বিড়াল আঁচড় দিলে কি কি বিপদ হতে পারে? কতক্ষণ সময় লাগে?

বিড়ালের আঁচড় ছোট মনে হলেও এটা থেকে বেশ কিছু বিপদ হতে পারে, বিশেষ করে যদি বিড়ালটি রাস্তার হয় বা ভ্যাকসিন দেওয়া না থাকে।

বিড়াল আঁচড়ালে কি কি বিপদ হতে পারে?
১. সাধারণ ক্ষত সংক্রমণ (Infection):
বিড়ালের নখে অনেক ব্যাকটেরিয়া থাকে। আঁচড়ের জায়গা লাল হয়ে ফুলে যাওয়া, ব্যথা, পুঁজ হওয়া। এটা সবচেয়ে কমন বিপদ।

২. ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ (Cat Scratch Disease):
এর জন্য দায়ী Bartonella henselae নামক ব্যাকটেরিয়া। আঁচড়ের জায়গার কাছের লসিকা গ্রন্থি (বগল, গলা, কুঁচকি) ফুলে যায়, জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা লাগে।

৩. টিটেনাস (Tetanus):
যদি আপনার টিটেনাস টিকার মেয়াদ ৫ বছরের বেশি হয়ে যায় এবং ক্ষত গভীর ও নোংরা হয়, তাহলে টিটেনাসের ঝুঁকি থাকে।

৪. জলাতঙ্ক (Rabies) – সবচেয়ে মারাত্মক:
শুধু কামড় নয়, যদি বিড়াল তার থাবা চেটে থাকে এবং সেই থাবা দিয়ে আঁচড় দেয়, আর সেই বিড়ালটি জলাতঙ্ক আক্রান্ত হয়, তাহলে জলাতঙ্কের ঝুঁকি থাকে। পোষা বিড়ালের ভ্যাকসিন করা থাকলে এই ঝুঁকি প্রায় নেই, কিন্তু রাস্তার বিড়ালের ক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। জলাতঙ্ক হলে মৃত্যুর হার ১০০%।

লক্ষণ দেখা দিতে কতক্ষণ সময় লাগে?
সাধারণ ইনফেকশন: ২৪ ঘণ্টা থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে – জায়গাটা লাল, গরম, ফোলা।
ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ: আঁচড়ের ৩ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে, কখনো কখনো ৩ সপ্তাহ পরেও – প্রথমে আঁচড়ের জায়গায় ছোট ফোসকা, তারপর গ্রন্থি ফুলে যাওয়া ও জ্বর।

টিটেনাস: ৩ থেকে ২১ দিনের মধ্যে।
জলাতঙ্ক: সাধারণত ১ থেকে ৩ মাসের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়, তবে ক্ষত মাথার কাছাকাছি হলে আরও দ্রুত হতে পারে।
আঁচড় দিলে সাথে সাথে কী করবেন?
১. সাবান দিয়ে ধোয়া: সাথে সাথে পরিষ্কার পানি ও কাপড় কাচা সাবান দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ক্ষতস্থান ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
২. অ্যান্টিসেপটিক: পভিডন আয়োডিন বা হেক্সিসল লাগান। ক্ষত খোলা রাখবেন না, পরিষ্কার ব্যান্ডেজ করুন।
৩. নখ দিয়ে চাপবেন না বা মুখ লাগাবেন না।

কখন দ্রুত ডাক্তারের কাছে যাবেন?
বিড়ালটি রাস্তার / অচেনা / ভ্যাকসিন ছাড়া হলে
আঁচড় গভীর হলে বা অনেক রক্ত বের হলে
২৪ ঘণ্টার মধ্যে জায়গাটা অতিরিক্ত ফুলে গেলে, পুঁজ হলে বা জ্বর আসলে
আপনার টিটেনাস টিকা ৫ বছরের বেশি আগে দেওয়া থাকলে
বাচ্চা, বয়স্ক বা ডায়াবেটিস রোগীর আঁচড় লাগলে

ডাক্তার ক্ষত দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন আপনার টিটেনাস টিকা বা জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন (Rabies Vaccine) লাগবে কি না। নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করবেন না।

পোষা বিড়াল হলে ভয় অনেকটাই কম, তবে একেবারে অবহেলা করবেন না।

যেহেতু পোষা বিড়াল, তাই জলাতঙ্কের ঝুঁকি ৯৯% কমে যায় যদি বিড়ালটিকে নিয়মিত জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দেওয়া থাকে এবং সে বাইরে অন্য বিড়াল/কুকুরের সাথে মারামারি না করে।

পোষা বিড়ালের আঁচড়ে মূলত ২টা সমস্যা হয়:
১. সাধারণ ইনফেকশন: এটাই সবচেয়ে বেশি হয়। ২৪-৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আঁচড়ের জায়গা লাল, ফুলে যাওয়া।
২. ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ: পোষা বিড়াল থেকেও এটা হতে পারে। আঁচড়ের ৩-১৪ দিন পর জ্বর, আঁচড়ের কাছের গ্ল্যান্ড ফুলে যাওয়া।

এখন কী করবেন?
১. ভ্যাকসিনের হিসাব দেখুন:
আপনার বিড়ালকে কি গত ১ বছরের মধ্যে জলাতঙ্ক (Rabies) ভ্যাকসিন দিয়েছেন?

দেওয়া থাকলে জলাতঙ্ক নিয়ে টেনশন নেই।
দেওয়া না থাকলে বা মনে না থাকলে, একজন ডাক্তারের সাথে কথা বলে নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ। ডাক্তারই বলে দেবেন ভ্যাকসিন লাগবে কি না।
২. ক্ষতের যত্ন:
সাবান-পানি দিয়ে ১৫ মিনিট ধুয়ে পভিডন আয়োডিন লাগিয়ে দিন। আগামী ২-৩ দিন খেয়াল রাখুন – লাল দাগ বাড়ছে কি না, পুঁজ হচ্ছে কি না, জ্বর আসছে কি না।

৩. টিটেনাস:
আপনার নিজের টিটেনাস টিকা যদি গত ৫ বছরের মধ্যে না নিয়ে থাকেন, তাহলে একটা টিটেনাস টিকা নিয়ে নেওয়া ভালো।

ভবিষ্যতে যেন আবার না হয়
বিড়ালকে ৩ মাস বয়সের পর অবশ্যই জলাতঙ্ক ও অন্যান্য ভ্যাকসিন দিয়ে নিন এবং প্রতি বছর বুস্টার দিন।
প্রতি ২-৩ সপ্তাহ পর পর নখ কেটে দিন।
বিড়াল নিয়ে খেলার সময় হাত দিয়ে না খেলে খেলনা দিয়ে খেলুন।
বিড়ালকে কৃমির ওষুধ ও গোসল করানোর বিষয়টা নিয়মিত রাখুন।
যদি আঁচড়ের জায়গা ২ দিনের মধ্যে শুকিয়ে যায় এবং কোনো ফোলা বা জ্বর না আসে, তাহলে চিন্তার কিছু নেই।

আপনার বিড়ালের ভ্যাকসিন দেওয়া আছে কি?

ভ্যাকসিন দেওয়া না থাকলে অবহেলা করবেন না, আজকেই একজন ডাক্তারের কাছে যান।

পোষা হলেও ভ্যাকসিন ছাড়া বিড়ালের আঁচড় থেকে জলাতঙ্কের ঝুঁকি থেকেই যায়। কারণ বিড়াল মুখ দিয়ে পা চাটে, আর যদি তার শরীরে ভাইরাস থাকে তাহলে নখের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। জলাতঙ্কের কোনো চিকিৎসা নেই, কিন্তু সময়মতো ভ্যাকসিন নিলে ১০০% প্রতিরোধ করা যায়।

আপনার এখন করণীয় ৩টা:
১. আপনি ডাক্তারের কাছে যান (আজকেই):
আপনার নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা জেলা সদর হাসপাতালে যান। ডাক্তারকে বলবেন “ভ্যাকসিন ছাড়া পোষা বিড়াল আঁচড় দিয়েছে”। সরকারি হাসপাতালে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেয়। ডাক্তার ক্ষত দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন ভ্যাকসিন লাগবে কি না। দেরি করবেন না।

২. বিড়ালটিকে ১০ দিন পর্যবেক্ষণে রাখুন:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, আঁচড় দেওয়া বিড়ালকে ১০ দিন আলাদা করে বেঁধে বা ঘরে রেখে খেয়াল রাখতে হয়। এই ১০ দিনের মধ্যে বিড়ালটি যদি সুস্থ থাকে, খাওয়া-দাওয়া স্বাভাবিক থাকে, তাহলে বড় ঝুঁকি নেই। যদি অসুস্থ হয়ে যায়, পাগলের মতো আচরণ করে, বা মারা যায় – সাথে সাথে ডাক্তারকে জানাতে হবে। বিড়ালটিকে মারবেন না বা ফেলে দেবেন না।

৩. বিড়ালকে ভ্যাকসিন দিন:
১০ দিন পর্যবেক্ষণের পর বিড়াল সুস্থ থাকলে নিকটস্থ প্রাণী হাসপাতাল বা ভেটেরিনারি ফার্মেসি থেকে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন দিয়ে দিন। বয়স ৩ মাসের বেশি হলেই দেওয়া যায়। এরপর প্রতি ১ বছর পর পর দিতে হবে।

ক্ষতের যত্ন: আগের মতোই সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার রাখুন। যদি লাল হয়ে ফুলে যায় বা জ্বর আসে, সেটা ইনফেকশনের লক্ষণ, সেটার জন্যও ডাক্তার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে পারেন।

ভয় পাবেন না, কিন্তু কালকের জন্য ফেলে রাখবেন না। আজকের মধ্যেই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে একবার কথা বলে আসুন – এটাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত হবে।

প্রকাশিত : রোববার, ২৬ জুলাই ২০২৬

.

You might like

About the Author: priyoshomoy