যেসব অ্যাপ থাকলে হ্যাকড হতে পারে ফোন ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট

তথ্য প্রযুক্তি কণ্ঠ  ডেস্ক :

বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন শুধু ফোন নয়, আমাদের ব্যাংক, অফিস, ব্যক্তিগত ছবি, ফেসবুক, বিকাশ-নগদের সবকিছু। হ্যাকাররা এই সুযোগটাই নিচ্ছে। তারা প্লে-স্টোর বা বিভিন্ন লিংকের মাধ্যমে এমন কিছু অ্যাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে, যেগুলো ইন্সটল করার সাথে সাথেই আপনার ফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে তাদের হাতে। আপনার অজান্তেই ব্যাংক থেকে টাকা গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

চলুন জেনে নেই কোন ধরনের অ্যাপগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক এবং কিভাবে বাঁচবেন।

১. ভুয়া লোন অ্যাপ (Instant Loan App)
এটি বর্তমানে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। “৫ মিনিটে ৫০ হাজার টাকা লোন” – ফেসবুকে এমন বিজ্ঞাপন দেখলেই অনেকে ক্লিক করেন। অ্যাপটি ইন্সটল করার পর আপনার ছবি, NID, এবং ফোনের সমস্ত পারমিশন চায়।

কিভাবে হ্যাক করে: আপনি পারমিশন দিলেই অ্যাপটি আপনার কন্টাক্ট লিস্ট, গ্যালারি, SMS, এমনকি বিকাশ/ব্যাংকের OTP পড়তে শুরু করে। লোন না দিলেও পরে আপনাকে ব্ল্যাকমেইল করে। অনেক অ্যাপে আছে Spyware, যা ব্যাকগ্রাউন্ডে চলতে থাকে।

উদাহরণ: Rapid Cash, Easy Loan, Cash Boss, Golden Cash – নামগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করে।

২. ভুয়া ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ
প্লে-স্টোরে আসল বিকাশ, নগদ, বা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের লোগো হুবহু নকল করে ভুয়া অ্যাপ আপলোড করা হয়।

কিভাবে হ্যাক করে: আপনি আসল মনে করে লগইন করলেন, আপনার পিন, পাসওয়ার্ড সরাসরি চলে গেল হ্যাকারের সার্ভারে। এরপর আপনার একাউন্ট খালি। অনেক সময় অ্যাপটি বলে “আপডেট ভার্সন” বা “নতুন অফার”।

৩. স্ক্রিন শেয়ারিং অ্যাপ – AnyDesk, TeamViewer, RustDesk
এগুলো আসলে ভালো অ্যাপ, কিন্তু প্রতারণার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে। আপনাকে কেউ ফোন করে বলবে “আমি বিকাশ থেকে বলছি” বা “আমি ব্যাংক থেকে বলছি, আপনার একাউন্ট ভেরিফাই করতে হবে, AnyDesk ইন্সটল করুন”।

কিভাবে হ্যাক করে: আপনি AnyDesk এর কোড দিলেই হ্যাকার পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে আপনার ফোনের স্ক্রিন দেখতে পাবে, কন্ট্রোল করতে পারবে। আপনি বিকাশে পিন দিচ্ছেন, সে দেখে ফেলছে। এটাকে বলে Remote Access Scam।

মনে রাখবেন: কোনো ব্যাংক বা বিকাশ কখনো আপনাকে AnyDesk ইন্সটল করতে বলবে না।

৪. কিবোর্ড অ্যাপ ও কাস্টমাইজেশন অ্যাপ
“Stylish Bangla Keyboard”, “Free Emoji Keyboard”, “Cool Fonts” – এমন হাজারো কিবোর্ড প্লে-স্টোরে আছে।

কিভাবে হ্যাক করে: কিবোর্ড হলো আপনার ফোনের সবচেয়ে সেনসিটিভ জায়গা। আপনি যা টাইপ করেন – ব্যাংক পাসওয়ার্ড, ফেসবুক পাসওয়ার্ড, সবকিছু এই কিবোর্ড পড়তে পারে। এগুলোকে Keylogger বলে।

শুধুমাত্র Gboard (Google) বা SwiftKey এর মতো বিশ্বস্ত কিবোর্ড ব্যবহার করুন।

৫. APK ফাইল – হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুকের বাইরে থেকে পাঠানো লিংক
আপনার বন্ধু হঠাৎ লিংক পাঠালো “দেখো তোমার ছবি ভাইরাল হয়েছে” – viral-video.apk বা “নতুন ভোটার লিস্ট” – voter-list.apk

কিভাবে হ্যাক করে: এগুলো APK ফাইল। ইন্সটল করলেই আপনার ফোনে Trojan ঢুকে যায়। এই ট্রোজান আপনার SMS থেকে ব্যাংকের OTP চুরি করে নেয়, এবং আপনার ফোন থেকে আপনার সব কন্টাক্টে একই লিংক পাঠাতে থাকে।

৬. ফ্রি VPN, ফ্রি অ্যান্টিভাইরাস ও ক্লিনার অ্যাপ
“Free VPN – Unlimited”, “Super Cleaner”, “Battery Saver Pro” – এই অ্যাপগুলো ফ্রিতে কিছুই দেয় না।

কিভাবে হ্যাক করে: এগুলোর কাজই হলো ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনার ডাটা চুরি করা। আপনার ফোনে কোন ব্যাংকের অ্যাপ আছে, আপনি কোন ওয়েবসাইটে ঢুকছেন, সব তথ্য পাচার করে। অনেক ক্লিনার অ্যাপে adware থাকে যা আপনার অজান্তে টাকা কেটে নেওয়া সাবস্ক্রিপশনে আপনাকে যুক্ত করে দেয়।

৭. ক্র্যাকড অ্যাপ / মডিফাইড অ্যাপ
CapCut Pro Free, YouTube Premium Free, Bikash Mod – গুগলে সার্চ করে টাকা না দিয়ে প্রিমিয়াম অ্যাপ ব্যবহার করতে চান? হ্যাকাররা এখানেই ফাঁদ পাতে।

এই Mod APK গুলোর ভিতরে Banking Trojan যেমন – SharkBot, Cerberus, Anatsa লুকানো থাকে। আপনি অ্যাপ ব্যবহার করছেন, ওদিকে আপনার বিকাশের টাকা ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছে।

হ্যাকড হয়েছেন কিনা বুঝবেন কিভাবে?
১. ফোন হঠাৎ গরম হয়ে যাচ্ছে, চার্জ দ্রুত শেষ হচ্ছে, আপনি ব্যবহার না করলেও ডাটা শেষ হচ্ছে।
২. আপনার না পাঠানো SMS সেন্ট বক্সে দেখা যাচ্ছে।
৩. ব্যাংক থেকে OTP এর SMS আসছে, যা আপনি চাননি।
৪. ফোনে এমন অ্যাপ দেখছেন যা আপনি ইন্সটল করেননি।
৫. বিকাশ/নগদ থেকে ছোট ছোট টাকা কেটে নেওয়ার SMS আসছে।

বাঁচার উপায় – যা আজই করবেন
১. পারমিশন চেক করুন: Settings > Apps > Permission Manager এ গিয়ে দেখুন কোন অ্যাপ SMS, Contact, Accessibility এর পারমিশন নিয়ে রেখেছে। অপ্রয়োজনীয় অ্যাপের পারমিশন এখনই বন্ধ করুন। বিশেষ করে Accessibility Permission কোনো লোন অ্যাপ বা অচেনা অ্যাপকে কখনো দেবেন না।

২. শুধু প্লে-স্টোর থেকে অ্যাপ নিন: তাও ডাউনলোডের আগে ডেভেলপারের নাম, রিভিউ, ডাউনলোড সংখ্যা দেখে নিন। ১০ হাজার ডাউনলোডের ভুয়া বিকাশ অ্যাপ ইন্সটল করবেন না।

৩. Google Play Protect অন রাখুন: Play Store > Profile > Play Protect > Scan অন রাখুন।

৪. অচেনা APK কখনোই ইন্সটল করবেন না: Settings > Install Unknown Apps অপশনটি বন্ধ রাখুন।

৫. ব্যাংকিং অ্যাপে ২ স্টেপ ভেরিফিকেশন ও Biometric লক ব্যবহার করুন।

৬. ফোনে একটি ভালো অ্যান্টিভাইরাস নয়, বরং সচেতনতা রাখুন। প্রতি মাসে একবার Settings > Apps এ গিয়ে অচেনা অ্যাপ আছে কিনা চেক করুন।

যদি মনে করেন আপনার ফোন হ্যাকড হয়েছে, সাথে সাথে ফোনটি ফ্লাইট মোডে দিন, অন্য একটি ফোন থেকে ব্যাংকের হেল্পলাইনে কল করে আপনার একাউন্ট সাময়িক বন্ধ করুন, বিকাশ/নগদের পিন পরিবর্তন করুন এবং ফোনটি ফ্যাক্টরি রিসেট করুন।

মনে রাখবেন, হ্যাকাররা অ্যাপ বানায় না, তারা আপনার লোভ এবং অসচেতনতাকে ব্যবহার করে। ফ্রি লোন, ফ্রি টাকা, ফ্রি ভিপিএন – এই ফ্রি শব্দটাই সবচেয়ে বড় ফাঁদ।

প্রকাশিত :  ‍শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy