জীবনের কোড বদলে দেওয়ার কাঁচি — ক্রিসপার বিপ্লব : আধুনিক প্রযুক্তি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?

তথ্য-প্রযুক্তি কণ্ঠ ডেস্ক :
ক্রিসপার-ক্যাস৯ হলো জিন প্রকৌশলের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক আবিষ্কার। এটি এমন একটি আধুনিক প্রযুক্তি যার সাহায্যে কোনো জীবের ডিএনএ-র খুব নির্দিষ্ট একটি অংশকে নিখুঁতভাবে কাটা, বাদ দেওয়া বা নতুনভাবে সাজানো যায়। একে সহজ ভাষায় বলা হয় জেনোম এডিটিং বা জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি। আগে জিন পরিবর্তন করা ছিল অনেকটা অন্ধকারে তীর ছোঁড়ার মতো, কিন্তু ক্রিসপার আসার পর বিজ্ঞানীরা এখন কম্পিউটারে লেখা এডিট করার মতোই নির্ভুলভাবে জীবনের নকশা বদলাতে পারছেন।

ক্রিসপার ধারণাটি এলো কোথা থেকে?
এর ধারণাটি এসেছে ব্যাকটেরিয়ার নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা থেকে। বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন, ব্যাকটেরিয়া যখন ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন তারা ভাইরাসের ডিএনএ-র একটি ছোট অংশ কেটে নিজেদের ডিএনএ-তে জমা করে রাখে। এর নাম দেওয়া হয় ক্রিসপার, যার পূর্ণরূপ হলো ক্লাস্টার্ড রেগুলারলি ইন্টারস্পেসড শর্ট প্যালিনড্রোমিক রিপিটস। পরবর্তীতে একই ভাইরাস আবার আক্রমণ করলে ব্যাকটেরিয়া সেই জমা রাখা তথ্য ব্যবহার করে ভাইরাসকে চিনে ফেলে এবং ক্যাস৯ নামক একটি বিশেষ এনজাইম দিয়ে ভাইরাসের ডিএনএ কেটে ধ্বংস করে দেয়। বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির এই কৌশলকেই ল্যাবরেটরিতে কাজে লাগিয়েছেন।

কীভাবে কাজ করে ক্রিসপার-ক্যাস৯?
এই প্রযুক্তির কাজ করার পদ্ধতিকে তিনটি ধাপে ভাগ করা যায়:

১. পথ প্রদর্শক আরএনএ তৈরি: প্রথমে বিজ্ঞানীরা একটি কৃত্রিম গাইড আরএনএ তৈরি করেন। এই গাইড আরএনএ হলো প্রায় ২০ অক্ষরের একটি ছোট আরএনএ খণ্ড, যা ডিএনএ-র ঠিক যে অংশে পরিবর্তন আনতে হবে, সেই অংশের সঙ্গে মিলে যায়। এটি অনেকটা জিপিএস-এর মতো কাজ করে।

২. ডিএনএ কর্তন: এরপর গাইড আরএনএ ক্যাস৯ নামক প্রোটিনকে সঙ্গে নিয়ে কোষের ভেতরে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে যায়। ক্যাস৯ হলো একটি আণবিক কাঁচি। এটি গাইড আরএনএ-র নির্দেশ মতো ডিএনএ-র দুটি সূত্রকেই কেটে দেয়।

৩. মেরামত ও পরিবর্তন: ডিএনএ কেটে গেলে কোষের নিজস্ব মেরামত ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। এই মেরামত দুইভাবে হতে পারে। এক, নন-হোমোলোগাস এন্ড জয়েনিং প্রক্রিয়ায় কোষ দ্রুত জোড়া লাগাতে গিয়ে কিছু অক্ষর ভুল করে ফেলে, ফলে নির্দিষ্ট জিনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এটাকে বলে জিন নকআউট। দুই, হোমোলজি ডিরেক্টেড রিপেয়ার প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানীরা বাইরে থেকে একটি সঠিক ডিএনএ টেমপ্লেট সরবরাহ করেন, যা দেখে কোষ ভুল অংশটি নির্ভুলভাবে প্রতিস্থাপন করে।

ক্রিসপারের পরবর্তী প্রজন্ম: আরও নিখুঁত প্রযুক্তি
ক্রিসপার-ক্যাস৯-এর কিছু সীমাবদ্ধতা দূর করতে আরও দুটি আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়েছে:

১. বেস এডিটিং: একে বলা যায় অক্ষর সম্পাদনা। আমাদের ডিএনএ চারটি অক্ষর দিয়ে তৈরি — এ, টি, সি, জি। অনেক জিনগত রোগ হয় মাত্র একটি অক্ষরের ভুলের কারণে। বেস এডিটিং প্রযুক্তি ডিএনএ না কেটেই একটি নির্দিষ্ট অক্ষরকে অন্য অক্ষরে বদলে দিতে পারে। যেমন সি-কে টি-তে বা এ-কে জি-তে পরিবর্তন করা। এটি অনেক বেশি নিরাপদ, কারণ এতে ডিএনএ-তে বড় ধরনের কাটাছেঁড়া হয় না।

২. প্রাইম এডিটিং: এটিকে বলা হয় সবচেয়ে উন্নত জিন সম্পাদনা পদ্ধতি। ২০১৯ সালে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিকে অনেকে সার্চ অ্যান্ড রিপ্লেস পদ্ধতি বলেন। প্রাইম এডিটিং-এর মাধ্যমে ডিএনএ-তে নির্দিষ্ট অক্ষর খোঁজা, কাটা, নতুন অক্ষর যোগ করা, বাদ দেওয়া এবং প্রতিস্থাপন — সবকিছুই করা সম্ভব। এটি অনেকটা ওয়ার্ড ফাইলে কার্সর দিয়ে নির্দিষ্ট শব্দ খুঁজে বদলে দেওয়ার মতো। এর ভুল করার হার ক্রিসপার-ক্যাস৯-এর চেয়ে অনেক কম।

কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এই প্রযুক্তি?
১. চিকিৎসাক্ষেত্রে বিপ্লব:
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্রিসপার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ২০২৩ সালে প্রথমবারের মতো ক্রিসপার-ভিত্তিক থেরাপি ক্যাসগেভি সিকল সেল রোগ এবং বিটা থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্য ও আমেরিকায় অনুমোদন পেয়েছে। সিকল সেল রোগে রোগীর লোহিত রক্তকণিকা কাস্তের মতো বেঁকে যায়। এই থেরাপিতে রোগীর নিজের স্টেম সেল নিয়ে বিসিএল১১এ নামক জিনকে নিষ্ক্রিয় করা হয়, যাতে ভ্রূণ অবস্থার হিমোগ্লোবিন আবার তৈরি হতে পারে।

এছাড়া ক্যানসার চিকিৎসায় কার-টি সেল থেরাপিতে ক্রিসপার ব্যবহার করে রোগীর রোগ প্রতিরোধী কোষকে আরও শক্তিশালী করে তোলা হচ্ছে। অন্ধত্বের কারণ লেবার কনজেনিটাল অ্যামাউরোসিস, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং এইচআইভি-র মতো রোগের চিকিৎসায়ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে।

২. কৃষিক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা:
কৃষিতে ক্রিসপার ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এমন ফসল তৈরি করছেন যা প্রাকৃতিকভাবেই রোগ প্রতিরোধী, খরা সহনশীল এবং বেশি পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। যেমন, ক্রিসপার দিয়ে এমন টমেটো তৈরি করা হয়েছে যা বেশি দিন সতেজ থাকে, এমন ধান তৈরি করা হয়েছে যা লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। বাংলাদেশেও ধানের ব্লাস্ট রোগ প্রতিরোধী জাত তৈরিতে এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা হচ্ছে। যেহেতু এখানে বাইরের কোনো জিন ঢোকানো হয় না, তাই অনেক দেশে এটিকে জিএমও হিসেবে গণ্য করা হয় না।

৩. গবেষণা ও রোগ নির্ণয়ে:
ক্রিসপার দিয়ে ল্যাবরেটরিতে ইঁদুর বা মাছের মধ্যে মানুষের মতো জিনগত রোগ তৈরি করে সেই রোগ নিয়ে গবেষণা করা সহজ হয়েছে। এছাড়া ক্রিসপার-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক কিট, যেমন শার্লক এবং ডিটেক্টর দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে করোনা ভাইরাস বা ডেঙ্গু ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

সীমাবদ্ধতা, ঝুঁকি ও নৈতিক প্রশ্ন
এত সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুতর চ্যালেঞ্জও রয়েছে:

১. অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন: গাইড আরএনএ কখনো কখনো ডিএনএ-র ভুল স্থানে কেটে ফেলতে পারে, যাকে বলে অফ-টার্গেট এফেক্ট। এর ফলে ক্যানসারের মতো নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে।

২. দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অজানা: এই প্রযুক্তি খুবই নতুন, তাই মানবদেহে এর পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হবে, তা এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।

৩. জার্মলাইন এডিটিং নিয়ে বিতর্ক: দেহকোষ বা সোমাটিক কোষে পরিবর্তন আনলে তা শুধু ওই ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু যদি শুক্রাণু, ডিম্বাণু বা ভ্রূণের প্রজনন কোষে পরিবর্তন আনা হয়, তবে সেই পরিবর্তন ভবিষ্যৎ প্রজন্মেও চলে যাবে। ২০১৮ সালে চীনা বিজ্ঞানী হে জিয়ানকুই এই কাজটি করায় বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয়। তাই বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে জার্মলাইন এডিটিং নিষিদ্ধ।

৪. বৈষম্য ও ডিজাইনার বেবি: এই প্রযুক্তি ব্যয়বহুল হওয়ায় শুধু ধনীরা সুবিধা পাবে কিনা, বা ভবিষ্যতে বাবা-মা সন্তানের উচ্চতা, বুদ্ধিমত্তা বা চোখের রঙ নিজেদের পছন্দমতো নির্ধারণ করতে চাইবেন কিনা — এই নৈতিক প্রশ্নগুলো এখন বড় আলোচনার বিষয়।

ক্রিসপার ও আধুনিক জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে জীববিজ্ঞান, চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি। এটি আমাদের হাতে এমন এক শক্তি দিয়েছে যা দিয়ে আমরা হাজার বছরের পুরনো জিনগত রোগকে নির্মূল করার স্বপ্ন দেখতে পারি। তবে এই শক্তিকে ব্যবহার করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতা, কঠোর নিরাপত্তা, স্বচ্ছ নৈতিক নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক আইনের মধ্যে থেকে। বিজ্ঞানের অগ্রগতি যেন মানুষের কল্যাণে এবং পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করেই হয়, সেটাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।

প্রকাশিত: রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy