গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন শিক্ষার্থী হারাচ্ছে?

বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের শিক্ষার ভিত্তি। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে গ্রামীণ এলাকার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অনেক বিদ্যালয় অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে। তাই এখনই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।

গ্রামের অনেক এলাকায় একটি বা দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও আশপাশের বাজার, সড়ক কিংবা জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কিন্ডারগার্টেন। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, আর সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে কমছে। এমন অনেক সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে পুরো স্কুলে ২০ জন শিক্ষার্থীও নেই।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা মনে করেন কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের প্রতি বেশি তদারকি করেন, নিয়মিত বাড়ির কাজ দেখেন, পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং মৌলিক বিষয়গুলোতে বেশি গুরুত্ব দেন। এ কারণেই অনেক অভিভাবক সরকারি বিদ্যালয়ের পরিবর্তে সন্তানদের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে আগ্রহী হচ্ছেন।
অন্যদিকে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে অনেক অভিভাবকের অভিযোগ রয়েছে। যদিও সরকারি শিক্ষকরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে সম্মানজনক বেতন-ভাতা পান এবং অনেক শিক্ষক অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, তবুও কিছু বিদ্যালয়ে প্রত্যাশিত মানের শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না-এমন অভিযোগও রয়েছে। শিক্ষার্থীদের প্রতি আরও বেশি যত্ন, নিয়মিত তদারকি, শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদান এবং আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি।

তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে, সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চিত্র এক নয়। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অত্যন্ত ভালো মানের পাঠদান হয় এবং সেখানকার শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ভালো ফলাফল অর্জন করছে। অনেক শিক্ষক নিষ্ঠা, দক্ষতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। মূল উদ্বেগের বিষয়টি গ্রামীণ এলাকার অনেক বিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষার্থী সংকট ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে।
আমাদের শৈশবের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা মনে পড়ে। তখন শিক্ষকরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে পড়াতেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি ব্যক্তিগত যত্ন নিতেন এবং শৃঙ্খলার বিষয়েও সচেতন ছিলেন। সময় বদলেছে, শিক্ষাদানের পদ্ধতিও বদলেছে। তাই বর্তমান সময়ের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক, আনন্দময় ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকারের উচিত গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া, শিক্ষার মান উন্নয়ন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কার্যকর প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। পাশাপাশি কেন শিক্ষার্থীরা সরকারি বিদ্যালয় ছেড়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে, সে বিষয়ে গবেষণা করে প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়াও জরুরি।

একটি শক্তিশালী জাতি গড়ার ভিত্তি হলো একটি শক্তিশালী প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা। তাই গ্রামীণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আবারও অভিভাবকদের আস্থার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।

আমার এই পর্যবেক্ষণ কেবল একজন লেখক বা সাংবাদিক হিসেবে নয়, বরং একজন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সাক্ষী হিসেবেও। আমি যে গ্রামে বেড়ে উঠেছি, সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বর্তমান বাস্তব চিত্র খুব কাছ থেকে দেখেছি। দীর্ঘদিন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এমনকি আমাদের পরিবারের নিজস্ব জমিতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুযোগও হয়েছে।

সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর আহ্বান জানিয়েছি। তখন অনেক অভিভাবক অকপটে বলেছেন, “আপনাদের স্কুল যদি বাজারের কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোর মতো পড়াশোনার মান, নিয়মিত তদারকি ও শিক্ষার্থীদের প্রতি যত্ন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে আমরা আবার আমাদের সন্তানদের সরকারি বিদ্যালয়েই ভর্তি করাব।”

অভিভাবকদের এই কথাগুলো আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, অধিকাংশ অভিভাবক সরকারি বিদ্যালয়কে এড়িয়ে যেতে চান না; তারা মূলত মানসম্মত শিক্ষা, নিয়মিত পাঠদান এবং সন্তানের প্রতি আন্তরিক যত্ন প্রত্যাশা করেন। তাই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।

লায়ন মোঃ সাইফুল ইসলাম রণি, সাংবাদিক, লেখক ও সংগঠক

 

প্রকাশিত : শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬

You might like

About the Author: priyoshomoy