ইলিশের সুনামকে পুঁজি করে ডিজিটাল প্রতারণা: আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি চাই জনসচেতনতা

সম্পাদকীয়
গত ২৩ অক্টোবর প্রিয় সময়ে ‘ পদ্মা-মেঘনার ইলিশের সুনামকে পুঁজি করে অনলাইনে প্রতারণার নতুন জাল, ঠেকাতে মাঠে নামছে বিশেষ পুলিশ বাহিনী’ শিরোনামে চাঁদপুরের ইলিশ সম্পর্কিত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। বরাবরই চাঁদপুরের ইলিশ বাংলাদেশে সুনাম অর্জন করেছে।

এ ইলিশের খ্যাতির কমতি নেই, তাছাড়া ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। সে হিসেবে চাঁদপুরবাসী গর্বিত। প্রকাশিত সংবাদ মারফত আমরা জানতে পেরেছি, ইলিশের সুনামকে পুঁজি করে ডিজিটাল প্রতারণা দীর্ঘদিন যাবত চলছে।

বাংলাদেশ ও পদ্মার রুপালি ইলিশের গৌরব বিশ্বজোড়া। বিশেষ করে চাঁদপুরের ঘাটে ভোরে নৌকা ভেড়ার পর রুপালি ইলিশের যে ঝলকানি দেখা যায়, তা এ দেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য অংশ। তবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই ঐতিহ্য ও সুনামকেই এখন হাতিয়ার বানিয়ে নিয়েছে এ দেশের একদল সুযোগসন্ধানী অনলাইন প্রতারক।

সম্প্রতি নড়াইল, যশোর, গাজীপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বসে সামাজিক মাধ্যমে চাঁদপুরের ইলিশের নামে ভুয়া পাতা খুলে সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করার এক ভয়ংকর ফাঁদ পাতা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ প্রতারণা চক্রের অপতৎপরতা দেশের সাধারণ ক্রেতাদের শুধু অর্থনৈতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং ঐতিহ্যবাহী পদ্মার ইলিশের সুনামকেও চরম ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

প্রতারকদের কার্যপদ্ধতি বেশ সুসংগঠিত ও চতুর। প্রথম ধাপে তারা চাঁদপুরের আসল আড়ত ও জেলেদের ভিডিও চুরি করে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে এবং ভুয়া মন্তব্যের মধ্যদিয়ে ক্রেতাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে। এরপর বাজারের স্বাভাবিক দামের চেয়ে অনেক কম দামে মাছ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা বা বিকাশ/নগদের তথ্য হাতিয়ে নেয়।

টাকা পাওয়ার পর পাতা উধাও হয়ে যায়, কিংবা হাতে পৌঁছায় খাওয়ার অযোগ্য পচা মাছ। শুধু ইলিশই নয়; মধু, খেজুরের গুড় ও নানা মৌসুমি পণ্যের নামেও এ জাতীয় ডিজিটাল কারবার চালিত হচ্ছে। এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে পরিচিত মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করা বা ক্ষতিকর লিঙ্কের মধ্যদিয়ে তথ্য চুরির মতো নতুন কৌশল যুক্ত হওয়ায় অপরাধের মাত্রা এখন অনেকটাই বিস্তৃত।

তবে আশার কথা হলো, এ জাতীয় সাইবার অপরাধ ঠেকাতে ইতোমধ্যে মাঠে নামছে বিশেষ পুলিশ বাহিনী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত উদ্যোগ অনুযায়ী, কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভাগ, জেলা এমনকি উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিশেষ তথ্যপ্রযুক্তি পুলিশ দলের শাখা প্রসারিত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীদের আর ঢাকায় না গিয়ে নিজ জেলাতেই দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দেশজুড়ে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাবের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ জোরদার এবং সাইবার সুরক্ষা আইন সংস্কারের যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তা সময়ের দাবিরই প্রতিফলন। আইন সংশোধন করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোয় অবৈধ অনুপ্রবেশ, হ্যাকিং ও সাইবার সন্ত্রাসবাদের মতো বিষয়গুলোতে কঠোর অবস্থান নেওয়া নিশ্চিতভাবেই ইতিবাচক পদক্ষেপ।

কিন্তু এটিও সত্য যে, কেবল পুলিশ বাহিনীর পদক্ষেপ কিংবা আইন প্রণয়ন দিয়ে এ প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। সাইবার অপরাধ থেকে বাঁচতে হলে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সতর্কতা সর্বাধিক গুরুত্ব বহন করে। পানির দামে বা অস্বাভাবিক কম দামে ইলিশ পাওয়ার অফার দেখলে আগেই সন্দেহ করা উচিত। অগ্রিম টাকা না দিয়ে ক্যাশ অন ডেলিভারির সুযোগ নেওয়া, পাতার বয়স ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা এবং যেকোনো অজানা লিঙ্কে ক্লিক না করার মতো মৌলিক নিয়মগুলো সবাইকে মেনে চলতে হবে। পদ্মা-মেঘনার ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ ও অহংকার।

এ অহংকারকে পুঁজি করে যারা প্রতারণা করছে, তারা মূলত প্রান্তিক জেলে ও সৎ ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর আঘাত হানছে। অতএব, প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর তদারকির পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে সচেতন ও সতর্ক হতে হবে। সস্তার লোভে পড়ে অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে যেন কষ্টের উপার্জন প্রতারণার ফাঁদে না আটকে যায়—এ বিষয়ে সবারই সাবধান থাকা জরুরি।

প্রকাশিত: শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy