কুকুরের মতো সাংবাদিকের উপর হামলা : দুঃখ প্রকাশে কি আইনের শাসন কায়েম হয়?

সম্পাদকীয়:

সাংবাদিকের গায়ে হাত তোলা মানে শুধু একজন ব্যক্তির উপর হামলা নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বিবেকের উপর হামলা। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের উপর অন্যায়ভাবে হামলার ঘটনা এবং প্রকাশ্য সভায় সাংবাদিককে “কুকুরের মতো পেটানোর” মতো ন্যাক্কারজনক বক্তব্য আমাদের আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল – আমরা আইনের শাসনের কথা যতই বলি না কেন, বাস্তবে মত প্রকাশের স্বাধীনতা কতটা ঝুঁকির মুখে।

প্রশ্ন উঠেছে খুব স্বাভাবিকভাবেই – একজন সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে মারধর করে, রক্তাক্ত করে, তার ক্যামেরা ভেঙে, তারপর একটি দায়সারা “দুঃখ প্রকাশ” করলেই কি বিচার হয়ে যায়? এটাই কি ন্যায় বিচার? এটাই কি আইনের শাসন?

আমাদের সংবিধান খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। সাংবাদিকরা সেই সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করেই জনগণের পক্ষে কথা বলেন। তারা কোনো ব্যক্তি বা দলের কর্মচারী নন, তারা জনগণের তথ্য পাওয়ার অধিকারের পাহারাদার।

যখন কোনো সাংবাদিকের উপর হামলা হয়, তখন দুটি অপরাধ একসাথে ঘটে। প্রথমত, দণ্ডবিধি অনুযায়ী একজন নাগরিকের উপর শারীরিক আক্রমণ। দ্বিতীয়ত, এবং আরও গুরুতর, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের উপর আক্রমণ। এই দ্বিতীয় অপরাধটির বিচার কখনোই শুধু “দুঃখিত” বলায় শেষ হতে পারে না।

আমাদের দেশে একটি ভয়ংকর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে – “হামলা করো, পরে সরি বলো”। এই সংস্কৃতি আইনের শাসনকে দুর্বল করে। কারণ আইনের শাসনের মূল কথা হলো – অপরাধের একটি নির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত শাস্তি আছে, যা ক্ষমতা, পরিচয় বা আবেগ দেখে বদলাবে না। যদি হামলাকারী প্রভাবশালী হয় এবং সে ক্ষমা চাইলেই পার পেয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে এই বার্তা যায় যে, আইন সবার জন্য সমান নয়। আইন তখন দুর্বলের জন্য কঠোর আর সবলের জন্য নমনীয় হয়ে পড়ে।

আরো উদ্বেগজনক হলো প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে সাংবাদিককে “কুকুরের মতো পেটানোর” হুমকি। দেশে আইন আছে, আদালত আছে, প্রেস কাউন্সিল আছে। কোনো সাংবাদিক যদি মিথ্যা, বানোয়াট বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রকাশ করেন, তার জন্য প্রতিকারের পথ খোলা আছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারেন, মানহানির মামলা করতে পারেন, পত্রিকার সম্পাদকের কাছে প্রতিবাদ পাঠাতে পারেন। কিন্তু “পেটানোর” কথা বলা মানে কি? এর মানে হলো, আপনি বিচার ব্যবস্থাকে অস্বীকার করছেন। আপনি নিজেই বিচারক, নিজেই জল্লাদ হতে চাইছেন। এটি আইন হাতে তুলে নেওয়ার সরাসরি উসকানি।

এ ধরনের বক্তব্য কতটুকু যুক্তিসঙ্গত? এর উত্তর হলো – একবিন্দুও না। দুটি কারণে।

প্রথমত, এটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রকাশ্যে কোনো পেশাজীবী গোষ্ঠীকে মারধরের আহ্বান জানানো দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারা অনুযায়ী ভীতি প্রদর্শন এবং ৫০৪ ধারা অনুযায়ী শান্তি ভঙ্গের উসকানি। একজন দায়িত্বশীল বক্তা, তিনি রাজনীতিবিদ হোন, জনপ্রতিনিধি হোন বা যে কোনো পেশার হোন, তার মুখ থেকে এমন কথা আসতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, এটি পুরো সাংবাদিক সমাজকে আতঙ্কিত করে। আজ একজন সাংবাদিককে পেটানোর কথা বলা হলো, কাল মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা সেটিকে নির্দেশ হিসেবে নেবে। তখন সাংবাদিকরা ভয়ে সত্য লিখবেন না, দুর্নীতির খবর প্রকাশ করবেন না, অনিয়মের বিরুদ্ধে কলম ধরবেন না। ক্ষতি হবে কার? ক্ষতি হবে রাষ্ট্রের, জনগণের। কারণ সাংবাদিক যখন চুপ হয়ে যায়, তখন অন্ধকার আরও ঘনীভূত হয়।

তাহলে ন্যায় বিচার কী?

ন্যায় বিচার মানে দুঃখ প্রকাশ নয়, ন্যায় বিচার মানে জবাবদিহিতা।

১. দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত: সাংবাদিকের উপর হামলার প্রতিটি ঘটনায় কোনো প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে মামলা রেকর্ড করতে হবে এবং প্রকৃত হামলাকারীদের চিহ্নিত করতে হবে।

২. দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: শুধু নিচের দিকের কর্মীদের নয়, হুকুমদাতা বা উসকানিদাতাকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। প্রকাশ্যে সাংবাদিককে পেটানোর হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন কথা বলার সাহস না পায়।

৩. প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা: সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

মনে রাখতে হবে, সাংবাদিক ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তার লেখায় ভুল থাকতে পারে, পক্ষপাত থাকতে পারে। কিন্তু সেই ভুলের বিচার করার অধিকার কারো হাতে লাঠি তুলে দেওয়া নয়। বিচারের জন্য আদালত আছে। লাঠি দিয়ে কখনো সত্যের বিচার হয় না।

দুঃখ প্রকাশ একটি মানবিক গুণ, আমরা তার প্রশংসা করি। কিন্তু দুঃখ প্রকাশ কখনোই শাস্তির বিকল্প হতে পারে না। যদি তাই হতো, তাহলে জেলখানা, আদালত কোনো কিছুরই প্রয়োজন হতো না। প্রতিটি অপরাধীই অপরাধ করে “দুঃখিত” বলে পার পেয়ে যেত।

আইনের শাসন কায়েম হয় তখনই, যখন একজন খেটে খাওয়া মানুষও বিশ্বাস করে যে, সে আদালতে ন্যায় বিচার পাবে। আর একজন প্রভাবশালী ব্যক্তিও ভয় পায় যে, অন্যায় করলে তাকে শাস্তি পেতে হবে। সাংবাদিকের উপর হামলা করে দুঃখ প্রকাশের সংস্কৃতি এই বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়।

তাই আমাদের দাবি স্পষ্ট – কথায় নয়, কাজে প্রমাণ করুন আইনের শাসন আছে। হামলাকারীর বিচার করুন, উসকানিদাতার লাগাম টানুন। সাংবাদিককে পাহারা দিন, কারণ সাংবাদিককে পাহারা দেওয়া মানে জনগণের জানার অধিকারকে পাহারা দেওয়া, গণতন্ত্রকে পাহারা দেওয়া।

প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

You might like

About the Author: priyoshomoy