জন্য সবসময় হালনাগাদ, প্যাচযুক্ত আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ। কারণ আধুনিক সফটওয়্যারে প্রতিদিন নিরাপত্তা আপডেট আসে।

কিন্তু আপনি যদি সাংবাদিক, অ্যাকটিভিস্ট, ব্যবসায়ী বা এমন কেউ হন যার কাছে অত্যন্ত গোপন তথ্য আছে, তাহলে কৌশলগতভাবে কিছু কাজের জন্য পুরোনো প্রযুক্তি ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন –

অত্যন্ত গোপন আলোচনার জন্য একটি ফিচার ফোন।
ক্রিপ্টো ওয়ালেটের পাসওয়ার্ড বা জমির দলিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একটি অফলাইন টেপ বা কাগজে লিখে রাখা।
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশনের জন্য SMS-এর বদলে হার্ডওয়্যার কি ব্যবহার করা।

প্রযুক্তি যত আধুনিক হচ্ছে, হ্যাকিংও ততটাই সহজ এবং স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে। এআই দিয়ে এখন একটি ইমেইল লিখেই হাজার মানুষকে বোকা বানানো যাচ্ছে। এই অবস্থায়, হ্যাকারদের চোখের আড়ালে থাকতে পুরোনো, বিরক্তিকর, অপ্রচলিত প্রযুক্তিই হয়তো হয়ে উঠছে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সুরক্ষা-দুর্গ। এটি পশ্চাৎপদতা নয়, এটি হলো টিকে থাকার এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল।

প্রকাশিত :  ‍বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy