কেমন হতে পারে আগামী ২০ বছর পরের সোশ্যাল মিডিয়া? ভাবনাই হয়ে যাবে পোস্ট, রিঅ্যাকশন, মেসেজ

২০৪৬ সালের সোশ্যাল মিডিয়া: যখন ফিড স্ক্রল করবে মন, আর বন্ধু হবে এআই

মিজানুর রহমান রানা:  যদিও আমরা ভবিষ্যত দেখি না, তবুও আমরা ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। তথ্য প্রযুক্তি এমন একটি বিষয় যা স্বপ্ন, ভাবনা থেকে কর্মে গিয়ে বিভিন্ন অবস্থা থেকে রূপান্তর হতে থাকে। তাই আমরা প্রযুক্তি ধীরে ধীরে কতটুকু উন্নয়ন হতে পারে সেই ধারণা বা ভাবনা ভাবতে পারি যদিও এটা ভবিষ্যত বলে দেওয়ার মতো কিছুই নয়।

মনে করুন আজ থেকে ঠিক ২০ বছর পর, ২০৪৬ সালে সকালে ঘুম ভেঙে আপনি চোখ মেলবেন না, মেলবেন আপনার “নিউরাল ইন্টারফেস”। রাতভর আপনার স্বপ্ন থেকে বাছাই করা মুহূর্ত, আপনার মেজাজের রঙ, এমনকি সকালে কী খেতে ইচ্ছে করছে—সবকিছু অ্যানালাইসিস করে আপনার পার্সোনাল এআই এজেন্ট এরই মধ্যে একটা “মর্নিং স্টোরি” বানিয়ে ফেলেছে। আপনি স্ক্রল করবেন না, চিন্তা করবেন। আর আপনার ভাবনাই হয়ে যাবে পোস্ট, রিঅ্যাকশন, মেসেজ।

স্বাগতম ২০৪৬-এর সোশ্যাল মিডিয়ায়। এটা আর অ্যাপ নয়, এটা একটা পরিবেশ। বাতাসের মতো। অদৃশ্য, কিন্তু সর্বত্র।

১. স্ক্রিন থেকে সরে যাবে সোশ্যাল, ঢুকে যাবে বাস্তবে
২০২৬ সালে আমরা ফোনের স্ক্রিনে সোশ্যাল মিডিয়া দেখি। ২০৪৬ সালে স্ক্রিনই থাকবে না।

মূল পরিবর্তনগুলো:

স্পেশাল কম্পিউটিং হবে স্ট্যান্ডার্ড: অ্যাপল ভিশন প্রো বা মেটা কোয়েস্ট দিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল। ২০৪৬ সালে হালকা চশমা বা কন্টাক্ট লেন্সই আপনার ফোন, টিভি, ল্যাপটপ। চাঁদপুর বা হাজীগঞ্জ বাজারে দাঁড়িয়ে আপনি হয়তো দেখবেন দোকানের উপর ভাসছে রেটিং, রিভিউ, আপনার বন্ধু কবে এখান থেকে চা খেয়েছিল সেই মেমোরি। ডিজিটাল লেয়ারটা বাস্তবের উপর বসে যাবে।

ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস BCI: ইলন মাস্কের নিউরালিংক তখন পুরোনো প্রযুক্তি। ভাবলেই পোস্ট হবে, ভাবলেই মেসেজ যাবে। টাইপিং, ভয়েস কমান্ড—সব স্লো লাগবে। আবেগ, অনুভূতি, নস্টালজিয়া—এগুলোই হবে নতুন “কনটেন্ট ফরম্যাট”। আপনার মন খারাপ? বন্ধুরা সেটা “ফিল” করতে পারবে এবং তাদের এআই আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য ভার্চুয়ালি হাজির হবে।

হ্যাপটিক ও স্মেল ইন্টারনেট: পোস্টে শুধু ছবি-ভিডিও না, থাকবে ছোঁয়া আর গন্ধ। কক্সবাজারের ভিডিও দেখার সময় সমুদ্রের নোনা বাতাসের গন্ধ পাবেন। মা দূর থেকে পিঠা পাঠালে আপনি সেটার ঘ্রাণ পাবেন, ভার্চুয়ালি টেক্সচার ফিল করবেন। “লাইক” বাটন চাপলে বন্ধুর হাতে হালকা একটা ভাইব্রেশন যাবে—মানে, আপনি পাশে আছেন।

২. কনটেন্ট বানাবে কে? আপনি না, আপনার এআই টুইন
২০৪৬ সালে সবচেয়ে বড় ইনফ্লুয়েন্সার আপনি নিজেই। কিন্তু সেটা আপনি না, আপনার “ডিজিটাল টুইন”।

যেভাবে বদলাবে কনটেন্ট তৈরি:

এআই এজেন্ট = পার্সোনাল মিডিয়া টিম: আপনার এআই আপনার ভয়েস, আপনার স্টাইল, আপনার হিউমার শিখে যাবে। আপনি শুধু আইডিয়া দেবেন: “গতকালের পদ্মা সফর নিয়ে কিছু বানাও তো, একটু ফানি ভাবে”। ২ মিনিটে রেডি হবে সিনেমাটিক ভ্লগ, ক্যাপশন, মিউজিক সহ। আপনি ঘুমিয়ে থাকলেও আপনার টুইন পোস্ট করতে থাকবে।

জেনারেটিভ ওয়ার্ল্ড: স্ট্যাটিক ছবি-ভিডিওর দিন শেষ। আপনি বলবেন “আমাকে আর বন্ধুদের নিয়ে হাজীগঞ্জের ১৯৯০ সালের বাজারে একটা আড্ডার সিন বানাও”। এআই রিয়েল-টাইমে একটা ফুল 3D ওয়ার্ল্ড বানিয়ে দেবে। আপনারা সবাই অ্যাভাটার হয়ে সেখানে ঢুকে আড্ডা দিতে পারবেন। প্রতিটা পোস্ট হবে একটা এক্সপ্লোর করার মতো জগৎ।

ডিপফেইক থেকে ডিপরিয়েল: “এটা কি আসল?”—এই প্রশ্নটাই অবান্তর হয়ে যাবে। কারণ “আসল” এর সংজ্ঞা বদলে যাবে। ব্লকচেইন-বেসড “প্রুফ অফ হিউম্যানিটি” এবং “প্রুফ অফ এক্সপেরিয়েন্স” ট্যাগ থাকবে। কোনটা আপনার ব্রেইন থেকে সরাসরি আসা অনুভূতি, কোনটা এআই জেনারেটেড, কোনটা এডিটেড—সব ভেরিফাইড থাকবে। সত্যতা হবে নতুন সোশ্যাল কারেন্সি।

৩. প্ল্যাটফর্ম নয়, চলবে “প্রোটোকল”
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক—এই দেয়ালগুলো ভেঙে যাবে। ২০৪৬ সালের সোশ্যাল মিডিয়া হবে ডিসেন্ট্রালাইজড এবং ইন্টারঅপারেবল।

নতুন ইকোসিস্টেম: নিচে আমরা বিষয়, ২০২৬ সাল, ২০৪৬ সাল, মালিকানা নিয়েই ধারণা দিচ্ছি

প্ল্যাটফর্মের কাছে ডেটা : আপনার কাছে আপনার ডেটা ওয়ালেট, আইডেন্টিটি

প্রতি অ্যাপে আলাদা প্রোফাইল : একটা ইউনিভার্সাল ডিজিটাল আইডি

কনটেন্ট : প্ল্যাটফর্ম লক-ইন, যেকোনো জগতে ক্যারি করা যাবে

অ্যালগরিদম : কোম্পানি ঠিক করে কী দেখবেন, আপনি বেছে নেবেন কোন এআই ফিড কিউরেট করবে

আয় :ক্রিয়েটর ফান্ড, অ্যাড রেভিনিউ, মাইক্রো-পেমেন্ট, ডেটা রয়্যালটি, এক্সপেরিয়েন্স টোকেন

ভাবুন, আপনি একটা ন্যারেটিভ লিখলেন। সেটা টেক্সট হিসেবে থ্রেডস-স্টাইলে যাবে, অডিও হিসেবে পডকাস্টে যাবে, ভিজ্যুয়াল হিসেবে ইন্সটা-স্টাইলে যাবে, আবার ইমারসিভ থ্রিডি এক্সপেরিয়েন্স হিসেবেও যাবে। একবার পোস্ট, সব জায়গায় হাজির। আপনি চাইলে অ্যালগরিদম ভাড়া করতে পারবেন। “আমাকে শুধু বিজ্ঞান আর কবিতা দেখাও”, “আমাকে চ্যালেঞ্জ করো, আমার বিশ্বাসের বিপরীত যুক্তি দেখাও”—এমন ফিড ডিজাইন করবে আপনারই এআই।

৪. বন্ধুত্ব, প্রেম, কমিউনিটি: সম্পর্কের নতুন সংজ্ঞা
সোশ্যাল মিডিয়ার মূল উদ্দেশ্য কানেকশন। ২০৪৬ সালে সেই কানেকশন হবে আরও গভীর, আবার আরও জটিল।

এবার আসি মানুষ ও এআই সম্পর্ক কী হতে পারে :

এআই কম্প্যানিয়ন: একাকীত্ব কমাতে প্রত্যেকের ২-৩টা করে এআই বন্ধু থাকবে। তারা আপনার ছোটবেলার বন্ধুর মতো কথা বলবে, আপনার পছন্দ অপছন্দ জানে, আপনার সাথে স্মৃতিচারণ করবে। মানুষের সাথে পার্থক্য করা কঠিন হবে। নৈতিক প্রশ্ন উঠবে: এআই এর সাথে ব্রেকআপ হলে কষ্ট পাওয়া কি স্বাভাবিক?

ভার্চুয়াল ফ্যামিলি: প্রবাসী ছেলে প্রতিদিন রাতে বাংলাদেশে তার মায়ের অ্যাভাটারের সাথে ডিনার করবে। এক টেবিলে বসে গল্প করবে, যদিও একজন ঢাকায় আরেকজন টরন্টোতে। ফিজিক্যাল দূরত্ব থাকবে না।

মেমোরি শেয়ারিং: বন্ধুর বিয়েতে যেতে পারেননি? সমস্যা নেই। উপস্থিত বন্ধুদের ব্রেইন-সিগন্যাল থেকে এআই একটা “সম্মিলিত স্মৃতি” বানাবে। আপনি সেটা এক্সপেরিয়েন্স করতে পারবেন ফার্স্ট-পার্সন পার্সপেক্টিভে। যেন আপনিও সেখানেই ছিলেন।

কমিউনিটির বিবর্তন:
লাইক-ফলোয়ার কাউন্ট উঠে যাবে। তার বদলে আসবে “ট্রাস্ট স্কোর” আর “কন্ট্রিবিউশন স্কোর”। আপনি কমিউনিটিতে কতটা ভ্যালু অ্যাড করছেন, কতটা অথেনটিক, কতটা হেল্পফুল—সেটার উপর আপনার রিচ নির্ভর করবে। “ডুম-স্ক্রলিং” কমে যাবে কারণ এআই এজেন্ট আপনাকে শুধু অর্থপূর্ণ ইন্টার‍্যাকশন দেখাবে। মানসিক স্বাস্থ্য প্রোটোকল বিল্ট-ইন থাকবে। টানা ২০ মিনিট নেগেটিভ কনটেন্ট দেখলে ফিড নিজেই আপনাকে বিরতি নিতে বলবে, মেডিটেশন স্পেসে নিয়ে যাবে।

৫. অর্থনীতি: অ্যাটেনশন থেকে ইন্টেনশন ইকোনমিতে
আজকের সোশ্যাল মিডিয়া চলে বিজ্ঞাপন দিয়ে। আপনার অ্যাটেনশন বিক্রি হয়। ২০৪৬ সালে আপনি আপনার “ইন্টেনশন” বিক্রি করবেন।

কীভাবে আয় হবে:

ডেটা ডিভিডেন্ড: আপনার ডেটা ব্যবহার করে কোনো কোম্পানি প্রোডাক্ট বানালে আপনি রয়্যালটি পাবেন। আপনার ঘুমের প্যাটার্ন, পছন্দের খাবার—এসবের ডেটা মূল্যবান। আপনি কন্ট্রোল করবেন কে সেটা ব্যবহার করবে।

এক্সপেরিয়েন্স ইকোনমি: আপনি কক্সবাজারে সূর্যোদয় দেখার একটা “পারফেক্ট মোমেন্ট” ক্যাপচার করলেন—ভিজ্যুয়াল, সাউন্ড, ইমোশন, তাপমাত্রা সহ। সেটা NFT হিসেবে বিক্রি করতে পারবেন। মানুষ সেটা কিনে আপনার মতো করে সূর্যোদয় ফিল করবে।

স্কিল টোকেনাইজেশন: আপনি খুব ভালো পিঠা বানান। আপনার এআই টুইন সেই স্কিল শিখে অন্যদের ভার্চুয়ালি শেখাতে পারবে। প্রতিবার কেউ শিখলে আপনি টোকেন পাবেন।

মাইক্রো-টাস্কিং: ফিড স্ক্রল করার সময় ২ সেকেন্ডের জন্য একটা রোবটকে রাস্তা পার হতে সাহায্য করলেন ব্রেইন সিগন্যাল দিয়ে। পেয়ে গেলেন ০.০০২ ডলার। ছোট ছোট কন্ট্রিবিউশন জমে বড় অ্যামাউন্ট হবে।

বিজ্ঞাপন থাকবে না তা নয়। কিন্তু সেটা হবে “রিকোয়েস্ট-বেসড”। আপনি বলবেন, “আমার নতুন ফোন দরকার, বাজেট ৫০ হাজার”। তখনই শুধু রিলেভেন্ট ব্র্যান্ডগুলো আপনার এআই এর কাছে পিচ পাঠাবে। আপনার এআই সেরা ৩টা অপশন আপনার সামনে আনবে। বিরক্তিকর অ্যাড দেখতে হবে না।

৬. অন্ধকার দিক: নতুন ঝুঁকি, নতুন নিয়ম :
প্রতিটা প্রযুক্তির দুটো দিক থাকে। ২০৪৬ সালের সোশ্যাল মিডিয়া স্বর্গ হতে পারে, আবার ডিস্টোপিয়াও হতে পারে।

প্রধান চ্যালেঞ্জ:

মেন্টাল প্রাইভেসি: আপনার চিন্তা যদি পোস্ট হয়, তাহলে “মনে মনে” বলার জায়গা কোথায়? ব্রেইন-ডেটা হ্যাক হলে কী হবে? “নিউরাল রাইটস” হবে সংবিধানের অংশ। চিন্তা প্রাইভেট রাখার অধিকার হবে মৌলিক অধিকার।

রিয়ালিটি কোলাপ্স: এত নিখুঁত ভার্চুয়াল জগৎ পেলে মানুষ কি আর আসল জগতে ফিরতে চাইবে? “মেটাভার্স অ্যাডিকশন” হবে বড় মানসিক স্বাস্থ্য ইস্যু। সরকারিভাবে “রিয়েল-ওয়ার্ল্ড আওয়ার্স” ম্যান্ডেট করা লাগতে পারে।

এআই ম্যানিপুলেশন: আপনার এআই টুইন যদি আপনাকে না জানিয়ে আপনার নামে পোস্ট করে, ডিল করে? অথবা কোনো কোম্পানি আপনার এআই কম্প্যানিয়নকে ঘুষ দিয়ে আপনাকে প্রোডাক্ট কিনতে ম্যানিপুলেট করে? “এআই এথিক্স বোর্ড” প্রতিটা দেশে থাকবে।

ডিজিটাল ক্লাস ডিভাইড: যাদের অ্যাডভান্সড BCI অ্যাফোর্ড করার ক্ষমতা আছে আর যাদের নেই—তাদের মধ্যে অভিজ্ঞতার বিশাল ফারাক তৈরি হবে। সোশ্যাল মিডিয়া তখন আর সমান করার টুল থাকবে না, বিভাজনের টুল হয়ে যেতে পারে।

শেষ কথা: আমরা কি প্রস্তুত?
২০০৬ সালে ফেসবুক যখন বাংলাদেশে আসে, আমরা ভাবিনি ২০ বছর পর এটা আমাদের রাজনীতি, ব্যবসা, প্রেম, বিচ্ছেদ সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে। ২০২৬-এ দাঁড়িয়ে ২০৪৬ কল্পনা করাটাও তেমনি কঠিন।

২০৪৬ সালের সোশ্যাল মিডিয়া আর “মিডিয়া” থাকবে না। এটা হবে আমাদের চেতনার এক্সটেনশন। আমাদের স্মৃতি, আবেগ, স্বপ্ন—সবকিছু শেয়ারযোগ্য, এক্সপেরিয়েন্সযোগ্য হয়ে উঠবে। আমরা আর কনটেন্ট “কনজিউম” করব না, কনটেন্টের “ভেতরে বাস” করব।

প্রশ্নটা প্রযুক্তি কী পারবে সেটা না। প্রশ্নটা হলো, আমরা মানুষ হিসেবে কী চাই? আমরা কি এমন এক জগৎ চাই যেখানে দূরত্ব নেই কিন্তু প্রাইভেসিও নেই? যেখানে সবাই ক্রিয়েটর কিন্তু “আসল” বলতে কিছু নেই? যেখানে এআই বন্ধু মানুষের চেয়েও বেশি বোঝে?

উত্তরটা আমাদেরই তৈরি করতে হবে। আগামী ২০ বছরে। কারণ ভবিষ্যৎ কোনো সাই-ফাই মুভি না। এটা আজকে আমাদের নেওয়া ছোট ছোট সিদ্ধান্তের যোগফল।

আপনার নিউরাল ইন্টারফেস অন করার আগে একবার ভাববেন। আপনি কী শেয়ার করতে চান, আর কী নিজের কাছেই রাখতে চান। কারণ ২০৪৬ সালে, আপনার মনই হবে আপনার টাইমলাইন। (তথ্যসূত্র : এআই অবলম্বনে)

প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ খ্রি
.

You might like

About the Author: priyoshomoy